আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ দ্বাবিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ নভেম্বর, ২০২৪ ● ১-১৫ অগ্রহায়ণ, ১৪৩১

সমসাময়িক

কোন পথে বাংলাদেশ?


৫ আগস্ট ২০২৪। বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হয়ে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয় এই দিনে। শেখ হাসিনা সরকারের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পতন হয় এই দিনে এবং হাসিনা বাধ্য হন দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে এসে আশ্রয় নিতে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণ, বিশেষ করে ছাত্ররা স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের পতনের পরে এই দিনকে 'নতুন স্বাধীনতা দিবস' হিসেবে চিহ্নিত করে এক নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানায়। গঠিত হয় নতুন সরকার, যার মুখ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মহম্মদ ইউনুস। ঘোষণা করা হয় যে দ্রুত গণতন্ত্র স্থাপনের লক্ষ্যে নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। স্বৈরাচারের অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের নবজন্ম ঘটবে। অতীতের সমস্ত কালিমা মুছে ফেলে বাংলাদেশ প্রকৃত গণতন্ত্রের পথে দ্রুত এগিয়ে যাবে।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরে গোটা বাংলাদেশ জুড়ে এক চূড়ান্ত অরাজকতা দেখা যায়। বলা যেতে পারে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় কাঠামো বলে কোনোকিছু সেই সময় বাংলাদেশে সচল ছিল না। একটি বৃহৎ গণঅভ্যুত্থানের পরে, একটি পুরোনো রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ার সময়, আরেকটি কাঠামো তৈরি হওয়ার মাঝে যেই সময়টি থাকে সেই সন্ধিক্ষণে এই অরাজকতা খুব অস্বাভাবিক নয়, এমন একটি কথা সেই সময় বলা হয়েছিল। আসলে বলা হচ্ছিল যে আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে। ছাত্র আন্দোলনকারী এবং অন্যান্য শক্তিরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এলে এই সব অরাজকতা বন্ধ হবে। যেই অরাজকতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মূর্তি ভাঙা হয়, তাঁর বাসস্থান জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, তাঁর স্মৃতিতে তৈরি সংগ্রহালয় পুড়িয়ে দেওয়া হয়, সেই অরাজকতার বিরুদ্ধে তথাকথিত ছাত্র নেতৃত্ব এবং মহম্মদ ইউনুস সাহেবকে কোনো বিবৃতি দিতে দেখা গেল না। বাংলাদেশে বসবাসকারী বহু হিন্দু সংখ্যালঘু মানুষের উপরে আক্রমণ হল, তাদের হত্যা করা হল, কিন্তু আমাদের বোঝানো হল যে না না, ওগুলো আসলে আওয়ামী লিগের বিরুদ্ধে মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। আসলে আক্রমণ হিন্দুদের বিরুদ্ধে নয়, করা হয়েছিল আওয়ামী লিগের বিরুদ্ধে। হিন্দুরা যদি আওয়ামী লিগের সমর্থক হয়, তাতে কীই বা করা যেতে পারে! যদিও ইউনুস সাহেব বলেছিলেন যে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপরে আক্রমণ যাতে না হয়। কিন্তু তারপরেও বাংলাদেশে এই আক্রমণ হয়েছে। একথাও ঠিক যে বাংলাদেশের মানুষের একটি অংশ এই সাম্প্রদায়িক আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, এই আক্রমণকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু জামাত এবং অন্যান্য সাম্প্রদায়িক শক্তিরা বাংলাদেশে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টায় রয়েছে, এই কথা অস্বীকার করা যাবে না।

আবার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে যেই আন্দোলন সংগঠিত হল, যারা গণতন্ত্রের জন্য প্রাণ দিলেন, তাদের নেতৃত্ব ঘোষণা করে দিল যে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন করা যাবে না। আসলে বাংলাদেশের বর্তমানে যেই ছাত্ররা অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা এবং তাদের অনুমোদিত ছাত্ররা বাদ দিয়ে বাংলাদেশে আর কোনো রাজনৈতিক শক্তি যাতে ছাত্র আন্দোলনে সামিল না হতে পারেন, তার ব্যবস্থা করা হল। কিন্তু কীই বা করা! গণতন্ত্রকে বাংলাদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে এই ছাত্র নেতাদের ফরমান মেনে নেওয়াই এখন দস্তুর। এহেন পরিস্থিতিতে অত্যন্ত নিন্দাজনক ঘটনা ঘটল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। একটি মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হল। হত্যা করার আগে তাকে আবার আদর করে ভরপেট খাবার খাওয়ালো ছাত্ররূপী জল্লাদরা। অনেকে বলতে পারেন যে এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু তা বললে সত্যের অপলাপ হবে। শেখা হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে বাংলাদেশে গণপিটুনি এবং ‘মব-জাস্টিস’-এর ঘটনা একের পর এক ঘটে চলেছে। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রলীগ সদস্যকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়াও সংখ্যালঘু এবং জনজাতি মানুষদের বিরুদ্ধে গণপিটুনির বহু ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে, যার পরে স্বয়ং ইউনুস সাহেবকেও এর বিরুদ্ধে বিবৃতি দিতে হয়।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য গণঅভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার হাইকোর্টের সামনে যে হলফনামা কয়েকদিন আগে পেশ করেছে তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং গভীর দুশ্চিন্তার। বাংলাদেশের হাইকোর্টে সেই দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল জানান যে তাঁর সরকার বাংলাদেশের সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি বাতিলের পক্ষে। শেখ হাসিনা সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী প্রণয়ন করে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি বাংলাদেশের সংবিধানে পুনঃস্থাপন করে। এর সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ ঘোষণা করা হয়। এই সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বাতিল করে হাসিনা সরকার। এর বিরুদ্ধেই বাংলাদেশের আদালতে মামলা করা হয়। সেই মামলার শুনানিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তরফে প্রথমবার প্রকাশ্যে বলা হয় যে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি সংবিধান থেকে বাতিলের পক্ষে ইউনুস সরকার।

বাংলাদেশ গঠিত হয়েছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদ এবং বাংলা ভাষার অধিকারের দাবিতে। যেই স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা দেখেছিলেন সেই বাংলাদেশ বাঙালীর, কোনো একটি ধর্মের মানুষের নয়। মুজিবুর রহমানের স্বপ্নকে ধ্বংস করার দিকে এগোলো ইউনুস সরকার। অতএব, তাঁকে ‘জাতির পিতা’ বলতেও অনীহা প্রকাশ করল ইউনুস সরকার। সরকারের তরফে আদালতে বলা হয় যে, যেহেতু দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী, তাই রাষ্ট্রব্যবস্থার চরিত্রে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ কথাটি রাখা অর্থহীন। অর্থাৎ বাংলাদেশের যে ১০ শতাংশ সংখ্যালঘু রয়েছেন যারা ইসলাম ধর্মাবলম্বী নন, তাদের ধর্মপালনের অধিকার ‘নতুন’ বাংলাদেশে সুরক্ষিত থাকবে কি না, সেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ তথা বিজেপি একই যুক্তিতে ভারতকে 'হিন্দু রাষ্ট্র' ঘোষণা করতে চায়। তারা বলে থাকে যে ভারতে প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ যেখানে হিন্দু, সেখানে কেন ভারতকে 'হিন্দু রাষ্ট্র' ঘোষণা করা হবে না! আসলে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্র একে অপরের পরিপূরক। একটি গণতান্ত্রিক দেশে সমস্ত ধর্মের মানুষের সমানাধিকার থাকা আবশ্যিক। ধর্মের ভিত্তিতে যাতে কোনো মানুষের অধিকার খর্ব না করা যায়, তাই রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকা কাম্য নয়। তাই যারা ধর্মনিরপেক্ষতার বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন, তারা আসলে প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের ইউনুস সরকার তথা ভারতের হিন্দুত্ববাদী শক্তি তাই আপাতদৃষ্টিতে বিপরীত মেরুতে অবস্থানকারী মনে হলেও আসলে উভয়েই গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে মানুষের ধর্মীয় আবেগকে ভর করে রাজনীতি করার পক্ষে।

বাংলাদেশের হাইকোর্টের উপরে এক ঐতিহাসিক দায়িত্বভার এসে পড়েছে। আমরা আশা রাখব তাঁরা বাংলাদেশের সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটিকে বজায় রাখবেন। এই কোর্টের অভিমত শুধুমাত্র বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ তা নয়। গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের উত্থানের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়ে কী অবস্থান নিচ্ছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার শিকড় যে আগেও খুব পোক্ত ছিল তা নয়। কিন্তু রাষ্ট্রের সংবিধানে এর উল্লেখ থাকার ফলে সংখ্যালঘু সমস্ত মানুষের মনে এই আশা ছিল যে দেশটি সব ধর্মের মানুষের। কিন্তু সেই শব্দটি বাতিল হলে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আদর্শের উপরে কুঠারাঘাত করা হবে। এর ফল হবে সুদূরপ্রসারী, যেখানে ভারতের দক্ষিণপন্থী উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা বাংলাদেশের উদাহরণ দেখিয়ে এই দেশের সংবিধান থেকেও ধর্মনিরপেক্ষতা বাতিলের দাবিকে আরও জোরদার করবে। অতএব, দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ তথা ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা স্থাপিত হওয়া জরুরি। যারা ধর্মনিরপেক্ষতা বিরোধী তারা আর যাই হোন শান্তিকামী গণতান্ত্রিক শক্তি নন।