আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ চতুর্বিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ ডিসেম্বর, ২০২৪ ● ১-১৫ পৌষ, ১৪৩১
সমসাময়িক
প্রহসন নয়, বিচার চাই
তিলোত্তমার নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় তথ্যপ্রমাণ লোপাট-সহ বিভিন্ন ধারায় অভিযুক্ত সন্দীপ ঘোষ ও অভিজিৎ মণ্ডল সিবিআই-এর পক্ষ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে চার্জশিট দাখিল না হওয়ায় জামিনে মুক্তি পেয়ে গেছে। এই ঘটনা শুধু আইনের প্রহসন নয়, বরং রাজ্য ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অদক্ষতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের নগ্ন উদাহরণ। যখন ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য পরিবারটি লড়াই করছে, তখন বিচার বিভাগ, তদন্তকারী সংস্থা ও সর্বোপরি প্রশাসনের এই ব্যর্থতা একটি বড় প্রশ্ন তোলে - এই ঘটনায় আদৌ কি প্রকৃত বিচারের কোনো সম্ভাবনা আছে?
এই ঘটনা রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির গভীর অবনতি এবং প্রশাসনের উদাসীনতা প্রকাশ করে। এক তরুণীকে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের মতো একটি সংরক্ষিত এলাকায় ধর্ষণ ও খুন করা হল, অথচ এই ঘটনার তদন্ত নিয়ে রাজ্য প্রশাসনের ভূমিকা কার্যত নিষ্ক্রিয়। অপরাধ দমনে রাজ্যের পুলিশ প্রশাসন যদি প্রথম থেকেই সক্রিয় ভূমিকা নিত, তবে এই ঘটনা নিয়ে সিবিআই তদন্তের প্রয়োজন হতো না। রাজ্য সরকার এই ঘটনায় দায় ঝেড়ে ফেলতে পারে না। তিলোত্তমার ঘটনা রাজ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি চিত্র তুলে ধরে। রাজ্যের শাসকদল যতই 'উন্নয়নের কথা' বলুক না কেন, এমন ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে, সাধারণ নাগরিকের জীবন এখানে কতটা নিরাপত্তাহীন।
অন্যদিকে অপরাধের তদন্তভার যখন সিবিআই-এর মতো একটি কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের প্রত্যাশা থাকে যে, তদন্ত হবে দ্রুত ও নির্ভুল। কিন্তু এখানে সিবিআই-এর ভূমিকা শুধু হতাশাজনক নয়, বরং দৃষ্টিকটুও। ৯০ দিন সময় পেরিয়ে গেলেও চার্জশিট পেশ না করতে পারা সিবিআই-এর অদক্ষতার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের দায়ও সামনে আনে। কেন্দ্রীয় সরকার প্রায়ই রাজ্যগুলির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা করে, কিন্তু এই ঘটনায় সিবিআই-এর কার্যক্রম প্রশ্নের মুখে পড়লেও তারা নীরব। কেন্দ্রীয় শাসকদলের তরফে যদি তদন্তের প্রতি প্রকৃত মনোযোগ দেওয়া হতো, তবে চার্জশিটের মতো একটি মৌলিক কাজ সম্পন্ন করতে এত দীর্ঘ সময় লাগত না।
তিলোত্তমার ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থার ওপর সরাসরি আঘাত। অথচ এই ঘটনায় রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার উভয়ের আচরণ আমাদের দেখিয়েছে যে, তাদের মধ্যে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব প্রকট। রাজ্য সরকারের তরফে এই ঘটনা নিয়ে কোনও সদর্থক ভূমিকা গোড়া থেকেই নেওয়া হয়নি। অপরাধীরা জামিনে মুক্তি পেলেও মুখ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রিসভার পক্ষ থেকে কোনো জবাবদিহি বা দৃঢ় পদক্ষেপ দেখা যায়নি। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে সিবিআইকে এই গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করার জন্য কোনো চাপ দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এই ঘটনা আরও একবার প্রমাণ করে যে, প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব কতটা গুরুতর। রাজ্য ও কেন্দ্র উভয়ের রাজনৈতিক লক্ষ্য যদি মানুষের সুরক্ষা ও বিচারপ্রাপ্তিকে অগ্রাধিকার দিত, তবে তিলোত্তমার পরিবার আজ এই অবস্থায় থাকত না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দোষারোপের খেলা এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলির নিরপেক্ষতার অভাব এমন সংকট তৈরি করে, যেখানে অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায়। এটি শুধু এক পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং গোটা সমাজের প্রতি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতি এক বড় আঘাত।
এখনও যারা নিগৃহীতা ও পরিবারটির ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য লড়াই করে চলছেন তাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রথমে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার উভয়কেই এই ঘটনায় তাদের ব্যর্থতার জন্য প্রকাশ্যে জবাবদিহি করতে বাধ্য করা। দ্বিতীয়ত, সিবিআই সহ অন্যান্য তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য বাধ্য করা। তৃতীয়ত, রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারকে বাধ্য করা যাতে তারা অপরাধ দমনে একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত হয়। এ কেবল আর দোষারোপ করা বা হতাশা ব্যক্ত করার সময় নয়। বরং আজ সময়ের দাবি রাস্তায় নেমে সরকারকে জনগণের সদিচ্ছার কাছে হাঁটু মুড়ে বসতে বাধ্য করার।তিলোত্তমার ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা আমাদের বিচার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট করে তুলেছে। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে ন্যায়বিচারের আশা ক্ষীণ হচ্ছে। এই ঘটনা শুধু একটি তরুণীর জীবনের ক্ষতি নয়, এটি আমাদের সমাজের প্রতি প্রশাসনের অঙ্গীকারের ব্যর্থতার প্রতীক। এখনই সময় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনার, যাতে ভবিষ্যতে তিলোত্তমার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে এবং অপরাধীরা কোনোভাবেই শাস্তি এড়াতে না পারে। অন্যথায়, আমাদের বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।