আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ ত্রয়োবিংশ সংখ্যা ● ১-১৫ ডিসেম্বর, ২০২৪ ● ১৬-৩০ অগ্রহায়ণ, ১৪৩১
সম্পাদকীয়
ধর্মীয় স্থানের নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব
‘সেই ট্রাডিশন সমানে চলেছে’। বর্তমান ভারতের প্রেক্ষাপটে একটু সংশোধন করে লেখা উচিত ‘সঙ্ঘ পরিবার তথা বিজেপি-র সেই ট্রাডিশন সমানে চলেছে’। কোন ‘ট্রাডিশন’? ধর্ম নিয়ে প্রাণঘাতী রাজনীতি করার ‘ট্রাডিশন’। ছকটা পুরোনো এবং বহুল প্রচারিত। দেশের বিভিন্ন মসজিদ হিন্দু মন্দির ভেঙে গড়ে তোলা হয়েছে এই কথা প্রথমে প্রচার কর। তা নিয়ে উত্তেজনা ছড়াও। তারপরে তাদের তাঁবেদার কাউকে দিয়ে আদালতে মামলা দায়ের কর। সেই মামলায় দুর্ভাগ্যবশত আদালত বারাণসী এবং মথুরার ক্ষেত্রে জরিপের নির্দেশ দেবে। তাকে কেন্দ্র করে আরেক দফা উত্তেজনা ছড়াও। এবং যদি পর্যাপ্ত পরিমাণ পরিকল্পনা থাকে তাহলে দাঙ্গা লাগিয়ে দিতে পারলে ষোলো কলা পূর্ণ হবে। বাবরি মসজিদ কাণ্ডে সঙ্ঘ পরিবারের দীর্ঘকালের পরিকল্পনা মিথ্যা এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সফল হয়েছে। বাবরি মসজিদ ভেঙে সুপ্রিম কোর্টের সীলমোহর নিয়ে সেই স্থানে রাম মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। অতএব সঙ্ঘ পরিবারের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। তাই বারাণসী এবং মথুরার ক্ষেত্রে তারা ইতিমধ্যেই আদালতের দ্বারস্থ হয়ে তাদের অনুকূলে কিছু নির্দেশ আনতে সক্ষম হয়েছে। এই তালিকায় তাদের সর্বশেষ সংযোজন উত্তরপ্রদেশের সম্ভল শহরের ১৬ শতকের জামা মসজিদ।
ষোড়শ শতাব্দীতে এই মসজিদ বানিয়েছিলেন বাবর। তারপরে কখনও কখনও মসজিদটি মন্দির ভেঙে তৈরি করা হয়েছিল এই অভিযোগ উঠলেও তা মান্যতা পায়নি। কিন্তু বিগত ১৯ নভেম্বর জনৈক হরিশঙ্কর জৈন জেলা আদালতে মামলা দায়ের করেন যে মসজিদটি হিন্দু হরিহর মন্দির ভেঙে বানানো হয়েছে। এটি কাকতালীয় নয় যে জৈন মশাই বারাণসী এবং মথুরার মসজিদ সংক্রান্ত মামলাতেও মূল মামলাকারী। সত্বর আদালত রায় দেয় জামা মসজিদ জরিপ করে দেখার। এই জরিপ প্রথমদিন হওয়ার সময় কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু দ্বিতীয়দিনে এই জরিপ করার সময় অশান্তি হয় এবং বেশ কিছু মানুষের প্রাণ যায়। পুলিশের নির্বিচারে গুলি চালনার ফলে পাঁচ জন মানুষের প্রাণ যায়। মৃতদের পরিবারের তরফে বলা হয়েছে যে মৃতদের এই ঘটনার সাথে কোনো সম্পর্ক ছিল না। এরা বাড়ির কাজে বেড়িয়ে অশান্তির মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। এই ঘটনার পরে সম্ভল শহরে উত্তেজনা বাড়ে। ইন্টারনেট বন্ধ রাখতে হয়। আপাতত পুলিশ প্রশাসন ঘোষণা করেছে যে কোনো বহিরাগতকে এই শহরে ঢুকতে দেওয়া হবে না।
সঙ্ঘ পরিবারের রাজনৈতিক বয়ানটি মোটামুটি ভারতের রাজনৈতিকভাবে সচতন মানুষের জানা। কিন্তু এই ঘটনায় যা ন্যক্কারজনক তা হল ভারতের বিচারব্যবস্থার ভূমিকা। ১৯৯১ সালে সংসদে একটি আইন পাশ হয়। যেই আইনে বলা হয় যে ১৫ আগস্ট, ১৯৪৭ সালে ভারতের সমস্ত ধর্মীয় স্থানের যা অবস্থান ছিল সেই অবস্থানে কোনো পরিবর্তন করা যাবে না। একমাত্র ব্যতিক্রম বাবরি মসজিদ এবং রাম জন্মভূমি কারণ সেই সময় এই বিষয়টি বিচারাধীন ছিল। কিন্তু অন্য কোনো মসজিদ বা মন্দির ১৯৪৭ সালের অবস্থানেই থাকবে। অর্থাৎ সম্ভলের জামা মসজিদ যা ১৬ শতাব্দীতে নির্মাণ করা হয়েছিল তা ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টেও মসজিদই ছিল। অতএব সেই মসজিদ যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া হয় যে মন্দির ভেঙে তৈরি করা হয়েছিল, তাহলেও সেই মসজিদের ধর্মীয় চরিত্রের কোনো পরিবর্তন করা আইনত সম্ভব নয়।
কিন্তু বারংবার দেখা যাচ্ছে যে আদালত এই ধরনের মামলায় সমীক্ষা বা জরিপের নির্দেশ দিয়ে সঙ্ঘ পরিবারের হাত শক্ত করছে। এমনকি দেশের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত দ্যর্থহীন ভাষায় বলছেন না যে এই ধরনের সমীক্ষা করা বেআইনি বা কাম্য নয়। বরং সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডি. ওয়াই. চন্দ্রচূড় একটি মামলার পর্যবেক্ষণে বলেন যে ধর্মীয় স্থানের চরিত্র পরিবর্তন না করা গেলেও ১৯৯১ সালের আইনে ধর্মীয় স্থানের চরিত্র নিরূপণ করা যেতে পারে। অর্থাৎ মাননীয় প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি তাঁর মন্তব্যে বলতে চান যে, কোনো মসজিদ আগে মন্দির ছিল কি না, তা পরীক্ষা করে দেখতে কোনো বাধা নেই। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে এর ফলে মসজিদের নিচে মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে কি না তা দেখার জন্য আবেদনের সংখ্যা বাড়বে।
আমরা মনে করি প্রাক্তন প্রধান বিচারপতির এই বক্তব্য ভ্রান্ত শুধু নয়, তিনি সঙ্ঘ পরিবারের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছেন এই ধরনের মামলা দায়ের করার। আগামীদিনে এই সংক্রান্ত বহু মামলা দায়ের করা হবে ধর্মীয় মেরুকরণ করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার লক্ষ্যে। ধর্মীয় স্থানের নিরাপত্তা সংক্রান্ত ১৯৯১ সালের আইনকে লঘু করার যেই অপচেষ্টা সঙ্ঘ পরিবার করে চলেছে, সেই অপচেষ্টার মূলে কুঠারাঘাত না করে, বিচারব্যবস্থা বর্তমানে বারংবার নানা ভাবে এই আইনের অপব্যবহারকেই যেন শক্তিশালী করছে। অবিলম্বে বিচারব্যবস্থার উচিত এই প্রবণতাকে বন্ধ করার। আরও একটি মসজিদ ভেঙে ফেলার যে ষড়যন্ত্র সঙ্ঘ পরিবার দেশের বিভিন্ন প্রান্তে করার চেষ্টা করছে, তাকে আইনত আটকে দেওয়ার দায়িত্ব বিচারব্যবস্থার। দেশের সংবিধানে বর্ণিত ধর্মনিরপেক্ষতাকে সুরক্ষিত রাখার গুরুতর দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্ট তথা বিচারব্যবস্থার উপরে ন্যস্ত রয়েছে। আমরা আশা করব সুপ্রিম কোর্ট সেই দায়িত্ব যথাযত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করবে।