আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ ষোড়শ সংখ্যা ● ১৬-৩১ আগস্ট, ২০২৪ ● ১-১৫ ভাদ্র, ১৪৩১
সমসাময়িক
ভাঙা মানচিত্রের স্বপ্ন
ভারতীয় জনতা পার্টির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বলেছেন, “যদি উত্তরবঙ্গকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অংশ হিসেবেই দেশের উত্তর-পূর্বের কাউন্সিলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে উত্তরবঙ্গ কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলি তার থেকে ন্যায্য অংশ পাবে এবং এই অঞ্চলের উন্নয়ন হবে। আমি মনে করি না যে, রাজ্য সরকারের এই প্রস্তাবে কোনো আপত্তি থাকবে।” সঙ্গে সঙ্গে বিজেপি-সমর্থিত রাজ্যসভার সাংসদ নগেন্দ্র রায়, ওরফে অনন্ত মহারাজ, বলেছেন, দেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে উত্তরবঙ্গকে অন্তর্ভুক্ত করার আগে কেন্দ্রের উচিত বৃহত্তর কোচবিহার রাজ্যের দাবি মেনে নেওয়া। নগেন্দ্র রায় 'গ্রেটার কোচবিহার পিপলস্ অ্যাসোসিয়েশন'-এর একজন নেতা এবং ২০২৩ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি বিধায়কদের সমর্থনে রাজ্যসভাতে নির্বাচিত হন।
পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের দাবিতে সোচ্চার কার্শিয়াং-এর বিজেপি বিধায়ক বিষ্ণু প্রসাদ শর্মা, বলেছেন, সুকান্ত মজুমদার যদি উত্তরবঙ্গকে উত্তর-পূর্বে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেন তবে প্রথমে রাজ্যকে ভাগ করা উচিত।
এদিকে ঝাড়খণ্ড থেকে নির্বাচিত বিজেপির লোকসভা সদস্য নিশিকান্ত দুবে, লোকসভায় দাবি করেন, বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অভিবাসীদের আগমনের ফলে পশ্চিমবঙ্গের কিছু অংশকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মালদা, মুর্শিদাবাদ, বিহারের আরারিয়া, কিষাণগঞ্জ, কাটিহার এবং ঝাড়খণ্ডের সাঁওতাল পরগণাকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করার দাবি করেন।তিনি বলেছেন, ২০০০ সালে ওই রাজ্যে জনজাতি সম্প্রদায়ের সংখ্যা ছিল ৩৬ শতাংশ। আর আজকে সেই সংখ্যা হয়েছে ২৬ শতাংশ।
২০১১ সালের জনশুমারি অনুযায়ী ঝাড়খণ্ডের জনজাতি সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা ছিল ২৬.২ শতাংশ। ২০০১ সালে ওই রাজ্যে জনজাতি সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা ছিল ২৬.৩ শতাংশ। ২০২১ সালে কোভিদের কারণে জনশুমারি হয়নি। কোথা থেকে বিজেপি লোকসভা সদস্য ঝাড়খণ্ডে ৩৬ শতাংশ জনজাতি সম্প্রদায়ের জনসংখ্যার এই তথ্য পেলেন তা জানাতে হবে। সম্পূর্ণ ভুল তথ্য দিয়ে তারা প্রথমেই চাইছে দেশের জনজাতিদের মুসলমান বিদ্বেষী করতে।
তিনি লোকসভায় বলেছেন, “মালদা এবং মুর্শিদাবাদের লোকেরা আমাদের লোকদের তাড়িয়ে দিচ্ছে এবং হিন্দু গ্রামগুলি খালি হয়ে যাচ্ছে।”
পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যাচ্ছে, নিশিকান্ত দুবের এই বক্তব্য সম্পূর্ণ উস্কানিমূলক। হিন্দু ও মুসলমান, জনজাতি ও মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করতে, ঘৃণার বাতাবরণ সৃষ্টি করতে এইসব তথ্যহীন কথা বলা হয়েছে। স্বাধীনতার আগের থেকেই মুর্শিদাবাদ ও মালদা - দুই জেলাতেই ঐতিহাসিক কারণে মুসলমান সংখ্যাধিক্য ছিল। ২০১১ সালের জনশুমারি অনুযায়ী মুর্শিদাবাদ জেলার মুসলমান ও হিন্দু জনসংখ্যা যথাক্রমে, ৬৬.২৭ শতাংশ ও ৩৩.২১ শতাংশ। ২০০১ সালে এই জনসংখ্যা ছিল যথাক্রমে, ৬৩.৭ ও ৩৫.৯ শতাংশ। ২০০১ ও ২০১১ সালের মধ্যে এই জেলায় মুসলমান জনসংখ্যা তুলনায় ২.৬৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। মালদা জেলাতে ২০১১ সালে হিন্দু ও মুসলমান জনসংখ্যা যথাক্রমে ৪৭.৯৯ ও ৫১.২৭ শতাংশ।
জনসংখ্যা নিয়ে বিজেপি-র এই রাজনীতি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। আসল কথা হচ্ছে এই যে মুসলমান এবং হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের মহিলার ক্ষেত্রেই জন্মহার নিম্নমুখী, যদিও মুসলমান মহিলাদের ক্ষেত্রে এই হার একটু বেশি। ২০১৯-২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু মহিলাদের মধ্যে জন্মহার ছিল ১.৪৭ আর মুসলমান মহিলাদের ক্ষেত্রে এই হার ২.০৭। অর্থাৎ উভয় সম্প্রদায়ের মহিলার ক্ষেত্রেই জন্মহারের মাত্রা ২.১ এর নিচে, যেই মাত্রা থাকলে জনসংখ্যা স্থিতিশীল থাকে। মুসলমান নারীদের যত দ্রুত ক্ষমতায়ন করা সম্ভব হবে, তাদের মধ্যেও অবশ্যম্ভাবীভাবে জন্মহার আরও কমবে, যেমন বাংলাদেশে ক্রমশ ‘প্রতিস্থাপন হার’ কমছে।
পশ্চিমবঙ্গকে খণ্ড খণ্ড করবার পরিকল্পনা কারা করছে?
একাদিক্রমে বিগত এক মাসের মধ্যে বিজেপির এই রাজ্য ও পাশের রাজ্যের নেতাদের রাজ্যকে ভাগ করবার বিভিন্ন পরিকল্পনা ও তার সঙ্গে মুসলমান জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা থেকে বেশ বোঝা যায় এর পিছনে আছে ‘আরএসএস’ এবং তার তাত্ত্বিকবাহিনী।
পশ্চিমবঙ্গে ক্রমাগত নির্বাচনী ব্যর্থতার পর আরএসএস-এর মদতে বিভিন্ন রাজ্যের বিজেপি নেতৃত্ব নতুন করে ধুয়ো তুলেছে রাজ্য ভাগের। এর পিছনে প্রধান কারণ রাজ্যের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা। দেশের থেকে, রাজ্যের থেকে, মানুষের থেকেও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হল রাজ্যের ক্ষমতা দখল। তাই তাদের নতুন দাবির মধ্যে আছে মুসলমান অধ্যুষিত জেলা নিয়ে একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গড়ার পরিকল্পনা। এর মধ্যে দিয়ে তাদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি আরও জোরদার হবে, হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে আতঙ্ক ও পারস্পরিক অবিশ্বাস দৃঢ় হবে।
এই তাদের আকাঙ্ক্ষা।