আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ ষোড়শ সংখ্যা ● ১৬-৩১ আগস্ট, ২০২৪ ● ১-১৫ ভাদ্র, ১৪৩১
প্রবন্ধ
শিবঠাকুরের আপন দেশে - দ্য কিউরিয়াস কেস অফ নিউজক্লিক (পর্ব ২)
রঞ্জন রায়
জামিন পাওয়াই নিয়ম?
আমাদের দেশের ‘ক্রিমিনাল জাস্টিস’ নিয়ে কথা উঠলে বিজ্ঞজনেরা বলেন দুটো নীতির কথা।
এক, ‘জেল নয় বেল’। অর্থাৎ বিচারে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত জামিন দেওয়াটাই নিয়ম, জেলে অনির্দিষ্টকাল পচিয়ে মারা নয়। কেন? এখানেই আসছে দ্বিতীয় নীতির কথা।
দুই, বিচারে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্য্যন্ত প্রত্যেক অভিযুক্তকে নির্দোষ মনে করতে হবে। সেজন্যেই মাত্র সন্দেহ বা কারও অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো নাগরিকের স্বাধীনতা সহজে ছিনিয়ে নেওয়া উচিত নয়। তাই তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্তকে জামিন দেওয়াটাই নীতি।
কিন্তু পুলিশ যে কখনও কখনও বিনা ওয়ারেন্টে কাউকে ধরে থানায় পোরে?
হ্যাঁ, পুলিশের কাজ শান্তি রক্ষা করা, অপরাধ হলে তদন্ত করে দোষীকে আদালতে পেশ করা এবং কোনো বড় অপরাধ (কগনিজেবল অফেন্স) সংঘটিত হবার আগেই সন্দেহ বা সম্ভাবনা দেখলে কাউকে গ্রেফতার করে অপরাধ ঘটতে না দেওয়া। (ক্রিমিনাল প্রসিডিওর অ্যাক্ট, ধারা ৪১)।
এইখানেই জামিনের গুরুত্ব। পুলিশ ধরে থানায় আনলেও তাকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে পেশ করতে হবে এবং তার আগে ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে হবে (ধারা ৫৭ এবং ৫৪)।
ম্যাজিস্ট্রেট খুঁটিয়ে দেখবেন অ্যারেস্ট মেমো, বন্দী করার কারণ (রীজন) এবং আধার বা ভিত্তি (গ্রাউন্ড)। এটাও দেখবেন অভিযুক্তকে থানায় টর্চার করা হয়েছে কিনা এবং এমএলসি বা মেডিকো লীগ্যাল সার্টিফির্কেট কী বলছে। উনি খালি পুলিশের বয়ান বা মেমো দেখে সন্তুষ্ট না হয়ে অভিযুক্তকেও জিজ্ঞাসাবাদ করে নিঃসন্দেহ হবেন।
তাকে তদন্তের খাতিরে আরও আটকে রাখতে হলে পুলিশকে ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে রিমান্ড চাইতে হবে। তখন অভিযুক্তকে তার পছন্দের উকিলের মাধ্যমে আদালতে রিমান্ডের বিরুদ্ধে জামিনের জন্য যুক্তি পেশ করার সুযোগ দিতে হবে।
সাধারণ অপরাধের (নন-কগ্নিজেবল অফেন্স) ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটের সই করা ওয়ারেন্ট ছাড়া কাউকে গ্রেফতার করা যায় না। রাত্তিরে কোনো মহিলাকে বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা যায় না, যদি না সে সমন পেয়েও থানায় বা আদালতে হাজির না হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
শুনতে ভাল লাগছে। কিন্তু বাস্তবে কী হয়?
ধরুন, কোন সম্পন্ন ব্যক্তি বাড়ির কাজের লোকের বিরুদ্ধে গয়না চুরির সন্দেহে থানায় নালিশ করলেন। তখন কী হবে? পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তসাপেক্ষে ছেড়ে দেবে? তাকেও উকিলের সামনে জেরা করবে? ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে পেশ করবে?
আমরা সবাই জানি কী হয়। ওকে থানায় আড়ং ধোলাই দিয়ে বলা হবে ভালয় ভালয় জিনিসটা বের করে দে। তারপর যদি সত্যিই বোঝা যায় যে সে নির্দোষ তখন তার বাড়ির লোককে বলা হবে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে কিছু অর্থদণ্ড দিতে হবে।
এইখানেই উঠে আসে শ্রেণীর প্রশ্ন। পুলিশের এবং বিচার ব্যবস্থার সহানুভূতির পাল্লা ভদ্রলোকদের এবং বিত্তবানদের দিকে ঝুঁকে থাকে, এটা কোনো নতুন কথা নয়। কিন্তু আমরা এখন আলোচনা করছি আমাদের ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমে ঘুণ লাগা নিয়ে। প্রখ্যাত সুপ্রীম কোর্টের অ্যাডভোকেট ইন্দিরা জয় সিং একে বলছেন ‘ব্রোকেন সিস্টেম’।[১]
জামিন না দেওয়া যদি অপবাদ বা ব্যতিক্রম হয় তাহলে কখন জামিন খারিজ করা যুক্তিযুক্ত?
এক, এমন মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে জামিন পেলে অভিযুক্ত আরও এই ধরণের অপরাধ করবে।
দুই, এমন মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে জামিন পেলে অভিযুক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করবে এবং বিচার বা তদন্ত চলাকালীন সাক্ষীদের ভয় দেখাবে।
তিন, অভিযুক্ত জামিন পেলে বিদেশে পালিয়ে যেতে পারে। তাই জামিনে পাসপোর্ট জমা রাখার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়।
এছাড়া তদন্তের গোড়াতেই পুলিশ - অভিযুক্ত তদন্তে সহযোগিতা করছে না বলে - আদালতে রিমান্ড চাইতে পারে। কিন্তু তার সীমা অধিকতম ১৫ দিন।
উপরের শর্ত বা আশংকা না থাকলে জামিন দেওয়াই নিয়ম। কিন্তু আজকাল ভারতে কাউকে 'টেররিস্ট' আখ্যা দিয়ে ইউএপিএ আইনের ধারা লাগিয়ে বা বিদেশে টাকা পাচারের সন্দেহে পিএমএলএ আইনের ধারা লাগিয়ে যথাক্রমে সিবিআই, বিশেষ পুলিশ অথবা ইডি গ্রেফতার করছে এবং নীচের আদালতে জামিন হচ্ছে না। হাইকোর্টেও বলা হয় চার্জ অত্যন্ত ‘সাংঘাতিক’। কাজেই, তদন্তের স্বার্থে জামিন দেওয়া যাবে না। সুপ্রীম কোর্টও অনেক সময় ফের হাইকোর্টে বা সেশন কোর্টে যেতে বলছে।
ফলে এই জামিন পাওয়া-না পাওয়ার দোলাচলে পদ্ধতিগত খিটকেলই বিনাবিচারে শাস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি ৩০ বছরের পুরোনো মামলায় অভিযুক্তকে নির্দোষ বলে রায় দিয়ে মুক্তি দেওয়ার সময় সুপ্রীম কোর্টের বেঞ্চ মন্তব্য করেন যে দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমই কখনও শাস্তি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।[২]
এমন কেন হচ্ছে?
অভিযোগ প্রমাণের দায়িত্ব কার?
আমাদের আইন বলে ‘বার্ডেন অফ প্রুফ’ বা অভিযোগ প্রমাণের ভার প্রশাসন বা অভিযোগ কর্তার, অভিযুক্তের নয়। অ্যাডভোকেট ইন্দিরা জয়সিং-এর মতে এটি “sacred non-negotiable principle of the criminal justice system”. উনি বলছেন - ইদানীং মাদকদ্রব্য সেবন, সন্ত্রাসবাদ এবং আর্থিক অপরাধ আটকাতে যে তিনটে নতুন আইন হয়েছে তাতে এই নীতির বারোটা বাজিয়ে জামিন দেওয়াটাই অনিয়ম করা হয়েছে।[৩]
কোনো একটা অপরাধ প্রমাণ করা যাচ্ছে না, তো কী হয়েছে? লাগিয়ে দাও ‘বৃহৎ ষড়যন্ত্রের’ গল্প। ব্যস্ কেউ সহজে জামিন দেবে না। ইদানীং শুরু হয়েছে অভিযুক্তদের কাউকে রাজসাক্ষী করে তার বয়ানকেই প্রমাণ বলে জামিনের বিরোধিতা - 'নিউজক্লিক'-এর সম্পাদক প্রবীর পুরকায়স্থ এবং দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের কেস!
কিন্তু, ইউএপিএ এবং পিএমএলএ আইন জামিনের যে দুটো শর্ত দিয়েছে তাতে অভিযুক্তকেই প্রমাণ করতে হবে যে সে নির্দোষ। সিবিআই এবং ইডি, ওই দুটো আইনে, কাউকে কেবল সন্দেহের ভিত্তিতেই আটক করে জামিনের বিরোধিতা করতে পারে।
পিএমএলএ’র ধারা ৪৫ অনুসারে জামিনের জন্য দুটো শর্ত পূরণ হওয়া চাই।
এক, অভিযুক্তকে প্রাথমিক পর্যায়েই নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হবে। মানে, যথেষ্ট প্রমাণ দিয়ে আদালতকে সন্তুষ্ট করতে হবে যে প্রাথমিক দৃষ্টিতেই অভিযোগটি সারহীন।
দুই, জামিন পেলে সে কোনো অপরাধ করবে না।
বিচারক যদি ওই দুটো কঠিন শর্ত দেখে একেবারে নিশ্চিন্ত হন যে লোকটি নির্দোষ, তাহলেই সে জামিন পাবে। কিন্তু অভিযোগের গোড়াতেই এটা কীভাবে সম্ভব?
এছাড়া, ইডির আধিকারিককে জামিন না দেওয়ার জন্য তার দলিল এবং যুক্তি পেশ করার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ এবং সময় দিতে হবে।
ইডি যদি এটুকু দেখাতে পারে যে অভিযোগ গুরুতর। এমন সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে যে তদন্ত পূর্ণ করার পর্যাপ্ত সময়ে পেলে অভিযুক্তকে দোষী প্রমাণিত করা যাবে। তাই তদন্তের স্বার্থে জামিনের আবেদন খারিজ করা হোক - তাহলেই হল।
তাহলে কী দাঁড়াল?
এই আইন অভিযোগকর্তাকে নয়, বরং আচমকা বন্দী হওয়া অভিযুক্তের ঘাড়েই নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণ করার গুরুভার চাপিয়ে দিয়েছে - যা প্রায় অসম্ভব। এই দুটো আইন নিয়ে পরের কিস্তিতে আলাদা করে আলোচনা করা যাবে।
একটি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সুপ্রীম কোর্টের অধিবক্তা অভিষেক মনু সিংভির বক্তব্য থেকে বুঝতে পারি - কোনো আইনের সফল, বিফল বা কু-প্রয়োগ নির্ভর করে সরকার, পুলিস-প্রশাসন এবং বিচারব্যবস্থার মিলিত ইকোসিস্টেমে। এখন বেল খারিজ করাই নিয়ম এবং মঞ্জুর করাই ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফলে জামিন পাওয়া অনেকাংশে নির্ভর করছে অভিযুক্ত কে, অভিযোগকর্তা কে এবং শুনানি কে করছেন তার উপরে। দেখা যাক, বর্তমান ইকোসিস্টেমে কারা সহজে জামিন পাচ্ছেন, কারা নয়।
জামিনের প্রশ্নে বিচারকের মানসিকতার হাতে-গরম উদাহরণঃ
জনপ্রিয় কমেডিয়ান মুনাবর ফারুকি মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে স্ট্যান্ড আপ শো করতে গেলেন। কিন্তু শো শুরু হওয়ার আগেই গ্রেফতার। বিজেপি এমএলএ’র ছেলের অভিযোগ - ওঁর কমেডি নাকি হিন্দু বিদ্বেষী!
মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের বিচারক রোহিত আর্য ২০২১ সালে কমেডিয়ান মুনাবর ফারুকি এবং তার তিন সঙ্গীর জামিনের আবেদন খারিজ করে দেন। তাঁর রায়ে বলা হল - প্রমাণ পাওয়া গেছে যে এরা একটি সম্প্রদায়ের ধার্মিক ভাবনাকে আহত করার ষড়যন্ত্র করছে। প্রশাসনের উচিত এইসব নেগেটিভ তত্ত্বকে কড়া হাতে নিয়ন্ত্রণ করা।
এঁরা সবাই সুপ্রীম কোর্ট গিয়ে জামিন পেলেন।
এই বিচারকই কিন্তু একজন মহিলার সম্মানহানির অপরাধে অভিযুক্তকে জামিন দিলেন, শর্ত - এঁরা রাখি বেঁধে ভাইবোন পাতাবেন! সুপ্রীম কোর্ট সেই রায়কে খারিজ করে।
শ্রী রোহিত আর্য রিটায়ার করার তিন মাস পরে বিজেপির সদস্য হয়েছেন।
তিনি একটি সেমিনারে বলেছেন - রাম রাজ্যে এবং মহাভারতের যুগে ‘ন্যায়’ ছিল। কিন্তু ব্রিটিশের পেনাল কোডে শুধু ভারতীয়দের ‘শাস্তি’ দেবার কথা রয়েছে। আমরা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ পুরোনো ক্রিমিনাল কোডগুলো বাতিল করে 'ভারতীয় ন্যায় সংহিতা' আনার জন্যে।[৪]
আর একটি উদাহরণ দেখুনঃ
মার্চ ২০১০। উত্তরপ্রদেশের বরেলিতে একটি মিছিল যাওয়ার রাস্তা নিয়ে ঝগড়া থেকে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা শুরু হয়। তারপর সেই সন্দর্ভে বরেলি’র অতিরিক্ত দায়রা জজ ওখানকার ‘বরেলভী’ নামক ধার্মিক সম্প্রদায়ের মৌলানা তৌকীর রজা খানের বিরুদ্ধে রুজু একটি অপরাধিক মামলায় জামিন-অযোগ্য ওয়ারেন্ট জারি করেন এবং স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে (suo moto) CRPC 319 ধারায় সমন জারি করে আদালতে হাজির হতে আদেশ দেন।
উক্ত মৌলানা সেই আদেশের বিরুদ্ধে এলাহাবাদ হাইকোর্টে আপিল করে বলে যে নিম্ন আদালতের বিচারক মহোদয় তাঁর আদেশে এমন কিছু বাক্য লিখেছেন যা তাঁর ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতের পরিচয়। তাই মৌলানা সেখানে ন্যায় পেতে পারেন না।
যেমন, ক্ষমতায় যাঁরা আছেন তাঁদের ধার্মিক হওয়া উচিত, উদাহরণ উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ।
এলাহাবাদ হাইকোর্টের মাননীয় বিচারক রামমনোহর নারায়ণ মিশ্র ওই রায় পড়ে বললেন - নিম্ন আদালত রায়ে অনাবশ্যক কিছু মন্তব্য করেছেন যাতে বিচারকের রাজনৈতিক মেজাজ এবং ব্যক্তিগত মতামত, এমনকি নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা রয়েছে। বিচারকের থেকে নিজস্ব মতামত পছন্দ-অপছন্দের প্রকাশ রায়ে থাকা উচিত নয়। তাতে সমাজে কু-প্রভাব পড়ে।
অতএব, ওই লাইনগুলো মুছে দেওয়া হোক।
কিন্তু মাননীয় হাইকোর্ট মৌলানাকে নির্দেশ দিলেন ওই সেশন কোর্টেই গিয়ে বিধিবত জামিনের আবেদন করতে![৫]
কারা সহজে জামিন পাচ্ছেন না
ফাদার স্ট্যান স্বামী
মহারাষ্ট্রের ভীমা কোরেগাঁও ঘটনায় ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হল ঝাড়খণ্ডের মিশনারী এবং মানবাধিকার কর্মী ফাদার স্ট্যান স্বামীকে। অশীতিপর বৃদ্ধ পারকিনসনের রোগী। বলেছিলেন আমাকে এখানেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক।
কিন্তু তাঁকে কোনো প্রশ্ন না করে ফেলে রাখা হল মহারাষ্ট্রের জেলে। দুর্ভাগ্যবশত তিনি সেখানে অস্বাস্থ্যকর অবস্থায়, অল্পদিনেই মারা গেলেন। অথচ, ‘স্বাস্থ্যের অধিকার’ একটি সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার।
উমর খালিদ
জওহরলাল নেহেরু ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন ছাত্রনেতা উমর খালিদের জামিনের জন্য দ্বিতীয় আবেদন গত ২৮মে, ২০২৪ তারিখে দিল্লির করকরদুমা কোর্টের সেশন জজ খারিজ করে দিয়েছেন।
তিনি ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইউএপিএ আইনে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন। বলা হয় দিল্লি রায়টের সময় অন্ততঃ ২৩টি স্থানে উপদ্রব এবং অশান্তির পেছনে তিনিই হোতা।
না, তাঁর বক্তৃতায় কোন হিংসায় উসকানি দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঘর থেকে কোনো হাতিয়ার বাজেয়াপ্ত হয়নি। কোনো দাঙ্গার জায়গাতেও তিনি নেই। তাহলে?
তিনি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্রে’ লিপ্ত। প্রমাণ?
তদন্ত চলছে। আজও মূল মামলা শুরু হয়নি। উমরের বাবা নিচের আদালত থেকে উচ্চ এবং সর্বোচ্চ আদালত ঘুরে শেষে সুপ্রীম কোর্ট থেকে মামলা তুলে নিয়ে ফের নিচের আদালতে জামিনের আবেদন দিয়েছিলেন।
কাশ্মীরের সাংবাদিক আসিফ সুলতান জামিন পেলেন - ছ’বছর পরে!
‘কাশ্মীর ন্যারেটর’ নামের ইংরেজি পত্রিকার অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর আসিফ সুলতান তাঁর পত্রিকায় মিলিট্যান্ট কম্যান্ডার বুরহান বানীর মারা যাওয়ার কাহিনীটি প্রকাশ করার পর পুলিশ তাঁকে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ নাগাদ আন-ল’ফুল অ্যাক্টিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যাক্টে (ইউএপিএ) গ্রেফতার করে।
জম্মু-কাশ্মীর হাইকোর্ট তাঁকে এপ্রিল ২০২২ নাগাদ এই বলে জামিন দেয় যে অভিযুক্তের কোনো মিলিট্যান্ট গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্কের প্রমাণ নেই। কিন্তু পুলিশ তাঁকে পাবলিক সিকিউরিটি অ্যাক্টে (পিএসএ) ফের গ্রেফতার করে - তাতে তাঁকে বিনা বিচারে দু’বছর আটক রাখা যায়।
হাইকোর্ট গত বছরের ৭ ডিসেম্বরে এক রায়ে উক্ত আটক ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে। সুলতান ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ তারিখে ছাড়া পেলেন। পুলিশ তাঁকে ২০১৯ সালের একটি পুরোনো অভিযোগে ফের গ্রেফতার করল।
কিন্তু দু’মাস পরেই শ্রীনগরের সেশন কোর্ট তাঁকে জামিন দিল। আদেশে সন্দীপ গন্দোত্রা (অতিরিক্ত দায়রা জজ) বললেন - শুধু ইউএপিএ’র ধারায় বন্দী করলেই জামিনের আবেদন স্বতঃ খারিজ হবে - এমন নয়।[৬]
‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলার গপ্পোটি
তারিখটি ১৮ই জুন, ২০১৭। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে পাকিস্তান হারিয়ে দিল ভারতকে। কিন্তু মধ্যপ্রদেশ-মহারাষ্ট্র সীমান্তের মোহাদ গ্রামের পনেরো জন পুরুষ এবং দুই নাবালিকাকে পুলিশ গ্রেফতার করল। তারা নাকি ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ শ্লোগান দিয়েছে, পটকা ফাটিয়েছে এবং মিঠাই বিতরণ করেছে - এইভাবে দেশ এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ করেছে।
তারা জামিন পেল অতিকষ্টে, থানায় নিয়মিত হাজিরা দেবার শর্তে। আর নির্দোষ প্রমাণিত হল ছ’বছর পরে!
কোনো সরকারী সাক্ষী, হিন্দু হলেও, এই গল্পটিকে সত্যি বলেনি। এমনকি প্রধান সাক্ষী এও বলেছে যে মুসলিম বন্ধু থানায় আটকে আছে খবর পেয়ে থানায় গেলে ওসি পাঠক ওকে পেটায়, বাবাকে থাপ্পড় মারে। আর ভয় দেখিয়ে সাদা কাগজে সই করায়।
পেশায় খেতমজুর অভিযুক্তদের অনেকে থানায় পেটানোর অভিযোগ করেছে। কিন্তু ওসি’র বক্তব্য এমন কিছু হলে ডাক্তারি রিপোর্টে লেখা থাকত না?[৭]
সুপ্রীম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত জাস্টিস মদন লোকুর, অ্যাডভোকেট মনু সিংভি, অ্যাডভোকেট কপিল সিব্বলদের আলোচনায় বারবার উঠে আসে কীভাবে বর্তমান শাসকদল সিবিআই, ইডি এবং বিচারব্যবস্থাকে এমন অবস্থায় নিয়ে এসেছে যে কেউ জামিন পেলেই আমরা আশ্চর্য হই।
কারা সহজে জামিন পায়
অর্ণব গোস্বামী
'রিপাবলিক টিভি’র অ্যাঙ্কর অর্ণব গোস্বামী ৪ নভেম্বর, ২০২০ তারিখে ইন্টিরিয়র ডিজাইনার অন্বয় নায়েকের ২০১৮ সালে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার অভিযোগে গ্রেফতার হন। অভিযোগের আধার ছিল নায়েকের সুইসাইড নোট এবং তাঁর পরিবারের সাক্ষ্য। তিনি ছিলেন পুলিশের রিমান্ডে নয়, জুডিশিয়াল কাস্টডিতে।
মুম্বাইয়ের হাইকোর্ট অর্ণবের জামিনের আবেদন খারিজ করলে সুপ্রীম কোর্টের স্পেশাল বেঞ্চ তৎক্ষণাৎ তাঁকে জামিন দিয়ে মহারাষ্ট্র সরকারকে আদেশ দেয় তাঁকে এবং সঙ্গী অভিযুক্তদের ছেড়ে দিতে।
বেঞ্চের প্রধান জাস্টিস চন্দ্রচুড় (বর্তমান চিফ জাস্টিস) মৌখিক মন্তব্য করেনঃ দেশ এখন ‘লিবার্টি’ ধ্বংসের হুজুগের মধ্য দিয়ে চলছে। লোকজনকে কথায় কথায় জেলে পোরা হচ্ছে, হাইকোর্ট জামিন দিচ্ছে না। অর্ণবের চ্যানেল আমি দেখি না। কিন্তু এই জামিনের মাধ্যমে আমরা নাগরিকের স্বাধীনতার ব্যাপারে কড়া বার্তা দিতে চাই।[৮]
বুলন্দশহরে ওসি হত্যায় অভিযুক্ত জামিনে ছাড়া পেয়ে বিজেপির জোনাল প্রেসিডেন্ট!
৩রা ডিসেম্বর, ২০১৮। বুলন্দশহর অঞ্চলের সিয়ানা গ্রামে কথিত গো-হত্যার গুজব ছড়িয়ে পড়ায় উত্তেজনা ছড়ায়। পুলিস ইনস্পেক্টর সুবোধ সিং গিয়ে উগ্র ভীড়কে সামলানোর চেষ্টায় নিহত হন। জনতা তাঁর রিভলভার কেড়ে নেয়, আগুন লাগায়। আরও একজন নিহত হয়।
পুলিসি তদন্তে দেখা যায় শচিন অহলওয়াত মোবাইল থেকে ঘটনার মুখ্য অভিযুক্ত বজরং দলের স্থানীয় নেতা যোগেশ রাজকে ডাকেন। তারপর দাঙ্গা শুরু হয়। শচিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পুলিশ অফিসারকে আক্রমণ, দাঙ্গা ইত্যাদি।
তিনি জামিনে ছাড়া পেয়েছিলেন। এখন উনি উত্তরপ্রদেশের বিজেপির বুলন্দশহরের জোনাল প্রেসিডেন্ট। সুবোধ সিং-এর পরিবার আজও বিচারের অপেক্ষায়।
হে ভূমিশায়িনী শিউলি, আর কি কোনই সান্ত্বনা নেই?
আগের কিস্তিতে 'নিউজক্লিক'-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক প্রবীর পুরকায়স্থের কেসে সুপ্রীম কোর্টের রায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম।
এবারে দেখুন, ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রীর কথিত সহযোগী প্রেম প্রকাশের মামলায় সুপ্রীম কোর্টের বেঞ্চের রায়ঃ
ইডি (এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরেট) এনেছে গুরুতর অভিযোগ। অভিযুক্তের রাঁচির বাড়ি থেকে নাকি দুটো একে-৪৭ রাইফেল, ৬০টি তাজা কার্তুজ, দুটো ম্যাগাজিন পাওয়া গেছে। কাজেই অভিযুক্ত ১৮ মাস ধরে বন্দী থাকলেও জামিন দেওয়া ঠিক নয়।
জাস্টিস সঞ্জীব খান্না অ্যাডিশনাল সলিসিটর জেনারেলকে বললেনঃ জামিন পাওয়ার অধিকারের উৎস সংবিধানের মৌলিক অধিকারের আর্টিকল ২১, যাতে জীবন এবং স্বাধীন জীবনযাত্রার কথা বলা হয়েছে। আগেও মণীশ সিসোদিয়ার কেসে বলেছি, অভিযুক্তকে গ্রেফতার করার সময় থেকেই বিচার শুরু হওয়া উচিত। আর পিএমএলএ’র ধারা ৪৫-এর কড়া শর্তও কিন্তু জামিন না দেবার কথা বলে না।
• যদি অভিযুক্তকে বিনা বিচারে দীর্ঘ সময় ধরে জেলে রাখা হয়, তাহলে নিম্ন আদালত জামিন দেবার কথা ভাবতেই পারে।
• ডিফল্টে জামিন দেবার উদ্দেশ্য হল তদন্ত সম্পূর্ণ হবার আগে কেন কাউকে গ্রেফতার করবে?
• এটা বলতে পার না যে যতক্ষণ তদন্ত সম্পূর্ণ না হচ্ছে, ততক্ষণ বিচার শুরু হবে না।
• তুমি একের পর এক নতুন নতুন চার্জশীট (সাপ্লিমেন্টারি) দিয়ে অভিযুক্তের জামিনের অধিকারে বাধা দিতে পার না।
• ডিফল্টে জামিন পাওয়ার অধিকার তখন শুরু হয় যখন তদন্তকারী সংস্থা ক্রিমিনাল প্রসিডিওর কোড দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চার্জশীট পেশ করতে ব্যর্থ হয়।[৯]
আবার ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের কেসে ইডির আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ, পিএমএলএ’র কঠিন ধারা সত্ত্বেও - হাইকোর্টের অভিমতে - দাঁড়ায়নি। তিনি পাঁচমাস জেলে থাকার পর ঝাড়খণ্ড হাইকোর্ট থেকে ২৮ জুন, ২০২৪ নাগাদ জামিন পেয়েছেন।
এসব সত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়ালের বিরুদ্ধে ইডি ২০৮ পাতার সাত নম্বর চার্জশীট দিয়েছে।
একই ঘটনায় - দিল্লি সরকারের শরাব বিক্রির আবগারী নীতি এবং ঘুষ নেওয়ার কথিত অভিযোগ - ইডি’র কেসে জামিন পেলেও সিবিআই আলাদা চার্জশীট দিয়ে কেজরিওয়ালকে জেলে বন্দী রাখার পাকাপোক্ত বন্দোবস্ত করেছে।
"ওরে মন,
পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন"।
(সমাপ্ত)
তথ্যসূত্রঃ
১) ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ১৪ মে, ২০২৪।
২) নরেশ কুমার বনাম স্টেট অব হরিয়ানা, লীভ ল' পোর্টাল, ২৮, ফেব্রুয়ারি, ২০২৪।
৩) ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ১৪ মে, ২০২৪।
৪) ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ১৫ জুলাই, ২০২৪।
৫) ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২১ মার্চ, ২০২৪।
৬) ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ১৬ মে, ২০২৪।
৭) ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২১ মার্চ, ২০২৪।
৮) দি হিন্দু, ১১ নভেম্বর, ২০২৪।
৯) ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২১ মার্চ, ২০১৪।