আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ ত্রয়োবিংশ সংখ্যা ● ১-১৫ ডিসেম্বর, ২০২৪ ● ১৬-৩০ অগ্রহায়ণ, ১৪৩১
সমসাময়িক
আদানির দুর্নীতি
আদানি গ্রুপ, যা বর্তমান সময়ে ভারতের অন্যতম অতিবৃহৎ কর্পোরেট এবং তথাকথিত ‘বিকশিত ভারতের’ বিজ্ঞাপন, সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি বড় কেলেঙ্কারির মুখোমুখি হয়েছে। মার্কিন বিচার বিভাগ আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানি, তার ভাইপো সাগর আদানি এবং অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ২৬৫ মিলিয়ন ডলার, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২০০০ কোটি টাকার ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ এনেছে। কেবল অভিযোগ আনাই নয়, গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করেছে। এই ঘটনা শুধু ভারতে কর্পোরেট সংস্থাগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দেয়নি, বরং ভারতীয় রাষ্ট্র ও বৃহৎ কর্পোরেট সংস্থার সম্পর্ক নিয়েও জটিল বিতর্ক উত্থাপন করেছে। যদিও চৌকিদার প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে আগেও একাধিক কর্পোরেট জালিয়াতি হয়েছে। বলা চলে সরকারি মদতেই বিজয় মালিয়া, নীরব মোদি, মেহুল চোকসি থেকে শুরু করে ললিত মোদি বিদেশে আশ্রয় নিয়ে দুর্নীতির তদন্ত থেকে অব্যাহতি পেয়ে গেছে। তবে একই সংস্থার বিরুদ্ধে এতবার অভিযোগ আগে ওঠেনি। ফলে নির্বাচনের আগে মোদীজি যতই ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা’ বলুন, আদতে তা যে কেবল দরিদ্র ভারতের জন্যই তা বারবার প্রমাণিত হয়।
মার্কিন তদন্ত অনুসারে, আদানি গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তারা ভারত সরকারের নবীকরণযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের জন্য চুক্তি পেতে সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়েছেন। এই চুক্তিগুলি 'আদানি গ্রিন এনার্জি লিমিটেড'-এর অধীনে সম্পন্ন হয়েছিল। এসব চুক্তি থেকে আদানি গ্রুপ ২০ বছরের মধ্যে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে এগিয়ে গিয়েছিল। অভিযোগ আদানিরা ভারতের একাধিক রাজ্য সরকারের মন্ত্রী ও আমলাদের ঘুষ দিয়েছে, বাজার মূল্যের চেয়ে বেশী দামে সৌরবিদ্যুৎ কেনার জন্য রাজ্য বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোকে রাজি করাতে। অন্যদিকে সেই বর্ধিত মূল্যের হিসাবে করের অতিরিক্ত লাভ ধরে তারা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। মার্কিন 'সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন' (SEC) তাদের বিরুদ্ধে এক অভিযোগ এনেছে, যেখানে বলা হয়েছে, আদানি গ্রুপ বিনিয়োগকারীদের প্রতারিত করে কর্পোরেট নৈতিকতা লঙ্ঘন করেছে। এনক্রিপ্টেড বার্তা এবং আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ এই দুর্নীতির মূল ভিত্তি। তারা আমেরিকা এবং ভারতের শেয়ার বাজারে এই প্রকল্পের জন্য বন্ডের মাধ্যমে টাকা তোলে। তারা যখন এই প্রক্রিয়া শুরু করে তখনই আদানীদের সংস্থার অন্যতম অংশীদার তিনজন শীর্ষকর্তার বিরুদ্ধে মার্কিন পুলিশ অনৈতিকতার অভিযোগে গ্রেফতারী পরোয়ানা আনে। কিন্তু শেয়ার বাজারে আদানি গ্রুপ জানায় যে তারা একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত চালাচ্ছে এবং কোনও গুরুতর অভিযোগ ওঠেনি বলে বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে। যদিও আমেরিকার আদালতে অভিযোগ ওঠার পর, আদানিরা নিজেদের নির্দোষ দাবী করতে করতেই সমস্ত বন্ড বাজার থেকে তুলে নিয়েছে। ঠাকুরঘরে কে? আমি তো কলা খাইনি - আদানি গোষ্ঠী বারবার এমনটাই করে।
এই কেলেঙ্কারিতে ভারত সরকারের ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন অভিযোগ অনুসারে, 'সোলার এনার্জি কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া' (SECI) এবং রাজ্য পরিচালিত বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলি এই চুক্তির কেন্দ্রে ছিল। রাজ্য সংস্থাগুলি প্রাথমিকভাবে চুক্তিতে অনাগ্রহী ছিল, কারণ এর শর্তগুলি তাদের জন্য লাভজনক ছিল না। কিন্তু ঘুষের মাধ্যমে এই বাধাগুলি দূর করা হয়। ভারতীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, বিশেষ করে 'সেবি' (SEBI)-র ভূমিকা, এ ক্ষেত্রে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। সেবি এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার দায়িত্ব ছিল কর্পোরেট সংস্থাগুলির কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি করা। কিন্তু আদানি গ্রুপের মতো বৃহৎ কর্পোরেট সংস্থাগুলি নিয়ন্ত্রক সংস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। শুধু তাই নয় আমেরিকার SEC যেখানে বলছে যে এই চুক্তিগুলো অনৈতিক, সেখানেই SECI আদানিদের কিছু বলছে তো না-ই, বরং তারা তাদের চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করার পরেও চুপ করে আছে। 'আদানি সোলার'-এর সাথে অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের চুক্তি ছিল যে সাত মাসের ভেতর তারা তিন লক্ষ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যোগান দেবে। কিন্তু আদানি সোলার তা পারেই নি, উপরন্তু তাদের বিদ্যুতের ইউনিটের দামও বাজার চলতি দরের চেয়ে বেশী। তাও আজ অবধি ভারতের কোনো সরকারি দপ্তর, রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সংস্থা আদানি সোলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা তো দূর, সতর্কীকরণ বার্তাও দেয়নি। আসলে আদানি গ্রুপ যে প্রধানমন্ত্রীর জামাই আদরে থাকা সংস্থা তা দিনের আলোর মতই পরিষ্কার। হিনডেনবার্গ পর্বের মতোই এবারও আদানি গ্রুপ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে যে এগুলি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তারা আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে আদানি এবং ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এই ঘটনাকে আরও বিতর্কিত করেছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে আদানি গ্রুপের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বারবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
মার্কিন অভিযোগ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ভারতের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য, যেখানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এই ধরনের অভিযোগ শুধু আদানি গ্রুপ নয়, ভারতের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশ্বের বাজারে আদানি গ্রুপের অংশীদারিত্ব এবং তাদের আন্তর্জাতিক ঋণগ্রহীতাদের উপর এই ঘটনার প্রভাব পড়েছে। মার্কিন তদন্তকারী সংস্থাগুলির দ্বারা উদঘাটিত দুর্নীতি দেখিয়েছে যে ভারতের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় কতটা দুর্বলতা রয়েছে। যে সংস্থা এর আগেও শেয়ার বাজারে অনৈতিকতার অভিযোগে অভিযুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কেবল দীর্ঘায়িতই করা হয়নি, বরং তাকে প্রায় জনগণের বিস্মৃতির অতলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কেন্দ্রের সরকার ও সেবির বদান্যতায়। এমনকি সেবির অধিকর্তা মাধবী বুচের বিরুদ্ধেই অভিযোগ ওঠে যে তিনি নিজেই নাকি আদানীদের এক বিদেশি লগ্নিকারী সংস্থায় আর্থিক লেনদেনে যুক্ত। তারপরেও এনাকেই সেবির মাথায় বসিয়ে রেখে আদানীদের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানো হয়। এই না হলে স্বচ্ছতার পরাকাষ্ঠা!
এই কেলেঙ্কারি আধুনিক পুঁজিবাদ এবং রাষ্ট্রের সহযোগিতার সবচেয়ে জ্বলন্ত উদাহরণ। আদানি গ্রুপের মতো সংস্থাগুলি তাদের প্রভাব বাড়ানোর জন্য কর্পোরেট লবি এবং রাজনৈতিক যোগসূত্র ব্যবহার করে। ভারতে ১৯৯০-এর দশকের অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর থেকে, বেসরকারিকরণ এবং বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে ক্ষমতা দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এই প্রবণতা ধীরে ধীরে জনগণের সম্পদকে কয়েকটি সংস্থার হাতে কেন্দ্রীভূত করেছে। উপরন্তু বিজেপি সরকারের তত্ত্বাবধানে সরকারি ব্যাঙ্কগুলিও তার দোসর হয়েছে। কর্পোরেট সংস্থাগুলির অনৈতিক কার্যকলাপে সমাজের বৃহত্তর অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে লাভ কেবলমাত্র মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে জমা হয়েছে। সমাজে আর্থিক বৈষম্য আরও প্রকট হয়েছে। আদানি কেলেঙ্কারি দেখিয়েছে যে কর্পোরেট এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার এই মেলবন্ধন শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ায় না, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াগুলির উপরও গভীর প্রভাব ফেলে। জনগণের পক্ষে কাজ করার বদলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বৃহৎ কর্পোরেট সংস্থাগুলির স্বার্থ রক্ষায় নিয়োজিত থাকে।
এই কেলেঙ্কারি থেকে শিক্ষা নিয়ে ভারত সরকারের উচিত শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। সেবি এবং অন্যান্য সংস্থাগুলির কর্পোরেট কার্যক্রমের উপর আরও শক্তিশালী নজরদারি রাখা। স্বচ্ছ চুক্তি প্রক্রিয়া, স্বাধীন অডিট এবং তৃতীয় পক্ষের পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক করা উচিত। কর্পোরেট পুঁজিবাদকে রোধ করতে বৃহত্তর জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি প্রকল্প এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলিতে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য সরকারের উপর গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই কেলেঙ্কারি কেবল একটি কর্পোরেট ব্যর্থতার উদাহরণ নয়। এটি ভারতের অর্থনৈতিক কাঠামো এবং কর্পোরেট ও রাজনীতির অনৈতিক আঁতাতের সংকটকে প্রকাশ করে। রাষ্ট্র যদি এই মুহূর্তে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তবে এটি কেবল দুর্নীতির সংস্কৃতিকেই উৎসাহিত করবে।