আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ দ্বাবিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ নভেম্বর, ২০২৪ ● ১-১৫ অগ্রহায়ণ, ১৪৩১

প্রবন্ধ

বাংলাদেশে নাটক নিয়ে নাটক করছেন নাট্যজনেরা

মোস্তফা সাকলাইন


জানি না পৃথিবীর আর কোনো দেশে এমন ঘটনা ঘটে কি না, কিন্তু বাংলাদেশে ঘটেছে। একজন শিল্পীর নিজস্ব রাজনৈতিক বক্তব্য, ভাবাদর্শ থাকবে এবং তিনি সেটা নির্ভয়ে প্রকাশ করবেন। শিল্পে শিল্পীর ভাবাদর্শ ফুটে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। নাটকের ক্ষেত্রে তো তা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। আমরা ঋত্বিক ঘটকের শিল্পীজীবনের সংগ্রাম সম্পর্কে জানি, জানি উৎপল দত্ত কীভাবে নাটকে তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ প্রচার করে গেছেন। প্রখ্যাত নাট্যশিল্পী সফদর হাশমি তো ১৯৮৯ সালে 'হল্লা বোল' নাটকের জন্য জীবন দিয়েছিলেন। আবার রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অংশ হিসেবে নাটক বন্ধ বা নিষিদ্ধের নজিরও পৃথিবীতে কম নেই। বাংলা নাটকের ইতিহাসেই তো দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পন' নিষিদ্ধ করেছিল ইংরেজ সরকার।

এসব নিয়ে গবেষণা হতে পারে, বইপত্র লেখা যেতে পারে। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশে যা ঘটেছে সেটা নিয়ে বোধ করি কোনো গবেষকও লজ্জায় গবেষণা করতে চাইবেন না। ঘটনা নাটক নিয়ে নয়, নাটকের দলের একজনকে নিয়ে। আর যিনি নাটক বন্ধ করলেন, তিনি এইমুহূর্তে সরকারি লোক হলেও বাংলাদেশের নাট্যচর্চার ইতিহাসে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিভা। আবার এ ঘটনায় যে ধরনের প্রতিক্রিয়া এসেছে, যাদের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়াগুলো এসেছে, তা-ও বিস্ময়কর। সুতরাং, সব দিক মিলিয়ে ঘটনাটিকে আরেকটি নতুন নাটকই বলা চলে।

ঘটনার সূত্রপাত ২ নভেম্বর (শনিবার) সন্ধ্যায়, ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ নাট্যদল ‘দেশ’ তাদের দর্শকনন্দিত নাটক 'নিত্যপুরাণ'-এর ১২৭তম প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। সন্ধ্যা সোয়া সাতটা থেকে নাটক শুরু হওয়ার কথা। সেই অনুযায়ী আগে থেকেই টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছিল একাডেমির টিকিট কাউন্টার থেকে। তার আগেই ৫০-৬০ জনের একটি দল ব্যানার নিয়ে সেখানে এসে দাবি তোলেন, “দেশ নাট্যদলের একজন সদস্যকে তাদের হাতে তুলে দিতে হবে"। তার অপরাধ ছিল, তিনি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক একাউন্টে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের সমালোচনা করেছিলেন।

এইমুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে যারা জানেন, তারা দেশটিতে মবসন্ত্রাস কী ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, সে সম্পর্কে নিশ্চয়ই অবগত আছেন। গত ৫ আগস্টের পর থেকেই সারাদেশে মবসন্ত্রাসের ভয়াবহতা শুরু হয়। পুরো আগস্ট, সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে এই মবসন্ত্রাসের মাধ্যমে যেমন চালানো হয়েছে সাম্প্রদায়িক নির্যাতন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন; তেমনি অপমান অপদস্ত করা হয়েছে বিভিন্ন শিক্ষপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তোফাজ্জল নামের মানসিক ভারসাম্যহীন একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু গত তিনমাসেও এই মবসন্ত্রাস দমনে কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করেনি সরকার। উল্টো যাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করলে সরকারের ‘ভাবমূর্তি’ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে, তাদের বিরুদ্ধে মবসন্ত্রাস চালিয়ে কার্য হাসিল করছে।

শিল্পকলা একাডেমিতেও এমন ঘটনাই ঘটেছিল। 'দেশ' নাট্যদলের ওই সদস্যকে জড়ো হওয়া লোকজন তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেখানে নিরাপত্তার জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকার পরও কেউ কোনো পদক্ষেপ নেননি। শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. জামিল আহমেদ ওই মবের কাছে নতিস্বীকার করে মঞ্চে উঠে নাটক বন্ধ করে দিলেন। মাঝপথে নাটক বন্ধ করে দেওয়ার এমন নজির বাংলাদেশের নিকট অতীতে নেই।

দর্শক হিসেবে বা নাট্যজন ড. জামিল আহমেদের একজন গুণমুগ্ধ হিসেবেই তাঁর এ ধরনের আচরণ আমার মতোই হাজার হাজার মানুষকে বিস্মিত করেছে। জামিল আহমেদ নাট্য অন্তপ্রাণ একজন মানুষ, একজন শিক্ষক। তাঁর অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী বাংলাদেশসহ ভারতেও নাট্যচর্চায় ভূমিকা রাখছেন। তিনি মুক্তপ্রাণের কথা বলেন, মুক্তমতের কথা বলেন, বলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর কথা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিল্পকলায় যেসব দুর্নীতি-দূরাচার হয়েছিল, তার বিরুদ্ধেও জামিল আহমেদ ও তাঁর অনেক ছাত্র-ছাত্রীরা সোচ্চার ছিলেন। কিন্তু এইবেলা ৫০-৬০ জনের একটি মবসন্ত্রাসের সামনে তিনি নতিস্বীকার করলেন এবং নিজে গিয়ে ঘোষণা করে নাটক বন্ধ করলেন।

ড. জামিল আহমেদ 'বিবিসি'-সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাফাই গেয়ে বলেছেন, “এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। নাটক বন্ধ না করলে ওরা (মবসন্ত্রাসীরা) শিল্পকলায় আগুন দিত"। চমৎকার! এসব কথা আমরা আগের সরকারের অনেক দায়িত্বশীল লোকজনের মুখেও শুনেছি। দায়িত্ব এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হল, যে কোনো অপরাধকে ‘বিচ্ছিন্ন’ হিসেবে প্রমাণ করা। ড. জামিল কি শিল্পকলায় থাকা সেনাবাহিনীর সহযোগিতা চেয়েছিলেন? পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছিলেন? সেনাবাহিনীর ক্যাম্প থাকার পরও নাটকটি বন্ধ করা ছাড়া উনি আর কোনো পদক্ষেপই নিতে পারেননি!

নাট্যদলের একজন সদস্য তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে কি লিখবেন, সে দায় যেমন নাট্যদলের বা নাটকের নয়; তেমনি ফেসবুকে অন্তর্বর্তকালীন সরকারের সমালোচনা করলেই তাকে আক্রমণ করার বৈধতাও ফ্যাসিজম। নিজেদের দায় এড়াতে ইউনূস সরকারের পক্ষ থেকে একটি প্রেস রিলিজ জারি করে বলা হয়েছে, এ ধরনের ঘটনা সমর্থন করে না সরকার। মূলত নিজেদের পিঠ বাঁচাতেই এসব মুখস্থ বুলি আওড়ে ইউনূস সরকার প্রকারান্তরে ঘটনাটিকে 'জায়েজ' প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছে।

এক্ষেত্রে সরকারের সহযোগীরও অভাব নেই এবং আশ্চর্য ঘটনা হলো, এই সহযোগিতার পয়লা ধাপের সিপাহীসালার হলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুল্লাহ আল কাফী। ঘটনার পরপরই নিজের ফেসবুক একাউন্টে তিনি লেখেন, “হাসিনা ফ্যাসিবাদের নির্মাতা, সমর্থক, প্রচারক যে যত বড় সৃষ্টিশীল, প্রতিভাশালী, লেখক-অভিনেতা-সাহিত্যিক-সাংবাদিক হোন আপাততঃ অফ দেন। গত সাড়ে ১৫ বছর জাতি আপনাদের টাফালিং অনেক দেখেছে"। বাহ! ফ্যাসিবাদের এমন চেহারা তো শেখ হাসিনাও দেখায়নি। গত ১৫ বছরে তো তারাও এভাবে বিরোধীদের ধমক দিয়ে বলেনি, সৃষ্টিশীল-প্রতিভাবান হলেও আপনারা লিখবেন না। সারাজীবন শুনেছি, কমিউনিস্টরা সরকারি দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে দাঁড়ান, অবস্থান নেন শিল্পের পক্ষে, শিল্পীর পক্ষে আর স্বাধীন শিল্পচর্চার পক্ষে। কিন্তু বাংলাদেশে এ তো দেখি উলট পুরাণ!

অনেকেই, এমনকি নাটকের মানুষরাও বলেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নাটক বন্ধ করা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না জামিল আহমেদের। সত্যিই কি তাই? জামিল আহমেদ সম্পর্কে যেটুকু জানতাম, তিনি প্রতিষ্ঠানবিরোধী মানুষ। নাটক বন্ধ করার চেয়ে মহাপরিচালক পদ থেকে ইস্তফা দেওয়াটা তাঁর জন্য অনেক বেশি স্বাভাবিক ছিল। কি জানি! আমরা হয়ত ভুল জানতাম। লঙ্কায় গেলে সকলেই হয়ত রাবণ হতে চান।