আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ দ্বাবিংশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ নভেম্বর, ২০২৪ ● ১-১৫ অগ্রহায়ণ, ১৪৩১
সম্পাদকীয়
দক্ষিণপন্থার বিজয়
দুইবার তাঁকে দেশের সংসদে ইমপিচ করার চেষ্টা করা হয়েছে। চারটি ফৌজদারী মামলায় তিনি মূল অপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত, একটি জালিয়াতি মামলায় তিনি দোধী সাব্যস্ত হয়েছেন। একজন ভদ্রমহিলাকে যৌন হেনস্থা এবং সম্মানহানি করার মামলায় কোর্ট তাঁকে ৮ কোটি ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার রায় ঘোষণা করে। তিনি ২০২০ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরেও, জনতার রায়কে অস্বীকার করে, দেশের সংসদ ভবনে হামলা চালানোর জন্য সরাসরি উস্কানি দিয়েছেন। তিনিই আবার ২০২৪ সালে সেই দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। না, আফ্রিকা তথা এশিয়া বা লাতিন আমেরিকার কোনো দরিদ্র স্বৈরাচারী দেশ যেখানে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত নয়, যেখানে একনায়কতন্ত্র বিরাজমান, তেমন কোনো দেশের কথা আলোচিত হচ্ছে না। উপরের ঘটনাবলী ঘটেছে দুনিয়ার সর্বাধিক ধনী এবং ক্ষমতাশালী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। যেই ব্যক্তি উপরোক্ত অপরাধ এবং অনৈতিক ঘটনা সংঘটিত করেও দেশের রাষ্ট্রপতি পদে পুনর্বহাল হয়েছেন, তাঁর নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সংবিধান বিরোধী এবং অপরাধমূলক একের পর এক কাণ্ড ঘটানোর পরেও ডোনাল্ড ট্রাম্প শুধুমাত্র যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন তা নয়। তিনি ৫১ শতাংশ জনগণের ভোট পেয়েছেন, এবং সেই দেশের প্রায় প্রত্যেকটি অঞ্চলে তাঁর এবং তাঁর দলের ভোট বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন। আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জনগণ ভোট দিলেও, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন ইলেল্টোরাল কলেজের সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে। তাই জনগণের সংখ্যালঘু অংশের ভোট পেয়েও আমেরিকায় রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়া যায়। ২০০০ বা ২০০৪ সালে জর্জ বুশ বা ২০১৬ সালের ট্রাম্প জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের ভোট না পেয়েও আমেরিকার রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু ২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। ট্রাম্পের মতন ব্যক্তির এই বিপুল জনসমর্থনের নেপথ্যে কী কারণ রয়েছে?
বিশ্বায়নের ফলে দরিদ্র শ্রমিক শ্রেণির যে উন্নয়ন হওয়ার স্বপ্ন ফেরি করা হয়েছিল, বাস্তবে তা হয়নি। বরং বিগত ৩০ বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিকের প্রকৃত আয় বাড়েনি। অন্যদিকে শিল্পপতি তথা সমাজের ধনী অংশের আয় বেড়েছে কয়েকগুণ। ফলত, দেশের অভ্যন্তরে আর্থিক বৈষম্য প্রবলভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে, বিশ্বায়িত অর্থব্যবস্থায় প্রতিযোগিতায় (বিশেষ করে চীনের সঙ্গে) টিকে থাকতে না পেরে, আমেরিকার ম্যানুফাকচারিং শিল্প এক সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। যেখানে একসময় হাজার হাজার মানুষ কারখানায় শ্রমিকের চাকরি করে তাদের জীবন নির্বাহ করতেন, সেখানে কারখানাগুলি বন্ধ হয়ে গিয়েছে, বেকারত্বের হার বেড়েছে। আবার কোভিডের ফলে জনজীবন পর্যুদস্ত হয়ে গিয়েছিল। আমেরিকায় কোভিড নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্প সরকার সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছিল, কারণ তারা বিজ্ঞান নয়, অপবিজ্ঞানের আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু কোভিডের পরে বাইডেনের নেতৃত্বে সরকার মানুষের জীবনের বিশেষ কোনো উন্নতি করতে পারেনি। বরং প্রবল মূল্যবৃদ্ধির ফলে মানুষের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে যায়।
এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই আমেরিকার এক বৃহদাংশের মানুষ সরকার তথা প্রশাসনের উপরে ক্ষুব্ধ ছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পরিস্থিতিতে মানুষের সামনে এক সহজ সমাধানের উপায় বাতলে দেন। অভিবাসন বন্ধ করতে হবে। ট্রাম্প মানুষকে বলেন যে প্রচুর সংখ্যায় বেআইনি অনুপ্রবেশ ঘটেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, যারা প্রকৃত আমেরিকানদের চাকরি খেয়ে নিচ্ছে। তাদেরকে পুনর্বাসন দিতে সরকারের প্রচুর টাকা গচ্চা যাচ্ছে। অতএব এই সমস্ত বেআইনী অনুপ্রবেশকারীদের দেশ থেকে তাড়াতে হবে। এই চরম দক্ষিণপন্থী কথা ট্রাম্প সোচ্চারে দেশের মানুষের সামনে বলতে থাকেন। এই পথেই আমেরিকা আবার মহান হবে। এই বার্তা তিনি সার্থকভাবে জনগণের সামনে নিয়ে যেতে সক্ষম হন।
অন্যদিকে ডেমোক্রাটিক পার্টি নামক যেই দলটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিগত দিনে ক্ষমতাসীন ছিল তারা দাবি করে যে তারা আসলে আমেরিকান শ্রমিক শ্রেণির প্রগতিশীল দল। কিন্তু বহু দশক ধরেই ডেমোক্রাটিক পার্টির উদারনৈতিক পুঁজিবাদ মার্কিন কর্পোরেটদের স্বার্থে, তাদের অঙ্গুলীহেলনে চলে। নবউদারবাদী যেই সমস্ত ধারণা বর্তমান বিশ্বে কর্পোরেট স্বার্থ তাদের ক্ষমতার বলে সাধারণ জ্ঞানে পরিণত করেছে, ডেমোক্রাটিক পার্টির ভাবনাচিন্তা তার থেকে একচুলও ভিন্ন নয়। অতএব, দেশে যখন চাকরি কমছে, মানুষ যখন মূল্যবৃদ্ধির জন্য নাজেহাল, তখন ডেমোক্রাটিক পার্টি মানুষের সামনে কোনো বিকল্প কর্মসূচী তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। বার্নি স্যান্ডার্সের মতন ডেমোক্রাটিক নেতা আর্থিক বৈষম্য, ডলার বিলিয়নিয়রদের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। কিন্তু তাঁকে সুপরিকল্পিতভাবে দলের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী কোণঠাসা করেছে। তাই মানুষের সামনে ডেমোক্রাটিক পার্টি তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে।
এই বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর নেপথ্যে প্রেসিডেন্ট বাইডেন এবং তাঁর স্তাবকদের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রারম্ভেই বোঝা যাচ্ছিল যে বয়সজনিত কারণে বাইডেন আরও একবার রাষ্ট্রপতি হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতাও হারিয়েছেন। কিন্তু ক্ষমতার লোভ তো আর বয়স মানে না। তাই তিনি এবং তাঁর দলের নেতৃত্বত্ব জেদ ধরে থাকলেন যে তিনিই আবার প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবেন। ট্টাম্পের সঙ্গে একটি টিভি বিতর্কে দেশের মানুষ দেখলেন যে বাইডেন কোনো কথা বলার মতো পরিস্থিতিতেই নেই। তখন ডেমোক্রাটিক পার্টি তথা বাইডেন সিদ্ধান্ত নেয় যে বাইডেন নন, রাষ্ট্রপতির দৌড়ে নামবেন উপরাষ্ট্রপতি কমলা হ্যারিস। ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। ট্রাম্প বুঝলেন যে বাইডেন নয়, নিশানা করতে হবে হ্যারিসকে। ট্রাম্প হ্যারিসের বাবার মার্কসবাদী হওয়া থেকে শুরু করে তাঁর লিঙ্গ পরিচিতি এবং কৃষ্ণাঙ্গ পরিচিতি, কোনো কিছুকেই আক্রমণ করতে ছাড়েননি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা গোটা বিশ্বে যে দক্ষিণপন্থা বিগত কয়েক দশক ধরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সেখানে ভয়-ভীতি-ঘৃণার ভিত্তিতেই ট্রাম্পের মতন মানুষেরা রাজনীতির কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন। মার্কিনদের ভয় দেখাও যে তোমার চাকরি বেআইনি অনুপ্রবেশকারী তথা কৃষ্ণাঙ্গরা খেয়ে নিচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা তৈরি কর। সমাজের নিকৃষ্টতম যে চিন্তা আছে তাকে মূলধারা বানিয়ে নিয়েছে ট্রাম্পের মতো নেতারা। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মহিলাদের অধিকার খর্ব হয়েছে। গর্ভপাতের অধিকার থেকে তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন। ট্রাম্প গর্ভপাত আইনের পরিবর্তনের পক্ষে। অনেকে মনে করেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রীয় সমাজে সমকামী প্রেম তথা বিবাহ স্বাভাবিকতা লাভ করেছে। আদপেই তা নয়। সমকামী তথা প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের বিরুদ্ধে ট্রাম্প লাগাতার বিষোদ্গার করে চলেছেন। ডেমোক্রাটিক পার্টি তাদের পক্ষে কিছু সংস্কার করার চেষ্টাকে ট্রাম্প তীব্রভাবে সমালোচনা করেছেন। এক কথায় বলা যেতে পারে যে ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রপতি হওয়া আমেরিকার দক্ষিণপন্থী শক্তির এক বিপুল জয়।
এই জয় শুধুমাত্র আমেরিকায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে না। গোটা দুনিয়ার দক্ষিণপন্থী শক্তিরাই আজ ট্রাম্পের জয়ে আনন্দিত। কারণ ট্রাম্প দেখিয়ে দিয়েছেন যে ঘৃণার রাজনীতি করেও, অপরাধ সংঘটিত করেও আমেরিকার মতন দেশে নির্বাচনে জেতা যায়। প্রেসিডেন্টের আসনে বসার আগেই ট্রাম্প পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে তিনি বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হবেন। কয়েক লক্ষ মানুষকে তিনি আমেরিকা থেকে বহিষ্কার করবেন। মেক্সিকোর সীমান্তে বিশাল দেওয়াল তৈরি করার পরিকল্পনা অনেকদিনের। এবারে তা বাস্তবায়িত করার পথে হাঁটবেন তিনি। আমেরিকায় আমদানিকৃত সমস্ত পণ্যের উপর, বিশেষ করে চীন থেকে আসা পণ্যের উপর তিনি বিশাল শুল্ক চাপাবেন। এহেন নীতি নিলে স্বভাবতই অন্যান্য দেশগুলিও চুপ করে বসে থাকবে না। তারাও নানারকম শুল্ক চাপাবে। বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হওয়া সময়ের অপেক্ষা। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দিয়েছে যে বাণিজ্য যুদ্ধের ফয়সালা বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তা প্রকৃত যুদ্ধেও পর্যবসিত হয়। অতএব আগামীদিনে গোটা বিশ্বে অশান্তি বাড়বে। গাজায় ইজরায়েল যে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে, তার প্রতি বাইডেনের সমর্থন ছিল। ট্রাম্প সেই সমর্থনকে আরও বাড়াবে। অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান বাইডেনের বিরোধী। এই নিয়ে ট্রাম্প রাশিয়ার হাত শক্ত করতে উদ্যোগী হবে কি না, তাও দেখার। জলবায়ু সংক্রান্ত চুক্তি, ইরানের সঙ্গে আণবিক চুক্তিগুলি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে আনার নীতি নেবে ট্রাম্প প্রশাসন। অতএব আবহাওয়া পরিবর্তন তথা গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর মতন বিষয়গুলি ধাক্কা খাবে।
আসলে ট্রাম্পবাদ যুক্তির উপর অপযুক্তিকে প্রতিষ্ঠা করার মতবাদ। এই অপযুক্তির মধ্য দিয়েই ভয়-ভীতি-ঘৃণার চাষ করানো হয় মানুষের মগজে। শুধুমাত্র পুঁজিপতিদের লাগামহীন মুনাফা অর্জনের যুক্তিই এই মতবাদের একমাত্র যুক্তি। তাই এটি কাকতালীয় নয় যে ট্রাম্পের একজন প্রধান মদতদাতা বর্তমানে পৃথিবীর ধনীতম ব্যক্তি ইলন মাস্ক। তাঁর উপরেই ট্রাম্প দায়িত্ব দিয়েছেন সরকারী নীতিগুলি সঠিকভাবে প্রণয়ন করা হচ্ছে কি না তা দেখার। আসলে সরকারের যা যা জনহিতকারী কাজ আছে, তার সবটাই পরিকল্পনা করে ধ্বংস করার ভার দেওয়া হয়েছে দুনিয়ার বৃহত্তম পুঁজিপতির হাতে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যের ভার দেওয়া হয়েছে এমন একজন ব্যক্তির কাছে, যিনি ভ্যাক্সিনে বিশ্বাস করেন না। বিশ্বাস করেন অপবিজ্ঞানে। আইন-কানুনের ভার দেওয়া হয়েছে এমন ব্যক্তির হাতে যিনি সরাসরি ট্রাম্পের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সমর্থক এবং যাঁর আইন দপ্তরের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। এরকম বিভিন্ন ব্যক্তিকে ক্ষমতায় বসিয়ে আসলে ট্রাম্প মার্কিন রাষ্ট্র ও রাজনীতির মৌলিকভাবে উগ্র-দক্ষিণপন্থী পরিবর্তন সাধন করতে চান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল অংশ ট্রাম্পের এই যুদ্ধ ঘোষণার বিরুদ্ধে কী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন, তার উপরেই নির্ভর করবে আমেরিকার আগামী ইতিহাস।