আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ একবিংশ সংখ্যা ● ১-১৫ নভেম্বর, ২০২৪ ● ১৫-৩০ কার্তিক, ১৪৩১
সম্পাদকীয়
নাগরিক আন্দোলন ও রাজনীতি
বিগত দুই মাসের অধিক সময় ধরে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ যেই ঐতিহাসিক নাগরিক আন্দোলনের সাক্ষী থাকল, তার নজির ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে খুব বেশি নেই। একজন মহিলা চিকিৎসককে কর্মরত অবস্থায় যেভাবে নির্মমতার সঙ্গে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে তা গোটা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ইতিহাসে এর আগে কখনও হয়নি। একদিকে সরকারী হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে হত্যা করা হল আর তারপরে একের পর এক সামনে এল কীভাবে প্রকৃত সত্যকে চেপে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে, কীভাবে তথ্যপ্রমাণ লোপাট করা হয়েছে, কীভাবে নিগৃহীতার বাবা-মাকে টাকা পর্যন্ত যৌতুক হিসেবে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ, তার বিরুদ্ধে স্বাভাবিকভাবেই রাজ্যের এক বৃহদাংশের মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন।
যেহেতু ডাক্তারের সঙ্গে এই ঘটনা ঘটেছে তাঁর কর্মস্থলে, তাই স্বাভাবিকভাবেই ডাক্তারদের মধ্যে এই ঘটনা সর্বাধিক আলোড়ন ফেলেছে। বিশেষ করে, তরুণী ডাক্তার যেহেতু জুনিয়র ডাক্তার হিসেবে তাঁর স্নাতকোত্তর স্তরের পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাই তাঁর বন্ধু, জুনিয়রদের মধ্যে এই বিষয়কে কেন্দ্র করে আন্দোলনের জন্ম হয়। জুনিয়র ডাক্তার ফোরামের নেতৃত্বে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গে যেই আন্দোলন সংঘটিত হয় তা এক কথায় নজিরবিহীন। প্রথমে কর্মবিরতি পালন করে, তারপরে লালবাজার তথা স্বাস্থ্য ভবনের সামনে লাগাতার ধর্না, একের পর এক মিছিল, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বাদানুবাদ পেরিয়ে পুজোর সময় ধর্মতলায় আমরণ অনশনের মধ্য দিয়ে তারা শান্তিপূর্ণ-গণতান্ত্রিক অথচ দৃঢ় আন্দোলন কীভাবে গড়ে তুলতে হয় তার এক অসাধারণ উদাহরণ সবার জন্য, বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলির জন্য তৈরি করেছেন। তাদের আন্দোলন একদিকে যেমন ‘অভয়া’-র বিচারের দাবিকে সামনে রেখে লাগাতার মানুষের মনে সাড়া ফেলেছে, তেমনি রাজ্যের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থার জরাজীর্ণ দশা নিয়ে তাদের দাবিগুলিও জনমনে যথেষ্ট দাগ কেটেছে। আবার এ কথা মানতেই হবে যে আন্দোলনের যে মূল লক্ষ্য, অর্থাৎ ‘অভয়া’-র বিচার এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্নীতির অবসান, তা অধরা। তাই আন্দোলন এখনও চলছে। বিভিন্নভাবে এই আন্দোলন সংগঠিত হচ্ছে এবং আগামীদিনেও তা চলবে - জুনিয়র ডাক্তার-রা এই কথা জানিয়েছেন।
এই আন্দোলনকে ঘিরে বিগত প্রায় তিন মাস ধরে রাজ্যে কী কী ঘটনা ঘটে চলেছে তার দিনপঞ্জিকা আরও একবার প্রিয় পাঠকের সামনে তুলে ধরা এই সম্পাদকীয়র উদ্দেশ্য নয়। এই সম্পাদকীয়তে আমরা তাকাব এই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত দুটি বিষয়ের দিকে - প্রথমত, এই আন্দোলনে সাধারণ মানুষ তথা মধ্যবিত্তের বিপুল অংশগ্রহণ এবং দ্বিতীয়ত, এই আন্দোলনের রাজনৈতিক অভিমুখ।
একথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি কলকাতা তথা রাজ্যের অন্যান্য বড় শহরেরে মধ্যবিত্ত অংশ। আন্দোলনটি যদিও শুরু হয়েছিল একদিকে যেমন ডাক্তারদের মাধ্যমে, অন্যদিকে মহিলাদের রাতদখল কর্মসূচী এই আন্দোলনকে প্রথমবারের জন্য সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মহিলাদের আন্দোলনে পরিণত করে। ১৪ আগস্ট, ২০২৪ মধ্যরাতে পশ্চিমবঙ্গে যে অভূতপূর্ব মহিলা সমাবেশ দেখা যায় তার তুলনীয় কোনো সমাবেশের কথা অনেক ভেবেও মনে আসা মুশকিল। যেহেতু একজন নারীকে ধর্ষণের ঘটনার বিচার চেয়ে এই আন্দোলন তাই স্বাভাবিকভাবেই নারীদের মধ্যে যে এই আন্দোলনের এক বিশাল সমর্থন থাকবে তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। জনপরিসরে নারীদের উপস্থিতি বাড়ানোর দাবি বা যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে নারীদের দলমত নির্বিশেষে রাস্তায় বেরিয়ে এসে বিচার চাওয়া, রাজ্যের নারী আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্থান করে নেবে।
তবু, কিছু অপ্রিয় কথা না বললেই নয়। নারী নির্যাতন তথা ধর্ষণের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আন্দোলনের শুরুতে নারীদের যে জোরদার উপস্থিতি দেখা যাচ্ছিল এবং পরবর্তীকালেও যার খামতি খুব বেশি হয়নি, সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কিন্তু লিঙ্গ সাম্যের নিরিখে কোনো নতুন স্লোগান তথা ভাবনা উঠে এল না। ‘রাত দখল কর’-র মতন আহ্বান এক নতুন লিঙ্গ রাজনীতির রূপরেখা তৈরি করছিল, কিন্তু তারপরে সংগঠিতভাবে লিঙ্গ সাম্যের দাবি খুব বেশি করে প্রতিধ্বনিত হল না। সরকার যেখানে ‘রাতের সাথী’ বা মেয়েদের নাইট ডিউটি থেকে বিরত করার মতন কিছু মধ্যযুগীয় নীতি গ্রহণ করতে চাইল, সেখানে প্রগতিশীল সমাজের তরফে লিঙ্গ সাম্য নিয়ে নতুন ভাবনা খুব বেশি চোখে পড়ল না। যা চোখে পড়ল তা হল এই আন্দোলনেও নেতৃত্বে পুরুষদের সংখ্যাধিক্য। যেকোনো দিন টিভি-র পর্দায় দেখা যেতে লাগল একদল পুরুষ এই বিষয়ে একে ওপরের উপর চেঁচিয়ে যাচ্ছে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে। কিন্তু নারীদের অধিকার তথা নির্যাতিতার বিচারের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের নেতৃত্বে নারীদের উল্লেখযোগ্যভাবে দেখা গেল না কেন? এই নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা খুবই প্রয়োজনীয়।
দ্বিতীয়ত, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এই আন্দোলনে যারা সক্রিয়ভাবে যোগদান করেছেন, মিছিলে হেঁটেছেন, মিটিং-এ গেছেন, ধর্মতলা-স্বাস্থ্য ভবন-লালবাজারের ধর্নামঞ্চে গিয়ে জুনিয়র ডাক্তারদের নিঃশর্ত সমর্থন জানিয়েছেন তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত। গ্রামের গরীব চাষী বা শহরের অসংগঠিত শিল্পের শ্রমিকদের সমর্থন এই লড়াইয়ে থাকলেও তারা সক্রিয়ভাবে এই আন্দোলনে যোগদান করেননি। অন্যদিকে, এই আন্দোলন প্রথম থেকেই দলীয় রাজনীতির বাইরে নিজের অবস্থান রেখে এসেছে। সেই কথাটি বলতে গিয়ে বারংবার ‘অরাজনৈতিক’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে আন্দোলনের নেতৃত্বের তরফে। আরেক পক্ষ আবার যথার্থভাবেই মনে করিয়ে দিয়েছেন যে ‘অরাজনৈতিক’ আন্দোলন বলে কিছু হয় না, ওটি একটি সোনার পাথরবাটি।
এই আন্দোলন যে মধ্যবিত্তদের আন্দোলন হবে এতে অস্বাভাবিকতা কিছু নেই। ঘটনাটি ঘটেছে একটি মধ্যবিত্ত তরুণী ডাক্তারের সঙ্গে। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে মধ্যবিত্তের একমাত্র সামাজিক উন্নয়নের উপায় পড়াশোনার মাধ্যমে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে ভালো চাকরি পাওয়া। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই চাকরিটি রাজ্যের বাইরেই বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে কারণ তৃণমূলের আমলে রাজ্যে শিল্প বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। এই পরিস্থিতিতে পড়াশোনা করে ডাক্তার হয়ে অথবা শিক্ষক হয়ে সরকারী চাকরি করার প্রতি মধ্যবিত্তের একটি বিশেষ আকর্ষণ আছে। কিন্তু এই তরুণী ডাক্তারের নৃশংস পরিণতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে তৃণমূল কংগ্রেস নামক দলটি রাজ্যে যে তন্ত্রটি কায়েম করেছে তাতে মধ্যবিত্তের এই সাদামাটা স্বপ্নটিও এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত। একদিকে, স্কুল সার্ভিস কমিশন সহ বিভিন্ন সরকারী চাকরি দেওয়ার নামে তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা তাদের পকেট ভরতে ব্যস্ত থেকেছে, অন্যদিকে চাকরি পাওয়ার পরেও একটি মেয়েকে ধর্ষিতা ও খুন হয়ে যেতে হচ্ছে সরকারী হাসপাতালে। পুলিশের ন্যক্কারজনক ভূমিকা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় তৃণমূল প্রণোদিত হুমকির সংস্কৃতি তথা বেলাগাম দুর্নীতি এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের মনে এই সন্দেহ দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করেছে যে তরুণী ডাক্তারের পরিণতি আসলে তৃণমূলের গুণ্ডা তথা মাফিয়া রাজের পরিণতি। বিভিন্ন রকমের দুর্নীতি তথা তোলাবাজিতে ব্যতিব্যস্ত মধ্যবিত্ত সমাজ তাই এই ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সরব হয়ে রাস্তার আন্দোলনে সামিল হয়েছেন।
কিন্তু এই আন্দোলনকে সম্পূর্ণভাবে দলীয় রাজনীতির বাইরে রেখে মানুষ আসলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিকেও এই বার্তা দিচ্ছেন যে তাদের উপরেও আসলে মানুষের খুব বেশি বিশ্বাস নেই। দলীয় রাজনীতির যে নোংরা রূপ প্রতিনিয়ত খবরের কাগজে তথা টিভির পর্দায় ফুটে ওঠে তাতে রাজনীতির উপর বিতৃষ্ণার জন্ম হওয়াই স্বাভাবিক। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত তথা উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির বর্তমানে সরকার তথা রাজনৈতিক দলের থেকে খুব বেশি কিছু পাওয়ারও নেই। তাই তারা রাজনৈতিক দলগুলিকে দূরে সরিয়ে রেখে এত বড় আন্দোলন করতে পারেন কারণ তাদের পকেটের এবং সামাজিক জোর দুটিই রয়েছে। রাজ্যের প্রেক্ষাপটে বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ আসলে এলিট সমাজেরই নিদর্শন। তাই মধ্যবিত্ত সংখ্যায় কম হলেও তাদের গুরুত্ব অপরিসীম কারণ সমাজে জনমত প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
কিন্তু ‘অরাজনৈতিক’ আন্দোলনের একটি মৌলিক দুর্বলতা হল এই যে যেই মানুষ এই আন্দোলনে বিপুল সংখ্যায় সামিল হন, তারাই কিন্তু ভোটের সময় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে পছন্দের প্রার্থী তথা পার্টিকে ভোট দেন। এত বড় আন্দোলনের অভিঘাত রাজনৈতিক তথা নির্বাচনে পরিলক্ষিত হবে না, তা হতে পারে না। এই মুহূর্তে এই কথা বলার কোনো বাস্তব পরিস্থিতি নেই যে তৃণমূল কংগ্রেসের গদি যেতে বসেছে। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক ক্ষতির আশংকা অমূলক নয়। এই পরিস্থিতিতে আমরা মনে করি যে বামপন্থী রাজনীতির বিশেষ ভূমিকা ও গুরুত্ব রয়েছে। তৃণমূল বনাম বিজেপি-র যে বাইনারি রাজ্য রাজনীতিতে স্থাপিত হয়েছে তাকে ভাঙার সুযোগ এসেছে বামপন্থীদের সামনে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র মধ্যবিত্ত শ্রেণি এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি বলে বামপন্থীদের এই আন্দোলন সম্পর্কে কোনো বিরূপ মনোভাব রাখা কাম্য নয়। রাজ্যের বৃহত্তম বিরোধী দল বিজেপি এই আন্দোলনের চালিকাশক্তি নিজেদের হাতে আনার চেষ্টা করে বিফল হয়েছে। বামপন্থীরা সর্বান্তঃকরণে এই আন্দোলনকে সমর্থন জুগিয়ে গেছেন কোনো ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির কথা না ভেবে। এই আন্দোলন রাজ্যের মধ্যবিত্ত তথা উচ্চবিত্ত মানুষের তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বিস্ফোরণ। কিন্তু বামপন্থীদের বুঝতে হবে যে যতক্ষণ না গরীব মানুষ তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নামছে ততদিন মমতা ব্যানার্জী ভালো করেই জানেন যে তাঁর গদি টলবে না। তাই বামপন্থীদের একদিকে যেমন এই আন্দোলনের মাধ্যমে মধ্যবিত্ত জনমানসে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হবে, তেমনি তৃণমূলের বিরুদ্ধে যেই ক্ষোভ সমাজের সমস্ত শ্রেণির মানুষের মধ্যেই রয়েছে তাকে একত্রিত করার চেষ্টা করতে হবে। সমস্ত অংশের মানুষ বামপন্থীদের ছাতার তলায় এসে আন্দোলন করতে চাইবেন না। তাই বলে তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখলে চলবে না। বরং বামপন্থীদের কাজ হওয়া উচিত বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে তৃণমূল ও বিজেপি বিরোধী সমস্ত শক্তির মধ্যে সেতু তৈরি করা। সেই যোগসূত্র স্থাপন হওয়া তৃণমূল ও বিজেপি-র হাত থেকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের নিস্তার পাওয়ার জন্য একান্তভাবেই জরুরি।