আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ দ্বাবিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ নভেম্বর, ২০২৪ ● ১-১৫ অগ্রহায়ণ, ১৪৩১
প্রবন্ধ
সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতন্ত্র ও নির্বাচন ব্যবস্থা
মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়
ভারতীয় গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ইচ্ছে প্রতিষ্ঠিত হয়। আমরা প্রায়শই বলি, ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ - এই দেশ জনগণের ইচ্ছানুসারে চলে। ভারতের মতো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পৃথিবীর বহু দেশে প্রতিষ্ঠিত। পরিপ্রেক্ষিত বোঝার জন্য বলা যায়, ভারতের নির্বাচকমণ্ডলী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে প্রায় চার গুণ বড়ো এবং ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের চেয়ে প্রায় ২০ গুণ বড়ো। অবশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট-এর মতো ভারতে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন সরাসরি দেশের নাগরিকের ভোট হয় না। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষের কাছে ‘প্রেসিডেন্ট নির্বাচন’ হিসেবে পরিচিত হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদের পাশাপাশি মার্কিন নাগরিকরা আইনসভার সদস্যদেরকেও কিন্তু বেছে নেন। ভারতের মতো শুধুমাত্র প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দেশের নাগরিকরা মার্কিন আইনসভার সদস্যদের মতো বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের ভোট দেন আইনসভা পরিচালনার জন্য।
সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সমাজে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার প্রাধান্য পাওয়ার অধিকারী। সমাজকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাদের আছে। অবশ্য স্বাধীনতার পর থেকে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে জনগণের ভোটদান হার ৪৪.৮৭ থেকে ৬৭.৪ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে। অর্থাৎ একটা বড়ো অংশের নাগরিক বিভিন্ন কারণে ভোটদান প্রক্রিয়া থেকে বিরত থেকেছেন। কেন তাঁরা ভোটদান প্রক্রিয়া থেকে বিরত থেকেছেন তা নিয়ে আলোচনা আপাতত মুলতুবি থাকে।
মজার বিষয় হল, আমাদের দেশের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিকের দেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশ গ্রহণের অধিকার থাকলেও অধিকাংশ সময়েই দলগুলির মধ্যে কিন্তু সেসবের বালাই থাকে না। বহু রাজনৈতিক দলের উচ্চতম স্তরে নির্বাচন ব্যতিরেকেই গুটিকয়েক সদস্য আলো করে বসে থাকেন। তারাই সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন, এই দলগুলির একটা বড়ো অংশ আবার আঞ্চলিক দল। অসুবিধে নেই। দেশের মানুষ এখনও অহৈতুকী ভক্তিতে আস্থা রাখেন।
অগণতান্ত্রিক উপায়ে চালিত বিভিন্ন দল পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের গণতন্ত্র রক্ষার পাহারাদারের ভূমিকা পালন করেন। আপাতত এই প্রথা চলতে পারে, অসুবিধে হয় না। দীর্ঘ মেয়াদে এই ধরনের সংগঠন কাজ করতে পারে না। কারণ তাদের যোগ্যতার মাপকাঠি হয় রক্তের সম্পর্কে, আত্মীয়তা দিয়ে। পরিবারতন্ত্র গণতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। ধরে নেওয়া যাক, সুদিন সমাগত। নির্ধারিত সময় অন্তর ভারতবর্ষের রাজনৈতিক দলগুলিতে তাদের সদস্যদের দ্বারা নেতৃত্ব নির্বাচিত হলেন। এতে কি রাজনৈতিক দলগুলিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে? দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রসারিত হবে?
আরেকটু প্রসারিত গণতন্ত্রের কথা ভাবা যাক। যে নাগরিকবৃন্দ ভোট দিয়েও প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করতে পারেননি তাদের ভূমিকা সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতন্ত্রে অস্পষ্ট।
ধরা যাক তিনজন সদস্য আছেন কোনো সংস্থায়। একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দুজনে একমত হলেন, অন্য জন ভিন্ন মত পোষণ করেন। একটা সাধারণ সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া যায়? আমাদের গণতান্ত্রিক নিয়মানুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের মতামতই সংস্থার সিদ্ধান্ত হিসেবে মেনে নেওয়া হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত গণতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তারাই বহন করেন সকল কর্তৃত্ব। দেশ বা দল - অধিক সংখ্যক সদস্যের বক্তব্যই মান্যতা পায়। আমরা একমত হব যে, অন্তত মান্যতা পাওয়া উচিত।
গণতন্ত্র যেমন সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনে বিশ্বাস করে তেমনই সংখ্যালঘিষ্ঠের অধিকার রক্ষাতেও সমান জোর দেয়। গণতন্ত্রে সংখ্যালঘিষ্ঠের অধিকার রক্ষা করার দায় রাষ্ট্র নেয়, অন্তত খাতায় কলমে নেয়। নির্বাচনে যে দল হেরে যায় তার সদস্য ও সমর্থকদের অধিকার রক্ষার দায় রাষ্ট্রের থাকে।
সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত অনেক সময়ে, ব্যর্থ হয়েছে মানুষকে রক্ষা করতে। মানুষের ভবিষ্যতের যাত্রাপথকে বিকশিত করতে।
শুধু ১৯৩২-৩৩-এর জার্মানি নয়, ইতিহাসে এরকম উদাহরণ আরও অনেক আছে।
সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তার নিজের একটা আইডিন্টিটিকে অনেক সময়ে এত বড় করে দেখতে পারেন যে, তার অন্য সব আইডেন্টিটি ঢাকা পরে যায়। ধর্ম ঢেকে দিতে পারে জাতিসত্তাকে, জাতিসত্তা ঢেকে দিতে পারে তার শ্রেণি অবস্থানকে।
কঠিন চ্যালেঞ্জ। সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতকে মান্যতা দিতে হবে। আবার তার সাথে সাথেই সংখ্যালঘিষ্টের মতামতকেও শ্রদ্ধা জানাতে হবে।
কীভাবে নিশ্চিত করা যায় পৃথিবীতে আরেকটা হলোকাস্ট হবে না? অথবা কে জানে - সংখ্যালঘিষ্ঠ মানুষ হয়ত কোনো বিষয়ে সঠিক সত্য বলছেন সেই সময়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাকে গ্রাহ্য করছেন না। গ্রাহ্য করবার কথা বুঝে উঠতে পারছেন না।
দেশের ক্ষেত্রে হতে পারে, আবার দলের ক্ষেত্রেও তা সম্ভব।
উপায় আছে, সেই উপায় কিছু সংগঠনে এক সময়ে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়া চালাতে ধৈর্য লাগে, আত্মবিশ্বাস লাগে, লাগে সততা আর লাগে নিজের যুক্তির প্রতি দৃঢ়তা এবং একইসাথে অন্যের যুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা।
ফিরে আসি আবার সেই সংস্থার তৃতীয় ব্যক্তির কাছে। তিনি একা। তিনি মনে করেন তার যুক্তি সঠিক। কী করবেন তিনি?
এটা হয়তো একমাত্র তৃতীয় ব্যক্তির সমস্যা নয়। তৃতীয় ব্যক্তির কথাকেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার গণতন্ত্র রক্ষার জন্যই।
তৃতীয় ব্যক্তির মতের কোনো অংশ অন্য দুজনের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। অথবা তারা চেষ্টা করতে পারেন পরস্পরকে নিজের যুক্তি দিয়ে প্রভাবিত করতে। যদি একেবারেই তা সম্ভব না হয় তবে তৃতীয় ব্যক্তি আপাতত একাই থাকবেন। অসুবিধা কী? একা মানুষ থাকে না? সকলে কি পুত্র-কন্যা-পরিবারের সাথে সাপ্টেসুপ্টে থাকেন? অবশ্য এখানে একটা কথা আছে। সকল জায়গায় সংখ্যাগরিষ্ঠের সঙ্গে সংখ্যালঘিষ্ঠের মতও উল্লেখ করা দরকার এবং আলোচিত হওয়ায় প্রয়োজন। এমনকী সংগঠনের বাইরেও সেই বক্তব্য সংখ্যাগরিষ্ঠের বক্তব্যের সঙ্গেই আলোচিত হওয়া দরকার। এভাবেই চলতে পারে। একদিন হয়তো দ্বিতীয় ব্যক্তি এমনকি প্রথম ব্যক্তিও তৃতীয়র কথায় সায় দেবেন। হয়ত, দেবেন না।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেয় ক্ষমতা, ক্ষমতা দেয় দর্প। আর একই সঙ্গে আনে ভীতি। আমি যদি হেরে যাই! আমি যদি যুক্তিতে জিততে না পারি! মেজরিটির সেই মেজর ইগো মিশ্রিত ভীতি সংখ্যালঘিষ্ঠ মানুষের অধিকার রক্ষায় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। সংখ্যালঘিষ্ঠ কণ্ঠকে নিষ্পেষণ করতে এগিয়ে আসে মান্যতা পাওয়া সংখ্যাগুরু।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতিতে সংখ্যালঘিষ্ঠের স্বর ধরে রাখার প্রক্রিয়া চালু করেছিলেন শিক্ষক আন্দোলনের অগ্রজরা। সংখ্যাগরিষ্ঠের নামসূচি থেকে সাতজন ও সংখ্যালঘিষ্ট নামসূচি থেকে দুই'জন নির্বাচিত হয়। সেই প্রক্রিয়া আজও অব্যাহত। একসময়ে যথেষ্ট আলোচনা করা হত 'রাইট টু রিকল' নিয়ে। পছন্দ না হলে একটি নির্বাচনী এলাকার নাগরিক তার প্রতিনিধিকে অপসারণ বা প্রতিস্থাপন করবার ক্ষমতা রাখবে।
আজকে সকলের চোখের সামনে ক্ষমতাসীন দল থেকে বিরোধী দল, আর বিরোধী দল থেকে ক্ষমতাসীন দলে প্রতিনিধি যাতায়াত করে। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যে নাগরিকবৃন্দ যুক্ত ছিলেন তারা দেখেন। দেখেশুনে নিরুপায়ের মতো মস্করা করেন।
গণতন্ত্রের পরিসর বৃদ্ধি করবার সেই সব পরীক্ষা অসমাপ্ত রয়ে গেল। তার জায়গায় এল সংখ্যাগরিষ্ঠের দাপট। রাষ্ট্রে। এবং রাজনৈতিক দলে।