আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ ত্রয়োবিংশ সংখ্যা ● ১-১৫ ডিসেম্বর, ২০২৪ ● ১৬-৩০ অগ্রহায়ণ, ১৪৩১
সমসাময়িক
শ্রীলঙ্কায় পালাবদল
বলা যেতেই পারে যে ২০২৪ প্রকৃতপক্ষে বিশ্বব্যাপী নির্বাচনের বছর। সংবিধানসম্মত সত্তরটি দেশের প্রায় চারশো কোটি মানুষ, মানে পৃথিবীর জনসংখ্যার অর্ধেক - এই বছরে ভোট দিয়ে নেতা নিয়োগ করলেন ও সরকার গঠন করলেন। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ছাড়াও আফ্রিকা মহাদেশের বেশ কয়েকটি দেশে, গ্রেট ব্রিটেন, মধ্য-দক্ষিণ-উত্তর আমেরিকায় এই বছর সংসদীয় নির্বাচন অথবা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন হয়েছিল। বছরের প্রতিটি মাসেই কোনও না কোনও দেশের সাধারণ মানুষ ভোট দিয়ে তাঁদের রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন।
নির্বাচনের মাধ্যমে বেশিরভাগ দেশেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মূলত দক্ষিণপন্থী শাসন। দখিনা বাতাসের এহেন প্রাবল্যের মধ্যেও ব্যতিক্রমী ভূমিকা পালন করেছেন সোয়া দু’ কোটি মানুষের দেশ শ্রীলঙ্কার ১ কোটি ৭০ লক্ষ ভোটার। তাঁরা বামপন্থাকে বরণ করে নিয়েছেন।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ উরুগুয়ে-ও দখিনা পবনে পাল না ভাসিয়ে বেছে নিয়েছে মধ্য-বামপন্থা। ২৪ নভেম্বর দক্ষিণপন্থী শাসনের অবসান ঘটিয়ে মাত্র ৩৫ লক্ষ জনসংখ্যার দেশ উরুগুয়ের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বামপন্থী রাজনীতিবিদ ইয়ামান্দু ওরসি। উরুগুয়ের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ‘ফ্রেন্তে অ্যাম্পলিও অ্যালায়েন্স’ (ব্রড অ্যালায়েন্স)-এর প্রার্থী ছিলেন ইয়ামান্দু ওরসি। আর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন দক্ষিণপন্থী রিপাবলিকান জোটের তরফে ‘ন্যাশনাল পার্টি’র আলভারো দেলগাদো।
পরিবর্তনের হাওয়া বইছে শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে। দু’মাস আগেই অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি রনিল বিক্রমসিঙ্ঘেকে হারিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন অনুরা কুমারা দিসানায়েকে। এবার দেশের সংসদীয় নির্বাচনেও সেই জয়ের ধারা অব্যাহত রাখল তাঁর দল ‘জনতা বিমুক্তি পেরুমুনা’ (জেভিপি)-র নেতৃত্বাধীন বামপন্থী জোট ‘ন্যাশনাল পিপল্স পাওয়ার’ (এনপিপি)। ৬২ শতাংশের বেশি শ্রীলঙ্কাবাসীর সমর্থন নিয়ে সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে তারা। উল্লেখযোগ্য সাফল্য মিলেছে উত্তর এবং মধ্য প্রদেশে তামিল অধ্যুষিত অঞ্চল-সহ পূর্বাঞ্চলে মুসলিম-প্রধান জায়গাগুলিতে। যার ফলে ইঙ্গিত স্পষ্ট - সিংহলি সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের সঙ্গে পূর্বের তিক্ত জাতিগত বিবাদ ভুলে দেশের স্থিতিশীলতাকেই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিচ্ছেন সর্বস্তরের মানুষ। রাষ্ট্রপতি হয়েই সংসদ ভেঙে নতুন করে নির্বাচনে সক্রিয় হয়েছিলেন দিশানায়েকে। ফল বলছে, সেই কাজেও তিনি সফল।
২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ শ্রীলঙ্কার নির্বাচন কমিশনের তরফে ঘোষণা করা হয়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন ‘জনতা বিমুক্তি পেরামুনা’র (জেভিপি)-র নেতৃত্বাধীন ‘ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার’ (এনপিপি)-এর প্রার্থী অনুরা কুমারা দিসানায়েকে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, অনুরা কুমারা দিসানায়েকে ৪২ দশমিক ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ‘সামাগী জন বালাওয়াগা’ (এসজেবি)-র নেতা সাজিথ প্রেমাদাসা পেয়েছেন ৩২ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট। মাত্র ১৭ শতাংশ ভোট পেয়েছেন ‘ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি’ (ইউএনপি)-র প্রার্থী ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি রনিল বিক্রমসিঙ্ঘে।
শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রথম দফা ভোট গণনা শেষে দেখা যায়, একজন প্রার্থীও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি। শ্রীলঙ্কায় মোট ভোটার কমবেশি ১ কোটি ৭০ লক্ষ। তাঁদের মধ্যে এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেন প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ, প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ ভোট পড়ে। ভোটগণনা শুরু হওয়ার পরেই বাকিদের পিছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছিলেন দিসানায়েকে। কিন্তু শ্রীলঙ্কার নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী প্রথম পছন্দের ভোটের অন্তত ৫০ শতাংশ ভোট পাননি তিনি। পেয়েছিলেন ৪৯ শতাংশ ভোট। দ্বিতীয় পছন্দের ভোট গণনা করে রাতে নির্বাচন কমিশন ‘ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার’ (এনপিপি) জোটের নেতা অনুরা কুমারা দিসানায়েকে-কে বিজয়ী ঘোষণা করে। নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার পর ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ সোমবার সকালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন অনুরা কুমারা দিসানায়েকে। রাষ্ট্রপতি হয়ে শ্রীলঙ্কার নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে হরিণী অমরসূর্যকে বেছে নিয়েছেন দ্বীপরাষ্ট্রের সদ্য নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি অনুরা কুমারা দিসানায়েকে। শ্রীলঙ্কার রাজনীতির ইতিহাসে হরিণী তৃতীয় মহিলা যিনি প্রধানমন্ত্রী পদের দায়িত্ব পেলেন।
২০১৪ সাল থেকে বামপন্থী রাজনৈতিক দল জেভিপি’র নেতৃত্বে দিসানায়েকে। এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৩৭ জন প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাস্ত করেছেন তিনি। যার মধ্যে ছিলেন বিদায়ী রাষ্ট্রপতি এবং ‘ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি’-র রনিল বিক্রমসিঙ্ঘে। ছিলেন নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ‘সামাগী জন বালাওয়াগা’-র সাজিথ প্রেমাদাসা। ‘শ্রীলঙ্কা পডুজন পেরামুনা’ (এসএলপিপি) জোট এবং ‘ইউএনপি’-র মতো বহুদিনের রাজনৈতিক দলগুলি এতদিন প্রভাব বিস্তার করে এসেছে শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে। এবারের নির্বাচনে এই দলগুলিই পিছনে পড়ে গেল।
অনুরা কুমারা দিসানায়েকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও শ্রীলঙ্কার সংসদে এসএলপিপি ও ইউএনপি-র মতো প্রাচীন দলগুলিরই প্রাধান্য ছিল। মোট ২২৫টি আসনের মধ্যে দিসানায়েকের দল জেভিপি-র সংসদে আসন ছিল মাত্র ৩টি।
দেশের নবম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দিসানায়েকের বিজয় একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এবারই প্রথম দেশের মার্কসবাদী ধারার একটি দল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হল। অনুরা কুমারা দিসানায়েকে ‘একেডি’ নামেই দেশে বেশি পরিচিত। শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো থেকে অনেক দূরে দেশের উত্তর-মধ্যাঞ্চলের পুরোনো শহর অনুরাধাপুরের এক শ্রমিক পরিবারে ১৯৬৮-তে একেডি-র জন্ম। শ্রীলঙ্কার ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও জেভিপি’র একজন কর্মী হিসাবে কাজ করার মধ্য দিয়ে তাঁর বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। বিশ্বের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী সিরিমাভো বন্দরনায়েকের কন্যা চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গে ১৯৯৪ থেকে ২০০৫ অবধি শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি থাকার সময় জেভিপি’র সঙ্গে সমঝোতা গড়ে উঠেছিল। সে সময়ই দিসানায়েকে প্রথম সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।
কুমারাতুঙ্গের মন্ত্রীসভায় দিসানায়েকে ছিলেন কৃষি, ভূমি এবং পশুসম্পদ দপ্তরের মন্ত্রী। এই দায়িত্বে থাকার সুবাদে প্রশাসক হিসাবে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেন একেডি। পাশাপাশি কৃষি-সংস্কার নিয়ে বিতর্কে জনগণকে শামিল করতে সমর্থ হন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর আবার রাজনৈতিক আলোচনায় কৃষি-সংস্কার একটি মুখ্য বিষয় হিসাবে বিবেচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০১৯ সালেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন দিসানায়েকে। তবে পরাজিত হয়েছিলেন। খুব সামান্য ভোটই পেয়েছিলেন। কিন্তু তার জন্যে দিসানায়েকে বা এনপিপি দমে যায়নি। দিসানায়েকের জয়ের পর বিজয় সমাবেশে জনতার বিপুল উচ্ছ্বাসের ছবি কেউ অস্বীকার করতে পারছেন না। দিসানায়েকে বলেছেন যে দেশকে এক নতুন নবজাগরণ ও ‘সমৃদ্ধ দেশ, সুন্দর জীবন’-এর আদর্শে চালিত করার লক্ষ্যে সর্বস্তরের জনগণের উপস্থিতি ও ২০২৪-এর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সমর্থন সত্যিই প্রশংসনীয়।
দিসানায়েকে রাষ্ট্রপতি পদে শপথ নিয়েই জানিয়েছেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই চালানোর সঙ্গে চলবে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলের জন্যও লড়াই। দুর্নীতি এবং বিত্তবান রাজনৈতিক নেতাদের প্রাধান্যের কারণে রাজনীতির প্রতি জনতার অশ্রদ্ধা বাড়ছে। এই পরিবেশ বদলাতে হবে।
২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোকে ঝাঁকিয়ে দিয়েছিল ‘আরাগালয়া’। সিংহলা ভাষায় শব্দটির অর্থ প্রতিবাদ। প্রবল প্রতাপশালী রাষ্ট্রপতি গোটাবায়া রাজাপক্ষে-কে তড়িঘড়ি দেশ ছেড়ে পালাতে হয়। যার পরিণতিতে রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ দখল করে নেয় জনতা। এই প্রতিবাদের কারণ ছিল দেশের মানুষের অর্থনৈতিক সম্বলহীনতা; জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাব তাঁদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করে। শ্রীলঙ্কা বৈদেশিক ঋণের দায়ভার মেটাতে ব্যর্থ হয়ে দেউলিয়া হয়ে যায়।
অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি হিসাবে বিক্রমসিঙ্ঘের শাসনকাল ওই বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের অন্তর্নিহিত কারণগুলির কোনও মৌলিক সমাধান হয়নি। ২০২৩-এ শ্রীলঙ্কাকে আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার বা আইএমএফ-র দুয়ারে দাঁড় করিয়েছে ২.৯ বিলিয়ন ডলারের শর্তসাপেক্ষ সহায়তার জন্যে (১৯৬৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের কাছ থেকে নেওয়া এটি ১৭তম অনুদান)। আইএমএফ-এর শর্তের জেরে বিদ্যুতের মতো জরুরি পরিষেবার উপর থেকে ভরতুকি প্রত্যাহার করা হয় এবং ১৮ শতাংশের ওপর দ্বিগুণ হারে বাড়তি মূল্যযুক্ত কর অর্থাৎ ভ্যাট চাপানো হয়। এই ঋণের বোঝা বইতে হচ্ছে কোনও বাইরের ঋণদাতাকে নয়, শ্রীলঙ্কার শ্রমিক শ্রেণিকেই।
মার্কবাদী লেনিনবাদী দল হিসাবে জেভিপি বা গণমুক্তি ফ্রন্ট ১৯৬৫-তে প্রতিষ্ঠিত হয়। রোহানা উইজেউইরা-র (১৯৪৩-১৯৮৯) নেতৃত্বে এই দল ১৯৭১ ও ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ সালে দু’বার অন্যায়, দুর্নীতিগ্রস্ত ও নিয়ন্ত্রণাহীন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের চেষ্টা করে। দু’টি অভ্যুত্থানই নৃশংসভাবে দমন করে রাষ্ট্র। যার ফলে উইজেউইরা সহ জেভিপি-র হাজার হাজার সদস্যকে হত্যা করা হয়।
১৯৮৯ সালের পর জেভিপি সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পথ পরিহার করে সংসদীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দলের প্রধান নেতৃবৃন্দের হত্যার ঘটনার পর, জেভিপি-তে দিসানায়েকের পূর্বসূরি নেতা সোমাওয়ানসা আমেরাসিঙ্ঘে (১৯৪৩-২০১৬) আটের দশকের শেষে, দলকে পুনর্গঠন করেন। নির্বাচনী সংগ্রাম ও সামাজিক ক্ষেত্রের লড়াইয়ে সমাজতান্ত্রিক নীতির অভিমুখ রেখে দলকে একটি বামপন্থী দল হিসাবে গড়ার দায়িত্ব এরপর নেন দিসানায়েকে। জেভিপি-র এই চমকপ্রদ অগ্রগতি দিসানায়েকের প্রজন্মের অবদান, যাঁদের বয়স দলের প্রতিষ্ঠাতাদের চেয়ে অন্তত কুড়ি বছরেরও কম এবং যাঁরা শ্রীলঙ্কার শ্রমজীবী জনগণ ও দরিদ্রতর মানুষের মধ্যে দলের আদর্শগত ভিত্তি প্রোথিত করতে সমর্থ হয়েছেন।
তবে দলের কিছু কিছু নেতার সিংহলী জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা রয়েছে। বিশেষ করে যখন সশস্ত্র উগ্রপন্থী বাহিনী এলটিটিই-র কর্মতৎপরতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণের প্রশ্ন এসেছে তখনই এই ধরনের প্রবণতা প্রকট হয়। দলে এই প্রবণতার প্রেক্ষিতে তামিল সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে।
বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মধ্যে একটি নির্বাচনী প্রচারে ভাষণ দিতে গিয়ে দিসানায়েকে তাঁদের আশ্বস্ত করেন যে দেশের সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ, যা বৌদ্ধধর্মকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয়, তার কোনো সংশোধন করা হবে না। দেশের জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ বৌদ্ধ। কাজেই নির্বাচনে দিসানায়েকে বাড়তি সুবিধা পেয়ে যান। দিসানায়েকের দল জেভিপি তামিলদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরোধিতা করেছে। তাঁর দল ১৯৮৭ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর স্বাক্ষরিত ভারত-শ্রীলঙ্কা চুক্তির বিরোধিতা করেছিল। জেভিপি শ্রীলঙ্কার সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীরও বিরোধিতা করেছে যা দেশের তামিল-অধ্যুষিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভূমি রাজস্ব এবং পুলিশের উপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার জন্য প্রাদেশিক কাউন্সিল তৈরি করেছিল। দিসানায়েকের দলের ইশতেহারে বলা হয়েছে যে ‘আপস ছাড়াই দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা হবে’। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে নতুন রাষ্ট্রপতি অনুরা কুমারা দিসানায়েকে এই নির্বাচনকে সিংহলী ও তামিল এবং বৌদ্ধ-হিন্দু-মুসলিম-ক্যাথলিক সমন্বিত সমস্ত শ্রীলঙ্কাবাসীর জন্য নবজাগরণ বলে ঘোষণা করেছেন।
স্বজনপোষণে ডুবে থাকা দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাত শাসকবর্গের সম্পূর্ণ বিপরীতে দিসানায়েকের ব্যক্তিগত সততা ও জাতিগত বিভাজনের দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে উঠে শ্রীলঙ্কার রাজনীতিকে পরিচালনা করতে চাওয়ার মানসিকতাই তাঁর এই উত্থানের প্রধান কারণ। এই নির্বাচনে জনতার রায়ে বিত্তশালী অভিজাত পরিবারগুলির ওপর থেকে মানুষের আস্থা সরে যাওয়ার লক্ষণ স্পষ্ট।
বাম সঙ্কীর্ণতাবাদের প্রত্যাখানও জেভিপি’র পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি কারণ। একুশটি বাম ও মধ্য-বাম সংগঠনকে নিয়ে জেভিপি-র উদ্যোগেই ‘ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার’ (এনপিপি) জোট গঠিত হয়। যাদের অভিন্ন কর্মসূচি হচ্ছে শ্রীলঙ্কার জনগণের বৃহত্তর অংশের স্বার্থে দুর্নীতি ও আইএমএফ-এর চাপিয়ে দেওয়া ব্যয় সঙ্কোচন নীতির মোকাবিলা করা। এনপিপি-র কয়েকটি দলের মধ্যে তীব্র নীতিগত মতপার্থক্য থাকলেও রাজনীতি ও কর্মসূচির ক্ষেত্রে অভিন্ন কর্মসূচির প্রতি দায়বদ্ধতা ঘোষণা করা হয়েছে। এই কর্মসূচিটি স্বনির্ভরতা, শিল্পায়ন ও কৃষি সংস্কারের অর্থনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে। এনপিপি-র প্রধান শক্তি হিসাবে জেভিপি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলির (বিশেষ করে জ্বালানি ব্যবস্থাপনার মতো জরুরি ক্ষেত্র) জাতীয়করণ ও প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা (ধনীদের কর বাড়ানো) ও সামাজিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে সম্পদের পুনর্বণ্টনের সপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। জাতিগত সংঘাতে বিদীর্ণ শ্রীলঙ্কার সমাজে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের এই বার্তাটি সাদরে গৃহীত হয়েছে।
অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে এরই মধ্যে বর্তমান সরকার বহু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। শ্রীলঙ্কার নতুন সরকার নানাভাবে ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটতে শুরু করেছে। কৃচ্ছ্রসাধনে সরকারি নিয়োগ স্থগিত ও চাকরির মেয়াদ কমিয়ে আগাম অবসরের ঘোষণাও করা হয়েছে। এরপর সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত ফৌজির সংখ্যাও কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশটির কৃষি এবং পর্যটন ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারণ, খাদ্য নিরাপত্তা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য এই দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনুরা কুমারা দিসানায়েকে রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা হল অবিলম্বে সংসদের নির্বাচন। ২২৫ আসনের সংসদের জন্য সাধারণ নির্বাচনের দিন স্থির হয় ১৪ নভেম্বর, ২০২৪।
শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক সংসদীয় নির্বাচনে ভোটে ৮,৮৮০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ভোটারের সংখ্যা পৌনে দু’কোটির বেশি। ১৪ নভেম্বর, ২০২৪-এ অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে ৬৫ শতাংশ ভোট পড়ে। শ্রীলঙ্কার সংসদের আসনসংখ্যা ২২৫। এর মধ্যে ১৯৬ আসনে সরাসরি ভোট হয়। বাকি ২৯টি আসন যুযুধান রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতের ভিত্তিতে বণ্টন করা হয়। অর্থাৎ, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১১৩টি আসন।
এই নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা যায় ২০২০ সালের সংসদীয় নির্বাচনে মাত্র তিনটি আসনে জেতা এনপিপি এবার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে গেছে। এনপিপি এবারের নির্বাচনে একাই ১৫৯টি আসনে জয়ী হয়েছে। পক্ষান্তরে সাজিথ প্রেমাদাসার দল সামাগী জন বালাওয়াগা সংসদে মাত্র ৪০ জন সদস্যকে পাঠাতে পারবে। উত্তরের জাফনা থেকে পূর্বের বাত্তিকালোয়া পর্যন্ত উপকূলবর্তী এলাকার সংখ্যালঘু তামিল অধ্যুষিত অঞ্চলেও এনপিপি ভালো ফল করেছে। অর্থাৎ তামিলদের সমর্থন পাওয়া গেছে।
এবারের সংসদীয় নির্বাচনে রনিল বিক্রমসিঙ্ঘে-র ইউএনপি কয়েকটি ছোটো দলের সঙ্গে ‘নিউ ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট’ (এনডিএফ) গড়ে লড়তে নেমেছিল। পাশাপাশি দুই প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি - গোটাবায়া রাজাপক্ষে এবং তাঁর দাদা মাহিন্দা নেতৃত্বাধীন ‘শ্রীলঙ্কা পড়ুজানা পেরুমুনা’ (এসএলপিপি) ভোটে অংশ নিয়েছিল। অনুরা কুমারা দিসানায়েকের নেতৃত্বাধীন এনপিপি ৬২ শতাংশের বেশি শ্রীলঙ্কাবাসীর সমর্থন নিয়ে সংসদে নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা পেয়েছে। সাজিথ প্রেমাদাসার এসজেবি ১৮ শতাংশ এবং রনিল বিক্রমসিংঘের এনডিএফ ৫ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে। ভোটপ্রাপ্তির হিসাবে রাজাপক্ষে পরিবারের দল এসএলপিপি চতুর্থ।
তবে নিজ ভূমে লড়াই এখনও শেষ হয়নি দিশানায়েকের। আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডারের ২.৯ বিলিয়ন ডলারের শর্তসাপেক্ষে অর্থসাহায্য সত্ত্বেও দেশের অর্থনীতির হাল আশাব্যঞ্জক নয়। সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দ্বীপরাষ্ট্রটির প্রায় এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষ ছিলেন দারিদ্রসীমার নীচে। তা ছাড়া, বিশ্বব্যাঙ্কের প্রত্যাশা অনুসারে এ বছর দেশের আর্থিক বৃদ্ধি হতে চলেছে মাত্র ২.৪ শতাংশ। এই অবস্থায় অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার, আন্তর্জাতিক সমঝোতা এবং আঞ্চলিক নীতির প্রয়োজন, যা তার উন্নতি এবং সাম্যবাদের মাঝে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে। রয়েছে রাজনৈতিক বাধাও। দিশানায়েকে প্রশাসনের কাছে অন্যতম চ্যালেঞ্জ তামিল এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়গুলির আস্থা অর্জন, যাদের এতকাল তীব্র বিরোধিতা করে এসেছেন তাঁরা। অন্যদিকে, দিশানায়েকের প্রচারের মুখ্য বিষয় থেকেছে দুর্নীতি দমন, কর হ্রাস-সহ সামাজিক উন্নয়নের আশ্বাস, যদিও সাম্প্রতিক খাদ্য এবং জ্বালানি সঙ্কটের ভয়ঙ্কর স্মৃতি এখনও মোছেনি জনগণের মন থেকে।
রাষ্ট্রপতি অনুরা কুমারা দিসানায়েকে শ্রীলঙ্কার রাজনীতি তথা অর্থনীতিতে নতুন দিশা দেখানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। সংসদীয় নির্বাচনে এনপিপি-র বিপুল জয় নিঃসন্দেহে নতুন রাষ্ট্রপতির অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের কর্মসূচি বাস্তবায়নের পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে। দিসানায়েকের বিজয় নিশ্চিতভাবেই নতুন প্রজন্মের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করতে পেরেছে। নবীন প্রজন্ম অনুভব করতে পারছে যে আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের (আইএমএফ) প্রকল্প ছাড়াও দেশ এগোতে পারে। শ্রীলঙ্কাকে এমন একটি পথে পুনর্গঠিত করার প্রচেষ্টাটি দক্ষিণ গোলার্ধের রাজনীতিতে একটি উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।