আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ ষোড়শ সংখ্যা ● ১৬-৩১ আগস্ট, ২০২৪ ● ১-১৫ ভাদ্র, ১৪৩১

প্রবন্ধ

বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান একটা বার্তাও বটে

নিখিলরঞ্জন গুহ


বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের কারণ বিশ্লেষণ করতে হলে এমন কিছু প্রশ্ন সামনে চলে আসবে যা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকেও ভাবাবে। আপাতভাবে এই গণঅভ্যুত্থানের পেছনে তেমন কোনো অর্থনৈতিক কারণ নেই। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে একটি উদীয়মান দেশ। আর্ন্তজাতিক বিভিন্ন সমীক্ষায় বাংলাদেশের সাফল্য রীতিমতো চমকপ্রদ। মাথাপিছু জিডিপি, বেকারত্বের হার, দারিদ্রের হারকে দ্রুত নামিয়ে আনা, সার্বিকভাবে মানবসম্পদের উন্নয়ন প্রভৃতিকে বিবেচনায় রাখলে দেখা যাবে শুধু সার্কভুক্ত দেশ নয় - বিশ্বের উন্নতিশীল অনেক দেশ থেকেই এই দেশটি এগিয়ে। এমনকী অনেক ক্ষেত্রেই বিশ্বঅর্থনীতিতে পরিমাণগত দিক থেকে পঞ্চম স্থান অধিকারী ভারতের থেকেও এগিয়ে। পাকিস্তান তো ধারেকাছেই আসছে না। এক বাণিজ্যিক আলোচনাচক্রে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেয়েবাজ শরিফের বক্তব্য এই ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য - "I was quite young when... we were told that it's a burden on our shoulders... Today you all know where that 'burden' has reached (in terms of economic growth)." 25 April, 2024।

তবুও প্রশ্ন কেন এই গণঅভ্যুত্থান?

উন্নয়ন বা জীবনযাত্রার মান কোনো অবস্থাতাতেই স্বাধীনতার বিকল্প হতে পারে না - ইতিহাসের এই সার সত্যকে অস্বীকার করার অর্থ হল বিপর্যয়কে ডেকে আনা। বলা যায় প্রতিবেশী দেশের এই গণঅভ্যুথানের কারণ এই সত্যের মধ্যেই নিহিত। হাসিনা সরকার হয়তো বলপ্রয়োগের উপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠেন। সরকার যখন স্বৈরাতান্ত্রিক হয়ে ওঠে তখনই এমনটা হয়। যেহেতু সরকার পরিচালিত হয়ে থাকে রাজনৈতিক দল দ্বারা সেহেতু তার উদ্ভব ঘটে থাকে দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের বিলোপের মধ্য দিয়ে। প্রকৃত প্রস্তাবে অবিসংবাদিত নেত্রী শেখ হাসিনা ও তার তোষামুদেদের হাতে দলের সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে পড়েছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং বাহুবল হয়ে উঠেছিল নির্বাচনে জেতার প্রধান ভিত্তি। না হলে শুধু কোটা সংস্কারের আন্দোলন এমন রূপ নিতে পারে না।

এই প্রশ্নে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে তেমন গ্রাহ্য যুক্তিও নেই। কারণ জাতির পিতা স্বয়ং মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার শহিদ পরিবারের জন্য ভাতা এবং চাকরিতে ৩০ শতাংশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। সেই সঙ্গে জেলাগত, মহিলা, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী এবং বিশেষভাবে সম্পন্নদের কোটা নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিলে হাসিনা সরকারের নেতৃত্বেই ২০১৮ সালে তার বিলোপ ঘটে। তবে কিছু শহিদ পরিবার এবং কোটাপন্থীদের একটা অংশ সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে গেলে আদালত সরকার প্রদত্ত নির্দেশকে খারিজ করে দেয়। সেই রায়ে অসন্তুষ্ট সরকার সর্বোচ্চ আদালতে গেলে আদালত উচ্চ আদালতের রায়কে বাতিল করে এবং কোটা বিলোপ সংক্রান্ত সরকারের সিদ্ধান্তকেই (কোটাহীন ৯৩ শতাংশ উন্মুক্ত পদ) বহাল রাখে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কিছু বিতর্কিত মন্তব্য নিঃসন্দেহে অমানবিক যা এই আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করেছে।

মৌলিক প্রশ্নে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিরোধ না থাকলেও এই আন্দোলনের ভয়ংকর রূপ নেবার কারণ হিসেবে ভোট লুঠ করার মতোই রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মমতা সহ দলীয় বাহুবলীদের আক্রমণাত্বক ভূমিকাকে অস্বীকার করা যাবে না। তবে অন্যান্য কারণও বর্তমান ছিল। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি পছন্দমতো সরকার গঠনের প্রশ্নে নির্বাচকমণ্ডলীর অধিকার লঙ্ঘিত হওয়ায় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গঠিত হাসিনা সরকার কতটা জনগণের সমর্থনপুষ্ট প্রশ্ন ছিল তা নিয়েও। এই আন্দোলনের মধ্যে সেই ক্ষোভেরও প্রকাশ পেতে দেখা গিয়েছে। স্বৈরতন্ত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল সরকার, রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে সীমারেখা মুছে ফেলা। বাংলাদেশের মধ্যেও তার প্রকাশ ঘটতে দেখা যাচ্ছিল। ফলে সরকারের সমালোচকরা রাষ্ট্রদ্রোহিতার তকমায় ভূষিত হয়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে। গুম, হত্যা, আয়নাঘর নামে বন্দিশালায় অত্যাচারের শিকার হতে হয়েছে সন্দেহভাজন সাধারণ মানুষকে। ফলে সন্ত্রাসবাদী সহ মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কিছু ইতিবাচক ভূমিকা নিলেও বিরোধীদের নিকেশ করার রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে তাই সাধারণ মানুষকেও যুক্ত হতে দেখা গিয়েছে। মৌলবাদী এবং সন্ত্রাসবাদীরাও সেই সুযোগ নিতে পিছিয়ে থাকেনি।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব অপরিসীম। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষ নিলেও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় অবস্থান এবং কূটনৈতিক সাফল্যের কারণে বড় ধরনের ধাক্কা খেতে হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। যদিও বর্তমান ঘটনা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় তবে যুক্তরাষ্ট্র যে নিজস্বার্থে তা মানতে রাজি নয় অতীতের বিভিন্ন ঘটনা থেকে তা প্রমাণিত। তাই এই প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রর ভূমিকা নিয়ে শেখ হাসিনার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তার বিভিন্ন কথা থেকে তাকে উৎখাত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রর সক্রিয়তার বিষয়টি গত এক বছরে বারকয়েক সামনে আসতে দেখা গিয়েছে - তার মধ্যে প্রাণহানির আশঙ্কাও দেখা দিয়েছিল। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে বাইডেন প্রশাসনের ক্ষোভ বার বার প্রকাশ্যে এসেছে। বঙ্গোপসাগরের উপর নিয়ন্ত্রণ জারি রাখার জন্য এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উপর খবরদারি করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রর বাংলাদেশের দ্বীপ সেন্ট মার্টিন ব্যবহারের দাবি প্রত্যাখ্যাত হলে এই আশঙ্কা প্রত্যাশিতভাবেই বেড়ে গিয়েছিল। লক্ষ্যণীয়, এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্রর ভারপ্রাপ্ত সহসচিব ডলান্ড লুর বাংলাদেশে আসার ঠিক পরেই এই অভ্যুত্থান। একই লক্ষ্যে বাংলাদেশের নাগরিকদের পাশপোর্টের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করার মধ্যেও তার প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায় ভারতে আশ্রয় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেখ হাসিনার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য তার ভিসা বাতিল ঘোষণা এবং তার সহযোগী ব্রিটেনের দিক থেকে তার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি প্রভৃতি ঘটনা শেখ হাসিনার আশঙ্কাকে সত্য প্রমাণ করে।

অনেকেই এই ঘটনার পেছনে চিন এবং পাকিস্তানকে দেখছেন। এটা ঠিক বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রর হাসিনা যুগের সম্পর্ক যত তলানিতে গেছে ততই পাকিস্তানের সঙ্গে মিত্র যুক্তরাষ্ট্রর ঘনিষ্টতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশে মৌলবাদী ও সন্ত্রাসবাদীদের তৎপরতা বৃদ্ধির সুযোগ ঘটেছে। সেই সঙ্গে এটাও ঠিক উভয়েরই লক্ষ্য বাংলাদেশ এবং ভারতকে কোণঠাসা করা। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও সে দেশে চিনের বিপুল লগ্নি বর্তমান থাকায় চিনের কাছেও বাংলাদেশের অস্থিরতা কাম্য হওয়ার কথা নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত কারণে চিনের সম্পর্ক বর্তমান থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী চিন বাংলাদেশ তথা বঙ্গোপসাগরের উপর মার্কিন কর্তৃত্ব মেনে নেবে এমন ভাবনা অমূলক। বানিজ্য বা অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশকে নিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র চিন এবং ভারতের মধ্যে ঠান্ডা লড়াই জারি থাকলেও এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তার রোধের প্রশ্নে এই দুই রাষ্ট্রের সমস্বার্থ বর্তমান। ভারতের বর্তমান প্রশাসন নিজেকে যেভাবেই প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করুক না কেন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারত এখন একটি সন্দেহজনক রাষ্ট্র এবং সেই সঙ্গে ভারতকে এটাও মনে রাখতে হবে স্বাধীনতা পরবর্তীতে দেশের যে কোনো সংকটকালে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসভঙ্গের ইতিহাস সর্বজন স্বীকৃত। সেই সঙ্গে তার অবস্থান থেকেছে ভারতের বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষে। তাই বাংলাদেশের এই অস্থিরতার কারণ বিশ্লেষণের প্রশ্নে শুধু সীমান্তবিরোধ বা বানিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে দেখলে ভুল হবে। বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য নীতির প্রেক্ষিতে বিষয়টিকে দেখতে হবে। এটাও উল্লেখের দাবি রাখে বাংলাদেশের এই অস্থিরতা যেমন একটি অবাঞ্ছিত ঘটনা তেমনই তার পেছনে এমন ষড়যন্ত্র যদি সত্যিই হয়ে থাকে তবে বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে তার দায় ভারত এড়াতে পারে না।

আর্ন্তজাতিক বিধি অনুসারে কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ না থাকলেও ষড়যন্ত্রের বিপদ সম্পর্কে সতর্কীকরণ এবং তার জন্য তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ করার দায় ভারতের থেকে যায়। এই প্রশ্নে ভারতীয় গুপ্তচরের ব্যর্থতাকে শুধু প্রকট করে তুলেছে তাই নয় দেশকেও একটা কঠিন পরীক্ষার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। সেই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনায় ভারপ্রাপ্ত রাজনৈতিক দলগুলির কাছে বাংলাদেশের এই ঘটনা একটি বার্তা বিশেষ। মনে রাখতে হবে রাষ্ট্র বিরোধী যে কোনো ষড়যন্ত্র তখনই সাফল্য পায় যখন সে তার উর্বর ক্ষেত্র খুঁজে পায় এবং গণতান্ত্রিক পরিসরের সংকোচনের সঙ্গে যার ঘনিষ্ট সম্পর্ক বর্তমান। গণতন্ত্র সংকোচনের বিকল্প কখনওই উন্নয়ন হতে পারে না। আধিপত্যকামী দেশগুলি এই দুর্বলতাকে ভিত্তি করেই দেশে দেশে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে থাকে। দেশের স্বার্থে তার ব্যাংক এবং তৈলখনির জাতীয়করণ এবং মূল্যনির্ধারণের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ প্রভৃতিতে স্বার্থে আঘাতপ্রাপ্ত যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের চক্রান্তের শিকার হতে হয়েছিল সাদ্দাম হোসেনকে। প্রায় একইভাবে মার্কিন চাপে ইউরোপিয়ন ইউনিয়নে যোগ দিতে আপত্তি থাকার কারণে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। অস্থির গণতন্ত্রই সেখানে যুক্তরাষ্ট্রর হাতিয়ার ছিল। ইতিহাসের শিক্ষা - গণতন্ত্রের বিপন্নতা দেশের বিপন্নতার বড় কারণ। এই মুহূর্তে হাসিনাকে আশ্রয়দানের প্রশ্নে ভারতকে বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে দেখা গেলেও যারা শহিদ হয়েছে তাদের হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনা বর্তমান বাংলাদেশের তদারকি সরকারের সামনে একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সেখানে অভিযুক্ত শেখ হাসিনাকে তাদের হাতে তুলে দেবার দাবি শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিহিংসা স্পৃহা এখানে কতটা ভূমিকা নেবে তার উপর ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান অনেকটাই নির্ভর করবে। বাংলাদেশের বর্তমান তদারকি সরকারের প্রধান পশ্চিমী ঘেঁষা ড. মহম্মদ ইউনুস এই প্রশ্নে আপসের পথে হাঁটবেন বলে মনে হয় না।