আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ ষোড়শ সংখ্যা ● ১৬-৩১ আগস্ট, ২০২৪ ● ১-১৫ ভাদ্র, ১৪৩১

সম্পাদকীয়

ধর্ষকদের কঠিনতম শাস্তি চাই


বিগত ১৩ বছর ধরে রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ও তাদের দ্বারা লালিত-পালিত দুষ্কৃতিরাজ, পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্যটিকে যেই অতল গহ্বরের দিকে ক্রমাগত নিয়ে চলেছে, তার অবশ্যম্ভাবী পতনের শেষে যেই নিকষ কালো অন্ধকার রয়েছে তারই সুযোগ নিয়ে আর জি কর মেডিকেল কলেজে এক তরুণী ডাক্তারকে ভয়াবহ ধর্ষণ ও খুন করা হয়েছে। সেই ডাক্তারের ধর্ষণ ও হত্যাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতি ইতিমধ্যেই উত্তাল। তার বিশদ বিবরণে যাওয়া এই সম্পাদকীয় প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য নয়। আমরা বরং কিছু অন্য প্রশ্ন এই প্রেক্ষিতে তুলতে চাই।

প্রথমত, সম্ভবত ভারতের চিকিৎসার ইতিহাসে একজন সরকারী ডাক্তারকে তার কর্মক্ষেত্রে ধর্ষণ ও হত্যা করার ঘটনা নজিরবিহীন। যখন আপনি সরকারী কাজে ডিউটিতে রয়েছেন তখন আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব সরাসরিভাবে সেই সরকারী প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু এই ক্ষেত্রে দেখা গেল যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশে এফআইআর নথিবদ্ধ করলেন না, করলেন মৃতার বাবা-বা। শুধু তাই নয়, প্রাথমিকভাবে পরিবারকে ফোন করে জানালো হল যে তাদের বাড়ির কন্যা আত্মহত্যা করেছে। কেন এই মিথ্যা কথা পরিবারকে জানানো হল? কোন তথ্য গোপন করছে সরকার তথা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ? এখনও অবধি এর কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। বরং দেখা গেল যে হাসপাতালের অধ্যক্ষকে রাতারাতি অন্য হাসপাতালের অধ্যক্ষ বানিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হল। মাননীয় হাইকোর্ট এই ধাপ্পাবাজি ধরে ফেলে উক্ত অধ্যক্ষকে সরাসরি ছুটিতে যেতে বলে। কোন প্রভাবে, কার অনুপ্রেরণায় আর জি করের অধ্যক্ষ এত ক্ষমতাশালী হয়ে উঠলেন যে তাঁকে কোথাও স্থানান্তরিত করা যায় না, যদিও তার বিরুদ্ধে প্রচুর অভিযোগ জানিয়েছেন হাসপাতালের ডাক্তার-রা। এবং এই ভয়াবহ ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পরে তার অপদার্থতা এবং অসংবেদনশীল আচরণ দেখে সাধারণ মানুষের মনে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে তিনি কি কাউকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদের মধ্য দিয়েই প্রকৃত তথ্য উদ্ধার হবে।

পুলিশ একজন সিভিক ভলান্টিয়ারকে এই মামলায় গ্রেপ্তার করেছে। সেই সিভিক ভলান্টিয়ারের বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ আগে থেকে রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। বিনা অনুমতিতে পুলিশের বাইক নিয়ে সে নাকি ঘুরত। এলাকার মানুষকে নিজের পরিচয় দিত পুলিশের কর্মচারী হিসেবে এবং তার ভিত্তিতে তাদের ভয় দেখাত। কিন্তু পুলিশ এইসব কিছুই নাকি জানত না। এমনকি সাংবাদিক সম্মেলনে এই ব্যক্তির পরিচয় দেওয়ার ক্ষেত্রেও পুলিশের বড়কর্তারা দ্বিধান্বিত ছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এহেন ব্যক্তি এতকাল ধরে পুলিশের নামে দাদাগিরি করে বেড়ালো, কিন্তু পুলিশ তাকে থামাতে পারল না কেন? এই প্রশ্ন তোলা এই কারণে জরুরি যে তাকে গ্রেপ্তার করে শাস্তি না দেওয়ার ফলে সে এত বড় অপরাধ সংঘটিত করতে পারল।

অবশ্য এমন কথা মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে এই ব্যক্তি একা এই ভয়াবহ কান্ডে যুক্ত ছিল না। এই ঘটনা একাধিক মানুষ ঘটিয়েছে, যা ঘটনার ভয়াবহতা এবং নৃশংসতা থেকে অনেকেরই মনে হয়েছে। কিন্তু পুলিশ এই বিষয়ে চুপ। এমন কেস ডায়েরি তারা বানিয়েছে, যা দেখে মহামান্য হাইকোর্ট ক্ষিপ্ত। তারা পুলিশকে তিরস্কার করে গোটা মামলা সিবিআই-এর হাতে দিয়ে দিয়েছে। এখন সিবিআই কী করে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে আপামর রাজ্যবাসী।

তৃণমূল বিগত ১৩ বছর ধরে যেই অন্ধকার গোটা রাজ্যে ছড়িয়েছে তার মধ্যে নারীদের উপর নির্যাতন শীর্ষ স্থানে আসবে। এমন নয় যে সমস্ত ধর্ষণ অথবা নারী নির্যাতনের ঘটনা তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীরা ঘটিয়েছে। কিন্তু যখনই কোনো ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে রাজ্য রাজনীতি তোলপাড় হয়েছে তৃণমূলের আচরণ বরাবরই এই সন্দেহ মানুষের মনে জাগিয়েছে যে তারা নির্যাতিতার পক্ষে নয়, ধর্ষকদের পক্ষে যেন সওয়াল করছে। পার্ক স্ট্রীট, কামদুনি, ধূপগুড়ি, হাঁসখালি ইত্যাদি ধর্ষণের পরে মুখ্যমন্ত্রীর বিভিন্ন রকম বক্তব্য এবং তাঁর দল ও প্রশাসনের একাংশের চূড়ান্ত অসংবেদনশীল আচরণ মানুষের মনে তাদের সম্পর্কে যে বীতশ্রদ্ধভাব তৈরি করেছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

১৪ আগস্ট রাত্রে যেই সংখ্যায় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মহিলারা গোটা রাজ্যে রাজপথের দখল নিলেন তার থেকে প্রমাণিত যে ক্রমাগত কর্মক্ষেত্রে ও অন্যান্য জনপরিসরে মহিলাদের বিরুদ্ধে যে লাগাতার অত্যাচার চলে তার বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ সহ্যসীমার উপরে চলে গেছে। ১৪ আগস্ট রাত্রে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে যেই জনসমাগমের ছবি আমরা প্রত্যক্ষ করলাম তার সঙ্গে তুলনীয় কোনো ঘটনা নিকট অতীতে রাজ্য রাজনীতিতে ঘটেনি। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, আর জি করের ঘটনার বিচার চেয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন রাজ্য তথা দেশের সীমানা পেরিয়ে অন্যান্য রাজ্য এবং দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

এই জনজাগরণ রাজ্যের লুম্পেন শ্রেণি ও তাদের মদতদাতাদের পছন্দ হয়নি। তাই সেদিন রাত্রে মিছিলের সময় তারা আর জি কর হাসপাতালে এক ভয়াবহ আক্রমণ চালায়। সেই আক্রমণে আর জি কর হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ভেঙে তছনছ করে দেওয়া হয়। খবরে প্রকাশ যে দুষ্কৃতিরা সেই অভিশপ্ত ঘর যেখানে মহিলা ডাক্তারকে ধর্ষণ ও খুন করা হয়, তা ভাঙতে চেয়েছিল। তারা আন্দোলনকারীদের মঞ্চ ভেঙে ফেলেছে, ডাক্তার-নার্স-রুগী সবাইকে ভয় দেখিয়েছে, লাগাতার পুলিশের সঙ্গে রাস্তায় খণ্ডযুদ্ধে মেতে থেকেছে। পুলিশ যথারীতি এই দুষ্কৃতিদের প্রায় অবাধে হাসপাতালের ভিতরে ভাঙচুর করতে দিয়েছে। টিভি-র পর্দায় গোটা দেশ দেখেছে যে পুলিশ এবং RAF ঘটনাস্থলে থাকা সত্ত্বেও তারা দুষ্কৃতিদের এই তাণ্ডবলীলা চালানো থেকে থামাতে পারেনি বা থামানোর চেষ্টা করেনি। আর জি কর হাসপাতালে এত বড় ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে সেই হাসপাতালেই মানুষের প্রতিবাদের দিন ভাঙচুর করা বা আন্দোলন মঞ্চ ভেঙে দিলে কার লাভ সেকথা রাজ্যের শিশুরাও বোঝে। এমনকি যুদ্ধের সময়েও হাসপাতাল আক্রমণ করা আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ। অথচ একটি গণতান্ত্রিক রাজ্যে পুলিশ প্রশাসনের সামনে একদল দুষ্কৃতি হাসপাতালের ভিতরে এই ভয়াবহ আক্রমণ চালালো। এরা মানবতার শত্রু এবং এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, সে তারা যেই দলেরই সদস্য হোক না কেন। তা যদি না হয়, তাহলে পুলিশ প্রশাসনের উপরে মানুষের ভরসা উঠে যাবে।

১৪ আগস্ট, স্বাধীনতার আগের রাতে রাজ্যের সাধারণ মানুষ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে তারা নারী নির্যাতন এবং লুম্পেনরাজের থেকে স্বাধীনতা চান। এবং অবশ্যই আর জি করের ঘটনার প্রকৃত দোষীদের সাজা চান। কিন্তু এত বড় জমায়েতের মধ্যে নেমে বিজেপি ঘোলা জলে মাছ ধরতে চাইছে। তাদের মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে হাথরস এবং উন্নাওয়ের সময় তাদের ভূমিকা মানুষ জেনে গেছেন, তারাও ধর্ষকাম মানসিকতার এক অর্থে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, বিলকিস বানোর ধর্ষকদের মুক্তি দিয়েছেন। তাই তাদের মুখে নারী স্বাধীনতার কথা মানায় না।

তৃণমূলের অপশাসনের বিরুদ্ধে এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটি গণতান্ত্রিক দাবি-সমূহ তৈরি করে তাকে ভিত্তি করে আন্দোলন করার দায়িত্ব রাজ্যের বাম ও প্রগতিশীল অংশকে নিতে হবে। অবিলম্বে গোটা আর জি কর প্রশাসনের অপসারণের দাবি করা উচিত। তার সাথে কর্মক্ষেত্রে যৌন নির্যাতন এবং মহিলা নির্যাতনের বিরুদ্ধে কড়া আইন তৈরি করার দাবি জানানো উচিত। ২০১২ সালে নির্ভয়া কাণ্ডের পরে নতুন আইন তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তা যে খুব বেশি কাজে দিচ্ছে না তা একের পর এক যৌন নির্যাতন এবং ধর্ষণের ঘটনা থেকেই স্পষ্ট। বিশেষ করে রাজ্যস্তরে এই ধরনের আইন, কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিধি তৈরি করার দাবি জানানোর দায়িত্ব বামপন্থীদেরই নিতে হবে। তবে সর্বোপরি আর জি করের মহিলার হত্যার প্রকৃত শাস্তি দেওয়ার দাবিতে অনড় থেকে এই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে নয়, নারী স্বাধীনতা এবং লিঙ্গসাম্যের দাবিতে আন্দোলন করে একটি প্রগতিশীল দাবিসনদ জনগণের সামনে রেখে আগামী আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে হবে রাজ্যের বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে। মানুষ অপেক্ষা করছেন এই নিকষ কালো অন্ধকার কবে কাটবে। আলো জ্বালানোর কাজে এগিয়ে আসুন রাজ্যের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সমস্ত মানুষ।