আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ ষোড়শ সংখ্যা ● ১৬-৩১ আগস্ট, ২০২৪ ● ১-১৫ ভাদ্র, ১৪৩১

প্রবন্ধ

রাজনীতির মানুষ যখন লেখক

সুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়


একটা ছেলে, সেলসের ছোটখাটো চাকরি করে। বাড়ি থেকে দূরে দূরে, ছোট শহরে, জেলায় মফস্বলে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। নাওয়া খাওয়ার ঠিক থাকে না, অনিশ্চিত রাতের ঠিকানাও।তার সামনে শুধুই টার্গেট, বিক্রির নির্দিষ্ট অংক মাসের শেষে পূরণ করার চাপ। তাই জীবন মানে শুধু ছুটে চলা এবং ছুটে চলা। বাড়িতে যুবতী বোন রয়েছে, রবীন্দ্রসংগীত শেখে। রয়েছেন বয়স্ক বাবা-মা। গোটা সংসারের ভার এখন তার নিজের কাঁধে। স্বপ্ন দেখে, একদিন তার বোনেরও গানের অনুষ্ঠান হবে কলকাতার রবীন্দ্র সদনে। ছেলেটির নাম গৌরব সরকার।

এই গৌরব আমাদের চারপাশের মধ্য ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত জীবনে, ঘরে ঘরে রয়েছে। গৌরব বা গৌরবদের জীবন সংগ্রামের সঙ্গে একাত্ম হতে আমাদের তাই বেশি বেগ পেতে হয় না। গত শতাব্দীর শেষ লগ্নে বা এই শতাব্দীর আরম্ভে যারা কৈশোর অতিক্রম করে, পা রেখেছিলেন যৌবনে তাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, ঐ দিনগুলোর কথা। তারা নিশ্চয়ই মনে করেন যুগসন্ধির প্রতিনিধি। নয়-এর দশকের মুক্ত অর্থনীতির পালে হাওয়া খাটিয়ে ভারতবর্ষ ও তার সমাজ এবং অর্থনীতি যখন নতুন স্রোতে ভেসে চলা শুরু করেছে সবে, আমরা নতুন জীবনযাত্রা ও মূল্যবোধ নিয়ে বাঁচতে শিখছিলাম, বিশ্বায়নের পরে, গৌরবদের গল্প সেই সময়কার।

পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীদের জীবন তখন, দু' দশকের বেশি সময় বামপন্থা ও বামপন্থী সরকারের ছত্রছায়ায় থাকতে-থাকতেও পুঁজিবাদের বিপ্রতিপে সমাজ ও রাজনীতির চর্চা করতে করতে এক ধরনের স্থিতাবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। সেই সময়, কালের নিয়মে অনিবার্যভাবে, বিশ্বায়নের ঢেউ এসে তছনছ করে দিল যাবতীয় বামপন্থী চেতনা ও মূল্যবোধকে। দীর্ঘদিন ধরে যে চেতনায় প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা, হরতাল, মানছিনা-মানবনা, ও পুঁজির সঙ্গে সংঘর্ষই - নিত্যদিন ছিল বাঙালি রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ তা এবার বদলাতে শুরু করবে।

এই শতাব্দীর গোড়ার যৌবন, এক আশ্চর্য সংকটে পড়ে গেল। জীবনের বাস্তবতাকে স্বীকার করে, সে বিদ্রোহী বিপ্লবী হতে পারল না আবার মুক্ত অর্থনীতির খোলা হাওয়ার স্রোতে সাবলীলভাবে ভেসে যেতেও পারছিল না। এই লেখার শুরুর গল্পের গৌরব সরকারের মতো।

গৌরব, গল্প হলেও সত্যি অথবা সত্যি থেকেই গল্প। আসলে, গৌরব হচ্ছে এই শতাব্দীর শুরুতে লড়াকু যৌবনের প্রতীক, যে কঠিন পৃথিবীতে চাইছে, নিজেকে ও তার পরিবারকে নিয়ে টিকে থাকতে। রুটি-রুজি ও অন্নবস্ত্রের সংস্থানের জন্য তার প্রয়োজন একটা কাজ কিন্তু কাজের পৃথিবীর একঘেয়েমি নষ্ট করে দিতে চায় তার সুকুমার বৃত্তিগুলোকে, তার সংবেদনশীল মনটাকে।

বাংলার সদ্য প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী, শ্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নাটক - 'পোকা'-র কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিল গৌরব সরকার। বিদেশি সাহিত্যের ধাঁচায় বা আশ্রয়ে রচিত হলেও আসলে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন, যৌবনের সংকট, অস্তিত্বের সংগ্রাম ও যুবকদের কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তাকে।

একদিকে প্রশাসক, অন্যদিকে সংবেদনশীল, অনুভূতিপ্রবণ লেখক ও নাট্যকার বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিশ্চয় অনুভব করেছিলেন যৌবনের বেদনা, আর্তি ও সংগ্রাম।

প্রতিযোগিতার বিশ্বে, নতুন প্রজন্ম কীভাবে তার স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে, শ্রমিকের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে - এইসব চিন্তা একদিকে যেমন তার বামপন্থী চেতনাজুড়ে ছিল, নতুন পৃথিবী ও পুঁজিব্যবস্থার সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে কিভাবে তা কর্মসংস্থানের কাজে ব্যবহার করা যায় তাও ভাবিত রেখেছিল মুখ্যমন্ত্রীকে।

মুখ্যমন্ত্রীর পদে আসীন হয়ে, তাই বিক্ষোভ, বন্ধ-হরতালের চেনা রাস্তা থেকে সরে এসে, পুঁজির সঙ্গে সহাবস্থানের রাস্তায় হাঁটতে চাইলেন তিনি। নতুন করে শুরু হল, যৌবনের স্বপ্ন দেখা। কাজের হাত কিম্বা চিন্তার মস্তিষ্ক, অথবা শ্রমের ঘাম এবার পরিযায়ী হবে না রাজ্য কিংবা দেশের বাইরে - রাজ্যেই হবে কর্মসংস্থান। এমনটাই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল শতাব্দীর শুরুর অনেকেই।

হয়তো এতদিনকার প্রথাগত বামপন্থা অথবা আরও বিশেষ করে বললে যারা ক্ষুব্ধ ছিল পার্টির ওপর তাদের অনেকের মধ্যেও ক্রমাগত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। শুধুমাত্র স্বপ্ন নয়, শুধুমাত্র মুখের আশ্বাস নয় বরং ভাবনাকে কাজে পরিণত করার আপ্রাণ চেষ্টায় তাঁর কোনও খামতি যে নেই, বুঝতে পারছিল সবাই। কাজেই, নাট্যকার বুদ্ধদেব যখন নাকি তাঁর নাটকের মধ্যে প্রতিফলিত করছিলেন যৌবনের কষ্ট-যন্ত্রণা বিধ্বস্ত ও খান-খান হয়ে যাওয়া স্বপ্ন, মানুষ বুঝতে পেরেছিল, হৃদয়ের অন্তস্থল থেকেই উঠে এসেছিল তাঁর রচিত নাটক, কোনো সাজানো মেকি সহমর্মিতা ছিল না। ছিল না হাততালি ও জনপ্রিয়তা কুড়োবার চেষ্টা।

পরবর্তী সময়ে ভাবনাকে বাস্তবায়িত করতে গিয়ে, কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি নিশ্চয়ই হয়েছিল, পরিণামে পরাজিত হতে হয় নির্বাচনে, অবসান হয় বামপন্থী সরকারের। সরকারী নীতির প্রতিবাদে ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে ওঠে রাজ্যজুড়ে কিন্তু, সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী বহু মানুষ সরকারের বিরোধিতা করলেও তাঁর সততা তাঁর চেষ্টা এবং তাঁর আন্তরিক ইচ্ছেকে মনে মনে সম্মান জানিয়ে গেছেন। ভ্রান্ত রাজনীতির পোকামাকড় কখনও দংশন করতে পারেনি বুদ্ধদেবকে। শেষ বিদায়কালেও তিনি, অর্জন করলেন অসংখ্য মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। যে জনগণ, তাঁকে ভোটে পরাজিত করেছেন, তাঁরাই শেষ যাত্রায় চোখের জল মুছতে মুছতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, এর থেকে বড় প্রাপ্তি একজন সমাজকর্মীর আর কি হতে পারে? স্বপ্ন সফল না হলেও মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পেরেছিলেন, লেখক ও শিল্পীসত্তা, সমাদৃত হয়েছিল বাঙালির কাছে।