আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ ষোড়শ সংখ্যা ● ১৬-৩১ আগস্ট, ২০২৪ ● ১-১৫ ভাদ্র, ১৪৩১

সমসাময়িক

পরিবেশ বিপর্যয়


বিগত ৩০শে জুলাই গোটা দেশ জানল এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের খবর। কেরালার ওয়েনাডে লাগাতার বৃষ্টির পরে বিরাট ভূমিধ্বস নামে। সেই বিপর্যয় কেরালার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা হিসাবে দেখা দেয়। প্রায় ৪৪২ জন নিহত, ৩৯৭ জন গুরুতর আহত এবং ১২৯ জনের বেশী মানুষ নিখোঁজ। এত ব্যাপক বিপর্যয়ের পরে যথারীতি রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের ভিতর এক টানাপোড়েন শুরু হয়ে যায়। একদিকে রাজ্য সরকার একে জাতীয় বিপর্যয় দাবি করে ত্রাণ ও উদ্ধারের জন্য বিশেষ অর্থসাহায্য দাবি করে। এটা কোনো দুর্বোধ্য বিষয় নয় যে এই মাপের দুর্যোগ মোকাবিলা ও দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্গঠনের জন্য কোনো রাজ্য সরকারের কাছেই পর্যাপ্ত অর্থ থাকেনা। ফলে রাজ্য সরকার স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্রের মুখাপেক্ষী হয়েছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রণোদনা থেকে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার যথারীতি বিষয়টিকে তাদের দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে উদ্যোগী হয়। একে তো জাতীয় বিপর্যয় ঘোষণা করা হয়নি, বরং কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করতে থাকেন যে রাজ্যের সরকারকে নাকি আগে থেকেই অতিবৃষ্টির খবর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাজ্য সরকার সেই সতর্কবার্তা কানে নেয়নি এবং মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়নি বলে এত প্রাণহানি হয়েছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিয়ে কেন্দ্রের সরকারের এ জাতীয় রাজনীতি অবশ্য নতুন নয়। বিজেপি বিরোধী শক্তির দখলে থাকা রাজ্যের প্রতি এহেন বৈমাত্রেয়সুলভ আচরণ তারা আগেও করেছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থভান্ডার তারা কেবল দলীয় রাজনীতি দেখেই উন্মুক্ত করেন।

রাজনীতির এই চুলোচুলিকে সরিয়ে রেখেই বরং অন্য একটি গভীর প্রশ্নের দিকে নজর রাখা যাক। যে প্রশ্নের সমাধান কেবল একটি রাজনৈতিক তর্জা নয়, বরং এই গ্রহে মানুষের স্থায়িত্বের প্রশ্ন। প্রকৃতির সাথে লাগাতার যে অন্যায় মানব সভ্যতা করে চলেছে তার বিষময় ফল ফলতে শুরু করেছে। প্রশ্ন হল এর শেষ কোথায়? আমরা কি এখনও প্রকৃতির পরিবর্তনকে ধামাচাপা দিয়ে প্রথম বিশ্ব ও তৃতীয় বিশ্বের লড়াই জারি রাখব, নাকি সমস্যাটিকে কোনদিনই স্বীকার করব না? এই আলোচনার গণ্ডী বিস্তৃত কিন্তু দেশীয় রাজনীতির প্রশ্নে, ভূরাজনৈতিক প্রশ্নে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা প্রসঙ্গে এ আলোচনা প্রাসঙ্গিক এবং স্পষ্ট রাজনৈতিক সমাধান আজ কাম্য। মুশকিল হল দেশের কোনো রাজনৈতিক দলই এই সমস্যাটিকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসাবে স্বীকার করেন না, বা করলেও দলীয় রাজনীতির লাভ-ক্ষতির হিসাবে সমস্যাটিকে অদেখা করে রাখেন।

'ডাউন টু আর্থ' পত্রিকা এবং 'সেন্টার ফর সায়েন্স এন্ড এনভায়রনমেন্ট'-এর সমীক্ষা জানাচ্ছে ২০২৩ সালে কেবল ভারতবর্ষেই বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এখনও অবধি প্রায় ২,৯২৩ জন মারা গিয়েছেন, ১.৮৪ লক্ষ হেক্টর কৃষিজমি নষ্ট হয়েছে, ৮০,৫৬৩টি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে, ৯২,৫১৯ প্রাণিসম্পদ নষ্ট হয়েছে। 'ইন্টারন্যাশনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টার' (আইডিএমসি) জানাচ্ছে ২০২৩ সালে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ মানুষ বন্যার জন্য স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছেন। বিগত বছর জুন মাসে আসামে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার ফলে প্রায় ৯১ হাজার মানুষ নিজেদের বাসস্থান ছাড়তে বাধ্য হন। খোদ রাজধানী দিল্লীতেই যমুনা নদীতে বন্যার ফলে ২৭ হাজার মানুষ স্থানান্তরিত হন। হিমাচল প্রদেশ ও সিকিমে বন্যার ফলে প্রাণহানি ও ব্যাপক সম্পত্তিহানি ঘটে। তিস্তায় বন্যার স্মৃতি তো আজও তাজা। আইডিএমসি জানাচ্ছে যে ২০২৩ সালে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতে প্ৰাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে প্রায় ২ কোটি ৬৪ লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়েছেন, সর্বস্ব হারিয়েছেন। এদের অধিকাংশই যে সমাজের নিম্নবিত্ত গরীব মানুষ তা বলাই বাহুল্য। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এরাই সবচেয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হন, এরাই সবচেয়ে বেশী ঝুঁকির মুখে।

এই বিপর্যয় কেবল প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা নয়, এর সাথে জুড়ে থাকে মানুষের ভূমিকা। বিগত কয়েক বছরে পার্বত্য হিমালয়ে একাধিকবার ভূমিধ্বস ঘটেছে। যার ফলে বহু প্রাণহানি ঘটেছে। এর মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পার্বত্য হিমালয় জুড়ে অপরিকল্পিত সড়ক ও শহর নির্মাণ। এর পাশাপাশি এই বছর গোটা উত্তর ভারত এক অভূতপূর্ব তাপপ্রবাহে আক্রান্ত হয়। আইআইটি গাঁধীনগরের একদল গবেষক জানাচ্ছেন যে আগামী কয়েক বছরে ভারতে তাপপ্রবাহের মাত্রা আরও বাড়বে। তার কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছেন বাতাসে গ্রীন হাউস গ্যাসের মাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং তার ফলে আঞ্চলিক জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটে যাওয়া। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার কারণ ঢিলেঢালা পরিবেশ সুরক্ষা আইন এবং অপরিকল্পিত নির্মাণ ও তথাকথিত শহুরে উন্নয়ন। আমাদের দেশের পরিবেশ সুরক্ষা আইন এতই শিথিল যা সেই আইনের ফাঁক গলে দূষণকারী শিল্প সহজেই গড়ে তোলা যায়। এর সাথে যুক্ত হয় সরকার ও প্রশাসনের সর্বক্ষেত্রের দুর্নীতি।

ভারতের মতো দেশে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। প্রথমত আজও এই দেশ কৃষিপ্রধান, অর্থাৎ দেশের সিংহভাগ মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষিক্ষেত্র। ফলে জাতীয় আয়ের এক বড় অংশ কৃষিজাত পণ্য বা তার প্রক্রিয়াকরণ থেকে আসে। ঘনঘন প্রাকৃতিক বিপর্যয় এই ক্ষেত্রকেই আগে প্রভাবিত করে। এর মূল কারণ হল সরকারের কৃষিনীতি যা আজও মাঝারি, ছোট ও প্রান্তিক কৃষককে আর্থিকভাবে লাভবান করে না। ফলে কৃষিক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটে না। তাই জলবায়ুর পরিবর্তনে এই ক্ষেত্র আগে বিপর্যস্ত হয়। এ ব্যতীত দেশের শ্রমশক্তির বেশিটাই আজকে স্বল্প মজুরির কায়িক শ্রমে নিযুক্ত যেখানে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা নির্ভর করে আবহাওয়ার উপর। চরম আবহাওয়া যা শরীরের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতাকে কমায় তা ভারতের মতো দেশে অসংগঠিত ক্ষেত্রের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এর সাথে যুক্ত হয় বিপর্যয়ের জন্য হওয়া আর্থিক ক্ষতি যা একাধারে ক্ষতি এবং পরবর্তীতে বয়ে আনা বাড়তি ব্যয়। ফলে পরিবেশ নিয়ে এদেশের সরকারের বাড়তি মাথাব্যথা থাকা উচিত যা আজও অনুপস্থিত।

রাজনীতির প্রেক্ষিত থেকে তাই পরিবেশ ও প্রকৃতির বিপর্যয়, বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে আলোচিত হওয়া দরকার। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে এদেশের কোন রাজনৈতিক দলই এই প্রশ্নের সমাধান নিয়ে ভাবিত নন। যে দেশ আজ জনসংখ্যায় সর্বাধিক, সেই দেশ তার বিপুল অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে গিয়ে প্রকৃতির আরও বিপর্যয় ঘটাবে নাকি গোটা বিশ্বকে এক নতুন দিশা দেখাবে তা নির্ভর করছে কেন্দ্রের রাজনৈতিক শক্তির দৃষ্টিভঙ্গীর উপর।

কিন্তু আমরা হতাশার সাথে দেখছি যে কেন্দ্র সরকার এই বিষয় নিয়ে আদৌ ভাবিত নন। তথাকথিত বিশ্বগুরু 'বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন'-এ গিয়ে দেশকে কার্বন নিঃসরণমুক্ত করার কথা ঘোষণা করে এসেই তাঁর নিজের পছন্দের শিল্পপতিদের দেশের জঙ্গল জমি ইজারা দিয়ে দিচ্ছেন খনি তৈরী করতে। এইসব প্রকল্প যে বিপুল বনাঞ্চল নষ্ট করে তৈরী হচ্ছে তা তাদের চিন্তার বিষয় নয়, বরং এই প্রকল্পের বিরোধীদের পারলে তারা জেলে ভরেন।

এদেশের মানুষের জ্বালানির চাহিদা বিপুল। কিন্তু কেন্দ্র সরকার আজও কোন পরিবেশবান্ধব ও সস্তার বিকল্প জ্বালানির জন্য গবেষণায় টাকা ঢালতে নারাজ। শেষ কেন্দ্রীয় বাজেটে গোটা দেশে গবেষণাখাতে ব্যয় ছাঁটাই হয়েছে। ফলে নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন যা কিনা পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো উন্নয়নের মডেল হাজির করতে পারে, তার সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হবে। এর পাশাপাশি তারা কেন্দ্রীয় বাজেটে জলবায়ু ও আবহাওয়ার পর্যবেক্ষণে বরাদ্দ কমিয়েছেন যা আগামীদিনে আরও বেশী মানুষকে বিপর্যয় প্রভাবিত করবে। এটি স্বতঃসিদ্ধ যে বিপর্যয়ের আগাম বার্তা বিপর্যয়ের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেক কমিয়ে দিতে পারে। ফলে দেশের সরকার যে এই জলবায়ু ও প্রকৃতির পরিবর্তন নিয়ে আদৌ ভাবিত এমন কোনও প্রমাণ মেলে না। অন্যদিকে তারা প্রতিবেশী দেশের সাথে বিবাদে যত আগ্রহী তার কিয়দংশও যদি তারা ভালো উদ্দেশ্যে লাগাতেন তাহলেও হতো।

চীন দেশটি যে আজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অন্যতম অগ্রবর্তী দেশ তা সন্দেহাতীত। কিন্তু আমাদের দেশের সরকার তাদের সাথে প্রযুক্তির আদানপ্রদানে চীনের প্রাচীর তুলে বসে আছেন। ফলে আধুনিক প্রযুক্তির প্রবেশ এদেশে সীমিত। অন্যদিকে ইউরোপ ও আমেরিকার সাথে যাবতীয় চুক্তি তারা করেছেন কেবল যুদ্ধাস্ত্র ও তার প্রযুক্তি হস্তান্তরের। ফলে তা দিয়ে যে দেশের জলবায়ু সমস্যার আদৌ সমাধান হবে তা নিছকই দুরাশা। অন্যদিকে দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজেকে যতই বিশ্বগুরু সাজান জলবায়ু রক্ষায় তার আবেদনে যে কোনও দেশ সাড়া দেবেনা তা তিনি নিজেও জানেন। ফলে একদিকে সরকার যেমন পরিবেশবদলগত প্রশ্ন নিয়ে উদাসীন অন্যদিকে বিরোধীদলগুলিও একই দোষে দুষ্ট। তারাও এই গতানুগতিক রাজনৈতিক মডেলের বিকল্প কোন সমাধান খুঁজে পাননি। উন্নয়নের কোনও বিকল্প পথ তারা দেখাতে পারেননি। ফলে আগামীদিনে এই দেশ আরও আরও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে এবং গরীব প্রান্তিক মানুষ সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এই পরম্পরা চলতেই থাকবে।