আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ ত্রয়োবিংশ সংখ্যা ● ১-১৫ ডিসেম্বর, ২০২৪ ● ১৬-৩০ অগ্রহায়ণ, ১৪৩১
সম্পাদকীয়
মণিপুরের সঙ্কট ক্রমশ জটিল হচ্ছে
জিরি। একটি ছোট্ট নদী। পশ্চিম পাড়ে আসাম রাজ্যের কাছাড় জেলা। অন্য পাড়ে মণিপুরের নতুন জেলা জিরিবাম। ইম্ফল জেলা ভেঙে ২০১৬-য় তৈরি করা এই নতুন জেলার লোকসংখ্যা কমবেশি পঁয়তাল্লিশ হাজার। নভেম্বর মাসে জিরিবাম হঠাৎ করেই সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। নৃশংসভাবে তিনজন মহিলা ও তিনটি শিশুকে জিরিবামে হত্যা করে জিরি নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। এবং মৃতদেহ উদ্ধার করার চেষ্টায় প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা সর্বত্র সমালোচিত হয়।
গত আঠারো মাস ধরে চলতে থাকা মণিপুরের জাতি সংঘর্ষে জিরিবাম এর আগে অশান্ত হয়নি। শেষ পর্যন্ত দুই রাজ্যের সীমানায় অবস্থিত ছোট্ট জেলাতেও সংঘর্ষের আগুন ছড়িয়ে পড়ায় রাজ্য প্রশাসন চিন্তিত না হলেও ভারত সরকারের ঘুম ছুটে গিয়েছে। মহারাষ্ট্রের নির্বাচনী প্রচার মুলতবি রেখে খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাতারাতি দিল্লিতে ছুটে এসে জরুরি ভিত্তিতে প্রশাসনিক বৈঠক করেছেন। এই প্রশাসনিক তৎপরতা এর আগে দেখা গেছে কি?
মণিপুরে গত আঠারো মাসে একটি দিনও বোধ হয় স্বাভাবিকভাবে কাটেনি। গত কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতি অতি দ্রুত সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় পৌঁছেছে। দেশের মধ্যে প্রথম বার ড্রোন হানায় কোনও গোষ্ঠীর উপর আক্রমণ শানানো হয়েছে। আক্ষরিক অর্থে ছারখার হয়ে যাচ্ছে শত শত পরিবার। ছিন্নভিন্ন, গৃহহারা, দগ্ধ ও ক্ষতবিক্ষত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। মহিলা ও শিশুদের উপর আলাদাভাবে নির্যাতন চলছে। অথচ কেন্দ্রীয় ও রাজ্য বিজেপি সরকার একাদিক্রমে বলে চলেছে, বহিরাগত শক্তির জন্যই নাকি আইনশৃঙ্খলার এমন অবস্থা। নিতান্তই দায়িত্বজ্ঞানহীন এই বক্তব্য। যদি তেমনটাই ঘটে থাকে তাহলে কেন্দ্র ও রাজ্যের সরকার কী করছে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী যা-ই বলুন, এই দীর্ঘ ও প্রবল হিংসাকাণ্ডকে নিছক আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসাবে দেখা অসম্ভব। বহিরাগত শক্তির দুষ্কর্ম বলে দেখাও ভাবের ঘরে চুরি। এ এক গভীর সামাজিক সঙ্কট। এর উৎস গভীরপ্রোথিত। রাজ্যব্যাপী তো বটেই রাজ্যের বাইরেও এর প্রভাব পড়েছে। প্রধান দুই প্রতিপক্ষ মেইতেই ও কুকি-জো-মার (Hmar) গোষ্ঠী পরস্পরকে আক্রমণের যুক্তি হিসাবে পরস্পরের প্রতি আগেকার নৃশংসতার ঘটনাবলিকে সমানে ব্যবহার করে চলেছে। স্থানীয় জনজাতি গোষ্ঠীসমূহের এই চাপান-উতোর ও গভীরচারী শত্রুতাকে বহিরাগত উস্কানি দিয়ে ব্যাখ্যা করার মধ্যে বিপথচালিত করা কেবল অন্যায় নয়, বিপজ্জনক। এই সব ছেড়ে এখনই সব পক্ষকে এক সঙ্গে বসিয়ে সমাধানের রাস্তা খুঁজে বার করা দরকার। এবং সে কাজটি নিশ্চিতভাবেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দায়িত্ব। বহু-অবহেলিত দায়িত্ব।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে নাকি এখন দেশের প্রশাসন সক্রিয়। দেশের তো বটেই বিদেশের ব্যাপারেও নাকি সেখান থেকেই আসে যাবতীয় নির্দেশ। প্রধানমন্ত্রীর হাজার কাজ আছে। শিল্যানাস থেকে শুরু করে নির্বাচন। দেশের সমস্ত প্রকল্পের উদ্বোধন থেকে শুরু করে সরকারি চাকরির নিয়োগপত্র বিতরণ। লক্ষ কোটি নয়, স্বল্পসংখ্যক পদের জন্য প্রার্থী বাছাই করে সমস্ত বিধি-নিয়ম মেনে যাদের নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তাদের নিয়োগপত্র যথাযথ ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব এতকাল পালন করত ভারতীয় ডাক ব্যবস্থা। এখন সেই দায়িত্ব পালন করতে এগিয়ে এসেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। রীতিমতো মেলা করে নিয়োগপত্র বিতরণ করা হয়। নির্বাচিত প্রার্থীদের মধ্যে যাঁরা মেলার মাঠে উপস্থিত থাকতে পারেন মঞ্চে আহ্বান করে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেন। বাদবাকিদের নাম মঞ্চ থেকে ঘোষণা করা হয় এবং প্রযুক্তির কল্যাণে দূরে থেকেও ভার্চুয়াল ব্যবস্থায় নির্বাচিত প্রার্থীরা প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠে তাঁদের নাম উচ্চারিত হওয়ার আনন্দে বোধ হয় আত্মহারা হয়ে পড়েন।
দেশের বাইরেও প্রধানমন্ত্রীর কাজের শেষ নেই। গত আঠারো মাসে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার সময় পেয়েছেন। অবশ্যই জাতীয় স্বার্থে এহেন পরিক্রমা। শুধুমাত্র মণিপুরের জন্য যত বিড়ম্বনা। মণিপুরে তিনি কখনও যাননি এমন নয়। ডাবল ইঞ্জিনের সরকার পত্তন করার জন্য গেছেন। 'ন্যাশনাল পাম অয়েল মিশন' প্রবর্তন উপলক্ষে গেছেন। হাজার হাজার একর জমিতে পাম গাছ লাগানোর ফলে মণিপুরের অর্থনীতির কতটা উন্নতি হবে তার ব্যাখ্যা করেছেন। শুধু বলেননি যে পাম গাছ ভূমির কী কী ক্ষতি করে। রাজ্যের খনিজ সম্পদ নিয়েও মন্তব্য করেছেন। শুধু বলেননি যে ওইসব খনিজ পদার্থ ভূগর্ভ থেকে কোন সংস্থা উত্তোলন করবে। গত আঠারো মাসে সেই মণিপুর সম্পর্কে তিনি প্রায় নীরব। সংসদের ভাষণে ৪৩ সেকেন্ড সময় নিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন যে রাজ্যে দ্রুত শান্তি ফেরানো দরকার। হিরন্ময় নীরবতা ছাড়া মণিপুরে শান্তি ফেরানোর জন্য কোনো প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়েছেন কিনা জানতে হলে সম্ভবত তথ্য জানার আইনের সাহায্য নিতে হবে।
মণিপুরে শান্তি ফেরানোর দায়িত্ব দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা ছিল। মণিপুরের মেইতেই ও কুকি-জো-মার'এর মধ্যেকার এই সঙ্কটের গোড়ায় যে সংরক্ষণ ও বিশেষ অর্থনৈতিক সুবিধার প্রশ্নটি আছে তা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে? হাইকোর্টের অস্থায়ী প্রধান বিচারপতির যে নির্দেশের ভিত্তিতে অশান্তির সূচনা তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। অতি সম্প্রতি মাদ্রাজ হাইকোর্টের একজন বিচারপতিকে মণিপুর হাইকোর্টের স্থায়ী প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। আর বাড়তি ৯০ কোম্পানি (প্রায় ৯ হাজার) কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের পাঠানোর ব্যবস্থা হয়েছে। প্রসঙ্গত, মণিপুরে ২৮৮ কোম্পানি (প্রায় ২৯ হাজার) কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনী আগে থেকেই মোতায়েন রয়েছে। এইসব তথ্য মাথায় রাখলে বোঝা সহজ যে কারণে সমস্যাটি বিশেষ আগ্নেয় আকার ধারণ করেছে, প্রকৃতপক্ষে তার একটি ব্যাপকতর বহুমাত্রিক চরিত্র আছে। দেশময় বিবিধ ও বিভিন্ন জনজাতি গোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে এক অবশ্যম্ভাবী কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবের প্রতিফলন ঘটছে মণিপুরের বর্তমান সঙ্কটে। সে দিক দিয়ে এই সঙ্কট ঠিকভাবে মেটানোর দায়িত্ব প্রশাসনেরই - রাজ্যের, কেন্দ্রেরও। কোনও যুক্তিতে এই দায়িত্ব এড়ানো যায় না। এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে, এখনও অবধি প্রধানমন্ত্রী যে মণিপুরে এক বারও স্বয়ং যাওয়ার সময় পেলেন না, অথচ দেশের বহু জায়গায় গত আঠারো মাসে অসংখ্য নির্বাচনী প্রচার ও সফর করার সময় পেলেন - ভারতীয় নাগরিক সমাজ তার থেকে নিশ্চয়ই কিছু বার্তা পাবে।
এই মুহূর্তে মণিপুরে যা পরিস্থিতি, তাতে মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি যাঁরা করছেন, তাঁরা ভুল বলছেন না। রাজ্যের সরকার গত আঠারো মাসে রক্তবন্যা ও নৃশংসতা থামাতে পারেনি, ডাবল ইঞ্জিনের বড়াই-ধন্য কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যের সরকারকে কোনও ভাবে সে কাজে সহায়তা করতে পারেনি। কাজেই একই প্রস্তাব কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্যও প্রযোজ্য। বিশেষত তিনিই আবার বিভাজন প্রক্রিয়ার মূল প্রবক্তা।
এখন মণিপুরের শাসক সমাজেরই একাংশ আফস্পা নিয়োগের দাবি তুলেছেন, ১৪ নভেম্বর থেকে জিরিবাম-সহ উপত্যকার ছয়টি পুলিশ থানা অঞ্চলে আফস্পা জারি হয়েছে। অথচ এই রাজ্যেই অতীতে আফস্পা নিয়ে ঐতিহাসিক প্রতিরোধ আন্দোলন দেখা গিয়েছে। স্পষ্টতই, প্রশাসনের প্রতি জনসমাজের আস্থা এখন একেবারে শূন্য, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনের আশা সম্পূর্ণ তলানিতে। এই অবস্থা আর বেশিদিন চালানো রাষ্ট্রের তরফেই মানবাধিকার ভঙ্গের নিদর্শন ও ভারতীয় গণতন্ত্রের ভয়ানক ব্যর্থতা বলে গণ্য হবে। মণিপুরে সেই মুহূর্ত সমাগত।