আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ ষোড়শ সংখ্যা ● ১৬-৩১ আগস্ট, ২০২৪ ● ১-১৫ ভাদ্র, ১৪৩১

প্রবন্ধ

যা ব্যক্তিগত, তাই রাজনৈতিক?

রূপক বর্ধন রায়


"আমরা... প্রথম যে বিষয়টি আবিষ্কার করি তা হল ব্যক্তিগত সমস্যা আসলে রাজনৈতিক সমস্যা। এই মুহূর্তে কোনো ব্যক্তিগত সমাধান সম্ভব নয়। শুধুমাত্র সমষ্টিগত পদক্ষেপের মাধ্যমেই সমষ্টিগত সমাধান সম্ভব।"

'যা ব্যক্তিগত, তাই রাজনৈতিক' (The Personal is Political) নামক বিখ্যাত এক প্রবন্ধে উপরোক্ত কথাটা লিখেছিলেন ক্যারল হানিশ (Carol Hanisch)। সময়টা ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯। কে এই হানিশ? ১৯৬০ এবং ১৯৭০-এর দশকের দ্বিতীয় তরঙ্গের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রীয় নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম মুখ এই হ্যানিশ। আরও হাজারো বিপ্লবী কাজের মধ্যে 'The Personal Is Political' নামক এই কালজয়ী লেখায় হ্যানিশ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার রাজনৈতিক গুরুত্ব মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলেন। লেখাটি তথাকথিক 'অরাজনৈতিক' নারী-মানসকে বেশ খানিকটা তরঙ্গায়িত করেছিল, সেই সময়ে।

এইবার মূল প্রসঙ্গে আসি। বিগত দিনে ঘটা "মেয়েরা রাতের দখল নাও" আন্দোলনকে অরাজনৈতিক বলে দাগিয়ে দেওয়ার একটা প্রচেষ্টা চলছে বিভিন্ন মহলে। ওয়াকিবহাল মানুষরা বলতে চাইছেন, এই আন্দোলন মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ঊর্ধ্বে। আর কিছু মানুষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অথবা নিজেদের অজ্ঞতার অছিলায় 'অরাজনৈতিক' কথাটা এমন অবজ্ঞাভরে ব্যবহার করছেন, শুনে প্রথমেই আমার উক্ত হ্যানিশের লেখাটার কথা মনে পড়ে গেল। আমরা হ্যানিশের আলোয় আমাদের সমস্যাটাকে একটু বোঝার চেষ্টা করবো।

প্রথমত ঘটনাটার উপকেন্দ্রে রয়েছে প্রধান দুটো ফেনোমেনা। রাজ্যের মাননীয়া, তার পার্টি এবং মেশিনারি ঠিক কী কী করতে পারে; আরও একটু বড়ো পরিসরে বললে ক্ষমতার তখ্তে বসা যে, সে ক্ষমতা রক্ষা করতে কী না করতে পারে সে কথা আমাদের রাজ্য তথা দেশ তথা গোটা পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ খুব ভালো করে জানেন। কেউ বোকা নন। কাজেই ক্ষমতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে হঠাৎ এক রাতে রাস্তায় নামার পরিস্থিতি তৈরি হতে গেলে একটা শক বা একটা কাঁপুনির প্রয়োজন। এবং সেই অভিঘাতকে অবশ্যই ব্যক্তিগত হতে হবে। আমার বাড়ির মানুষেরও এমন অবস্থা হতে পারে, এই শঙ্কাটা মনে দানা বাঁধতে হবে।

প্রথমত, আমরা যারা চাকুরিজীবী, আমাদের কাছে নিজের বাড়ি বা বাসস্থানের পরেই যে জায়গাটা সবথেকে সুরক্ষিত হয়, সেটা অফিস। বা যে মানুষ যে বিল্ডিং বা কল-কারখানায় কাজে যায়, সেটা। ভেবে দেখুন, বাড়ি থেকে বেরিয়ে অফিসে ঢোকার পর আমাদের বাড়ির প্রত্যেকেই একটা ফোন বা হোয়াটস্অ্যাপ মেসেজ আশা করেন। আমরা জানাই, হ্যাঁ ঠিকঠাক পৌঁছে গেছি। অর্থাৎ আমরা এবং আমাদের কাছের মানুষের কাছে বাড়ি এবং কর্মস্থল উভয়ই সেফ জোন। রাস্তাটুকুতেই যেটুকু ভয়, একবার পৌঁছে যেতে পারলেই নিশ্চিন্ত। এই ঘটনায় সেই বিশ্বাসটুকু নড়ে গেছে। কাজের জায়গাটুকুও আর নিশ্চিন্ত আশ্রয় নয়, এই ভাবনা আমাদের ৯ই অগস্টের পরের রাতগুলোয় ঘুমোতে দেয়নি; টেনে বের করে এনেছে রাস্তায়। কাজেই ব্যাপারটা কর্মস্থলে ব্যক্তি সুরক্ষা, এবং যে মানুষটাকে, প্রতিষ্ঠানকে, রাজনৈতিক শক্তিকে আমি আমার সেই সুরক্ষার দায়ভার দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছি, এই উভয়কেন্দ্রিক। কাজেই সমস্যাটা ব্যক্তিগত, এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক।

দ্বিতীয় সমস্যাটির বয়স লক্ষ না হলেও অন্তত কয়েক হাজার বছর; যৌনতাকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহারের ব্যবসা, ধর্ষকামের বাজার। পুরুষতন্ত্র যাকে দ্বিতীয় লিঙ্গ বা সেকেণ্ড সেক্স বলে দাগিয়ে রেখেছে, তার মতে যে শারীরিকভাবে এক কমনীয় দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্গত, এই বীভৎস মজা তাকে তার অওকাত দেখানোর রাজনীতি। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন যে শুধু শরীরে নন, যে মানুষ মনে, মনন, ব্যবহার, সহমর্মীতা এবং সংবেদনশীলতার কারণে এক নির্দিষ্ট আদিপুরুষোচিত ব্র‍্যাকেটের আওতায় পড়ছেন না, মানব-ইতিহাসের সর্বত্র পুরুষতন্ত্রের চোখে সেই জৈবিক সত্ত্বাটি দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ইত্যাদি শ্রেণীর আওতাতেই পড়বেন। এবং তাকে বারবার তার 'ক্লাস' মনে করিয়ে দেওয়ার সহজতম উপায় যৌন নিপীড়ন। আর সে নিপীড়নের উদভাস যত কদর্য, যত বীভৎস, ততই জোরালো তার ব্যাকস্টেজে কলকাঠি নাড়া প্রথম-লিঙ্গের মনস্তাত্ত্বিক আস্ফালন। একটা স্টেটমেন্ট! যেমন র‍্যাগিং! আর আজ পুরুষতন্ত্রের সেই মুক্ত আস্ফালন এমনই বিকারের রূপ নিয়েছে যে আমার আপনার মনে হচ্ছে আজ বাদে কাল আমার সন্তানের সঙ্গেও তো এমনই হতে পারে। আদি জগদ্দলসম পুরুষতন্ত্র তার নাগরিক মুখোশ খুলে আমার আপনার উঠোনে প্রলয়নৃত্যে উন্মত্ত। তাকে মারার আগে বেঁধে ফেলতে হবে, সেই প্রয়োজনীয়তা আমার আপনার শোবার ঘরের ব্যাপার, লিঙ্গ রাজনীতির ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা আমাদের রাত জাগতে বাধ্য করছে।

কাজেই এই আন্দোলন একাধারে ব্যক্তিগত, এবং রাজনৈতিক। এই রাজনীতি কর্মস্থলে নিরাপত্তার, দেহের স্বাধীনতা-স্বকীয়তার, আমার ঘর বাঁচানোর রাজনীতি। তাই বলি, 'অরাজনৈতিক' বলে কিছু হয় না! পার্টি পতাকা যাদের হাতে থাকছে না, তাদের যারা অরাজনৈতিক বলছেন, তাদের অনেকেই বঙ্গ রাজনীতির মুড়ো এবং ল্যাজ, উভয়দিকের ক্ষীর খেতেই যে বেশি আগ্রহী তা স্পষ্ট। তাই, এবার তারা একটু চুপ করুন। যা চেঁচামেচি করার টিভি পর্দার খেউড়ে করবেন না হয়। সহনাগরিক তথা ভিন্ন লিঙ্গের মানুষ হিসাবে লড়াইকে সলিডারিটি ও কুর্নিশ জানাই, বিশ্বাস রাখি এই সমন্বয় সফল হবেই। হ্যাঁ, "যা ব্যক্তিগত, তাই রাজনৈতিক!"