আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ চতুর্বিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩১ ডিসেম্বর, ২০২৪ ● ১-১৫ পৌষ, ১৪৩১
সম্পাদকীয়
অমিয় কুমার বাগচী (১৯৩৬-২০২৪)
'আরেক রকম'-এর অভিভাবক এবং উপদেষ্টা, প্রখ্যাত মার্কসবাদী অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক অমিয় বাগচীর প্রয়াণ কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ সমেত গোটা দেশের বিদ্যাচর্চার প্রাঙ্গনে যেই শূন্যতা তৈরি করেছে তা পূরণ করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পক্ষে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হবে।
একজন অর্থনীতিবিদ শুধুমাত্র একটি গবেষণামূলক কাজের জন্য বিখ্যাত হতে পারেন, সমসাময়িক পরিধি পেরিয়ে তাঁর সেই গবেষণা বহু যুগ চর্চিত হতে পারে। এরকম বহু উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। অধ্যাপক বাগচীর শিক্ষক পিয়েরো স্রাফার কথা এই প্রসঙ্গে মনে আসতে পারে। কিন্তু অধ্যাপক অমিয় বাগচী এমন একজন অর্থনীতিবিদ ছিলেন যাঁর বহু গবেষণামূলক কাজ আগামী বহু প্রজন্ম পড়বে এবং মনে রাখবে। আমাদের শহরে তাঁর আজীবন বসবাস, আড়ম্বরহীন জীবন, তৃতীয় বিশ্বে শুধু নয়, ভারতের মতন দেশে একটি অঙ্গরাজ্যে বসে এই ধরনের গবেষণা করে যাওয়ার কৃতিত্ব খুব বেশি মানুষের নেই। অনেকেই রয়েছেন যাঁরা বিদেশে চলে গেছেন বহু বছর আগে, অথবা দিল্লি বা মুম্বাইয়ের মতন বড় শহরে, যেখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি অনেক বছর ধরে বহু প্রতিভার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু অমিয় বাগচী একান্তভাবেই কলকাতা নিবাসী। এই শহরে বসে একের পর এক মহান গবেষণামূলক বই তথা প্রবন্ধ লেখা যা আন্তর্জাতিক বিদ্যাচর্চার জগতে সমাদৃত, এরকম খুব বেশি উদাহরণ আমাদের সামনে নেই।
অধ্যাপক বাগচীর কয়েক দশক বিস্তৃত গবেষণামূলক কাজের বর্ণনা দেওয়া বা তা নিয়ে যথাযথ আলোচনা দেওয়ার ক্ষেত্র বা পরিসর এই সম্পাদকীয়তে নেই। আমরা শুধু তাঁর বহু কাজের মধ্য থেকে কয়েকটি তুলে ধরে বলার চেষ্টা করব যে কেন তাঁর এই কাজ অনন্য এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, আমাদের মতন দেশ যারা উপনিবেশবাদের নিদারুণ অত্যাচারে দুই-শতাধিক বছরের অধিক নিষ্পেষিত হয়েছে, তাদের দেশের অর্থব্যবস্থার আলোচনায় উপনিবেশের যে ভয়ঙ্কর অর্থনৈতিক অত্যাচার তা শুধুমাত্র গল্পের মতন বললে মান্যতা পায় না। তা প্রমাণ সাপেক্ষ। আমাদের দেশের প্রথম প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতারা, যেমন দাদাভাই নওরোজি প্রমুখ, ব্রিটিশ শাসনের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাত্ত্বিকভাবে এই কথা বলেন যে ব্রিটিশরা আমাদের মতন দেশ থেকে উদ্বৃত্ত তাদের দেশে স্থানান্তরিত করে, যার ফলে আমাদের দারিদ্র এবং তাদের প্রাচুর্য একই মূদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
এই কথাটি বলা যতটা সহজ, তাকে প্রমাণ করা তত বেশি কঠিন। কিন্তু অধ্যাপক বাগচী, তাঁর গবেষণা এবং মেধার মাধ্যমে বিভিন্ন বই ও গবেষণামূলক প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন কীভাবে ব্রিটিশদের তৈরি বিভিন্ন নীতির ফলে আমাদের দেশের ব্যক্তিগত পুঁজি বিনিয়োগ বাড়তে পারেনি। তাঁর বিখ্যাত বই 'Private Investment in India 1990-1939'-কে তাঁর সমালোচকরাও মনে করেন ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান যা দাদাভাই নওরোজির মতন জাতীয়তাবাদী নেতা ও ঐতিহাসিকদের বক্তব্যকে দৃঢ় ভিত্তিতে স্থাপন করতে সক্ষম হয়।
অন্যদিকে, এই কথা এখন সর্বজনবিদিত যে ভারত ও চীন এক সময়ে পৃথিবীতে ম্যানুফাকচারিং শিল্পে প্রথম সারিতে ছিল, কিন্তু তারপরে তাদের ক্রমান্বয়ে পতন ঘটতে থাকে। অনেকে মনে করেন যে এর সঙ্গে ব্রিটিশ উপনিবেশের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রযুক্তি ও অন্যান্য কারণে এই পতন ঘটে। কিন্তু অমিয় বাগচী এই ভ্রান্ত ধারণাগুলিকে ভুল প্রমাণ করার সংকল্প গ্রহণ করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে ব্রিটিশ শাসনকালে এবং তাদের নীতির জন্যই ভারতের শিল্পে মন্দা আসে এবং ভারতে অবশিল্পায়ন ঘটতে থাকে। এই গবেষণা গবেষকদের মধ্যে চলতে থাকা একটি দীর্ঘ বিতর্কের অবসান ঘটায়। অমিয় বাগচী ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের ফলে ভারতের যে বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে তা দীর্ঘ সময়ের গবেষণা দিয়ে প্রমাণ করেন। আজকে যখন উপনিবেশ বিরোধিতার নামে হিন্দুত্বের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি মানুষের মধ্যে নিয়ে যাচ্ছে আরএসএস ও বিজেপি, তখন অমিয় বাগচীর মতন অর্থনীতিবিদদের কাছে আমাদের বারংবার ফিরতে হবে প্রকৃত উপনিবেশবাদের চরিত্র বোঝার জন্য।
অন্যদিকে, যেহেতু অধ্যাপক বাগচী একজন মার্কসবাদী অর্থনীতিবিদ ছিলেন, যিনি মনে করতেন যে পুঁজিবাদের মধ্য দিয়ে মানুষের মুক্তি সম্ভব নয়, তাই শুধুমাত্র উপনিবেশবাদ নয়, অমিয় বাগচীর গভীর পর্যবেক্ষণ ও সমীক্ষার কেন্দ্রে চলে আসে পুঁজিবাদ। তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির যে দারিদ্র-দুর্দশা এবং উন্নয়নের অভাব তা বিশ্ব পুঁজিবাদের থেকে আলাদা করে দেখলে ভুল হবে। তাঁর বিখ্যাত বই 'The Political Economy of Underdevelopment'-তে অধ্যাপক বাগচী গোটা তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নয়ন ও উপনিবেশবাদের সঙ্গে সেই দেশগুলির সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন। একের পর এক দেশের ক্ষেত্রে তিনি দেখান যে কীভাবে তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নয়নের জন্য বিশ্ব পুঁজিবাদ এবং উপনিবেশবাদ দায়ী। বিদগ্ধজনেরা মনে করেন তৃতীয় বিশ্বের অর্থব্যবস্থা এবং তার ইতিহাস বোঝার জন্য অমিয় বাগচীর এই বইটি একটি মাইলফলক। এই আলোচনায় তাঁর শেষ বই 'Perilous Passage'। এই বইতে অমিয় বাগচী দেখান যে কীভাবে পুঁজিবাদের জন্মলগ্ন থেকে তার বিকাশের সঙ্গে মানুষের মৌলিক চাহিদার দ্বন্দ্ব রয়েছে। তিনি প্রমাণ করেন যে ইউরোপেও শিল্পবিপ্লবের সময় সেখানকার মানুষের মানবোন্নয়ন হয়নি। চীন বা ভারতের তুলনায় ইউরোপীয় পুঁজি প্রতিযোগিতার নিরিখে এগিয়ে ছিল এমন মনে করারও কোনো কারণ নেই। বরং যুদ্ধ ও উপনিবেশবাদের মাধ্যমেই পুঁজি গোটা বিশ্বে তার শাসনব্যবস্থা কায়েম করে যার ফলে মানুষের উন্নয়নের পথেই তা অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
এই বইগুলি ছাড়াও অমিয় বাগচী অগুনতি প্রবন্ধ রচনা করেছেন। শুধুমাত্র অর্থনীতি নয়, ইতিহাস, শিল্প, সাহিত্য, সিনেমা বিষয়ে তাঁর লেখা সমাদৃত হয়েছে। সমসাময়িক ভারতবর্ষ তাঁকে ভাবাত, তিনি চিন্তিত ছিলেন রাজ্য তথা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। বাজার চলতি হাওয়া তাঁকে কখনও তাঁর আদর্শ বা সিদ্ধান্ত থেকে টলাতে পারেনি। গবেষণার জন্য এত সময় ব্যয় হওয়ার পরেও তিনি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। পাটুলিতে স্থিত 'সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সাইন্সেস' (CSSS)-এ তিনি দীর্ঘদিন অধিকর্তা ছিলেন। পরবর্তীকালে কলকাতাতে 'ইন্সটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ' (IDSK) কলকাতা-র তিনি প্রতিষ্ঠাতা অধিকর্তা ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে দুটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভারত তথা বিশ্বে সমাদর লাভ করে।
'আরেক রকম'-এর জন্মলগ্ন থেকে তিনি পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। নিয়মিত পত্রিকার জন্য লিখেছেন। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে তাঁর শেষ লেখা 'আরেক রকম'-এ প্রকাশিত হয়েছে। আমাদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক অশোক মিত্রের মৃত্যুর পরে অধ্যাপক বাগচী 'আরেক রকম'-এর অভিভাবক তথা উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেন। পত্রিকার জন্য লেখা সংগ্রহ করা, নিয়মিত পত্রিকার বিষয়ে সম্পাদকমণ্ডলীকে তাঁর মতামত দেওয়া এবং প্রয়োজনে সমালোচনা করা সবই তিনি করে গেছেন। আমরা তাঁর কাছে তাঁর মতামত, পরামর্শের জন্য গভীরভাবে ঋণী। 'আরেক রকম' পত্রিকা অধ্যাপক অমিয় বাগচীর প্রয়াণে হারালো একজন প্রকৃত অভিভাবক তথা বন্ধুকে। তাঁর মতন মানুষ আজকের মেকি সমাজে বিরল। আমরা তাঁর পরিবার, বন্ধু, ছাত্র-ছাত্রী, সহকর্মী ও সমস্ত আপনজনকে আমাদের আন্তরিক সমবেদনা জানাই।