আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ পঞ্চদশ সংখ্যা ● ১-১৫ আগস্ট, ২০২৪ ● ১৬-৩১ শ্রাবণ, ১৪৩১

সমসাময়িক

প্রশাসনের গৈরিকীকরণ?


রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ-র জন্মশতবর্ষ সমাগত। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ অর্থাৎ আরএসএস-এর রাজনৈতিক সংগঠন এখন কেন্দ্রের জোট সরকারের মুখ্য পরিচালক। হয়তো যথাযথভাবে আরএসএস-এর জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে সরকারি কর্মীদের প্রত্যক্ষভাবে আরএসএস-এর ক্রিয়াকর্মর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ছাড়পত্র দেওয়া হল। বলা যেতে পারে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘর জন্য জন্ম শতবর্ষর উপহার!

এর ফলে সরকারি প্রশাসনে ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে খোলাখুলি সঙ্ঘের অনুপ্রবেশ ঘটবে বলে অভিযোগ তুলেছে বিরোধীরা। অন্যদিকে, শাসকদলের তরফে কেন্দ্রীয় সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানানো হয়েছে।

১৯২৫-এ কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার প্রতিষ্ঠিত হিন্দুত্ববাদী সংগঠন 'আরএসএস' অতীতে তিনবার নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছে। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধী হত্যার পরে আরএসএস প্রথমবার নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছিল। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই পটেল আরএসএস-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সংগঠনের অনেক নেতাকে কারারুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ১৯৪৯-এর জুলাই পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছিলেন বল্লভভাই। এ বিষয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের চিঠির জবাবে বল্লভভাই লিখেছিলেন, "আমার মনে কোনও সন্দেহ নেই যে, হিন্দু মহাসভার একটি কট্টরপন্থী অংশ গান্ধীহত্যা ষড়যন্ত্রে জড়িত। সরকার এবং দেশের অস্তিত্বের পক্ষে আরএসএস বিপজ্জনক।" গান্ধীহত্যার আগে ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় কংগ্রেস, মহাত্মা গান্ধীর পাশাপাশি জাতীয় পতাকাকেও আক্রমণ করে বিতর্কে জড়িয়েছিল আরএসএস। আরএসএস-এর মুখপত্র ‘অর্গানাইজ়ার’-এ সঙ্ঘের তৎকালীন কর্ণধার এম. এস. গোলওয়ালকর লিখেছিলেন, "হিন্দুরা কোনও দিনই তিন রঙের পতাকা মানবেন না, কারণ তাঁরা তিনকে অশুভ মনে করেন!" শেষ পর্যন্ত অবশ্য সঙ্ঘ পরিবার মুচলেকা দিয়ে ভারতের জাতীয় পতাকার প্রতি আনুগত্য স্বীকার করার পরে নরম হয়েছিলেন বল্লভভাই। ধৃতেরাও মুক্তি পেয়েছিলেন। যদিও এখনও নিয়মিতভাবেই সঙ্ঘের নেতা-কর্মীদের একাংশের নামে গান্ধী-ঘাতক নাথুরাম গডসের নামে জয়ধ্বনির অভিযোগ ওঠে।

১৯৭৫-এ সালে ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন কেন্দ্রীয় সরকার আরএসএস এবং জামাত-ই-ইসলামির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। উন্মত্ত করসেবকদের হামলায় অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ধ্বংস হওয়ার পরে আরএসএস-এর উপর তৃতীয় তথা শেষবার নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর। সেই সময় আরএসএস-এর পাশাপাশি 'বিশ্ব হিন্দু পরিষদ', 'বজরং দল' এবং কট্টরপন্থী মুসলিম সংগঠন ‘জামাত-ই-ইসলামি হিন্দ’ ও ‘স্টুডেন্টস ইসলামিক মুভমেন্ট অফ ইন্ডিয়া’ (সিমি)-কেও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখযোগ্য ব্রিটিশ সরকারের আমলে আরএসএস কখনও নিষিদ্ধ হয়নি।

পরবর্তী সময়ে আরএসএস-এর উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলেও সরকারি কর্মীরা সাধারণত প্রত্যক্ষভাবে আরএসএস-এর (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ) ক্রিয়াকর্মর সঙ্গে যুক্ত হতেন না। সম্ভবতঃ যেকোনও রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সরকারি কর্মীদের জড়িত না থাকার সাধারণ নিষেধাজ্ঞাকে মান্যতা দেওয়ার প্রক্রিয়া এক্ষেত্রে কার্যকরী হয়েছিল।

তা সত্ত্বেও ১৯৬৬-তে কেন্দ্রীয় সরকার একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল। তাতে সমস্ত স্তরের সরকারি কর্মচারী এবং আধিকারিকদের আরএসএস-এর কর্মসূচিতে যোগদান নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৭০ এবং ১৯৮০ সালে তার মেয়াদ বাড়ানো হয়। অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলেও কার্যকরী ছিল সেই নিষেধাজ্ঞা। [OM No. 3/10(S)/66-Estt.(B) dated 30.11.1966, OM No. 7/4/70-Estt.(B) dated 25.07.1970 and OM No. 15014/3(S)/80-Estt.(B) dated 28.10.1980]. গত ৯ জুলাই, ২০২৪ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অধীন কেন্দ্রীয় কর্মীবর্গ এবং প্রশিক্ষণ বিভাগের জারি করা এক বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে। [F. No. 34013/1(S)/2016-Estt.(B), New Delhi the 9th July, 2024]. প্রশ্ন উঠেছে যে এত দেরিতে খবরটি প্রকাশিত কেন হল।

সরকারি বিজ্ঞপ্তির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এর রহস্য। বিজ্ঞপ্তির বিষয় হিসেবে লেখা হয়েছে - "Participation of the Government servants in the activities of RSS - regarding". রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ সাধারণত আর.এস.এস. বলেই পরিচিত। তাকে 'রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ' লিখতেই এত বিলম্ব। 'আরএসএস'-কে হঠাৎ করে 'রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ' আখ্যা দেওয়া কি অজ্ঞতাপ্রসূত না কি ইচ্ছাকৃত। এ নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সুপারিশ করা যেতেই পারে!

তবে এই বিজ্ঞপ্তি জারির সঙ্গে সঙ্গেই ঝুলি থেকে বিড়াল বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। কলকাতা হাই কোর্টের জনৈক বিচারপতি অবসর নেওয়ার সময় বিদায়ী ভাষণে ঘোষণা করেছেন যে নিজেকে আরএসএসের সদস্য হিসাবে পরিচয় দেওয়ার সাহস তাঁর রয়েছে। সেই সঙ্গে তাঁর মন্তব্য, ‘‘ওই সংগঠনেই আবার ফিরতে চাই।’’

মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্ট আরও এক ধাপ এগিয়ে এ বিষয়ে মন্তব্য করেছে। ২৫ জুলাই, ২০২৪ একটি ডিভিশন বেঞ্চ মন্তব্য করেছে যে সরকারি কর্মচারী এবং আধিকারিকদের আরএসএস-এর কর্মসূচিতে যোগদান নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে সরকার ৫৮ বছর দেরি করে ফেলেছে। আরএসএস-এর মতো একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংগঠনে সরকারি কর্মচারী এবং আধিকারিকদের যোগদান নিষিদ্ধ থাকায় অনেকেই বঞ্চিত হয়েছেন।

কিছুদিন আগেই ইউপিএসসি-র চেয়ারম্যান পদত্যাগ করে জানিয়েছেন যে তিনি গুজরাতের স্বামীনারায়ণ সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি মিশনে নিজেকে নিয়োজিত করতে চাইছেন। ২০২০-তেই তিনি দীক্ষা নিয়েছিলেন। সেই সময়ই তিনি ওই মিশনের একজন সন্ন্যাসী হিসেবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও রয়েছে বলে শোনা যায়। এর আগে তিনি ২০০৫ বদোদরায় 'এম. এস. ইউনিভার্সিটি'র সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। জুন ২০১৭ সালে ইউপিএসসি-তে যোগদানের আগে, তিনি দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে তিনটি মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। ইউপিএসসি-র চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি ২০২৯ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে পারতেন। তিনিও এখন ধর্মীয় কাজকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে চাইছেন।

ধর্ম পালন, ধর্ম প্রচার ইত্যাদি ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। এটি কোনো আপত্তিকর বিষয় নয়। কিন্তু সেই অবস্থান বজায় রেখে প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক পদে থেকে যথাযথভাবে কর্তব্য পালন সম্ভব? কর্তব্যকর্ম কি প্রভাবমুক্ত থাকতে পারে? জটিল প্রশ্ন। উত্তর কে দেবে?