আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ পঞ্চদশ সংখ্যা ● ১-১৫ আগস্ট, ২০২৪ ● ১৬-৩১ শ্রাবণ, ১৪৩১
সম্পাদকীয়
অশান্ত বাংলাদেশ
বাংলাদেশে শ্বাসরুদ্ধকর এক ভয়াবহ পরিস্থিতির আপাত অবসান হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণ (কোটা) সংস্কারের দাবিতে গড়ে তোলা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একটানা বিক্ষোভ, হাতাহাতি-মারামারি, নাশকতা, দ্বিশতাধিক মানুষের প্রাণহানি, ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ জারি - সব মিলিয়ে জীবনযাত্রা থমকে গিয়েছিল। যদিও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে হয়তো আরও কিছুটা সময় লাগবে বলে আন্দাজ করা হচ্ছে। সেনাবাহিনী কখন ব্যারাকে ফিরবে সেটি এখনও পরিষ্কার নয়, কারফিউ পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়নি, ইন্টারনেট পুরোপুরি ফিরে আসেনি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। তবে ২১ জুলাই, ২০২৪ সুপ্রিম কোর্ট এই বিষয়ে যে রায় দিয়েছে তা স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে ৯৩ শতাংশ নিয়োগ মেধার ভিত্তিতে করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসূরিদের জন্য ৫ শতাংশ, সমাজের পিছিয়ে পড়া নৃ-গোষ্ঠী-র জন্য (চাকমা, মারমা, ব্রু, রিয়াং ইত্যাদি) ১ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্যে ১ শতাংশ আসন সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহিলাদের জন্য আলাদা করে কোনো সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়নি। আন্দোলনকারী ছাত্রীরাও নিজেদের জন্য কোনো কোটা দাবি করেনি। বরং উচ্চকণ্ঠে এমন দাবির বিরোধিতা করেছিল।
সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণ (কোটা) বিষয়ে সংস্কারের দাবিতে গত ১৬ই জুলাই থেকে ২১শে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে একটানা নজিরবিহীন বিক্ষোভ আর সহিংস আন্দোলন হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের বিক্ষোভ আগে কখনোই দেখা যায়নি। এতো কম সময়ের মধ্যে দ্বিশতাধিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনা আগে ঘটেনি। আহত হয়ে কতজন হাসপাতালে অথবা বাড়িতে চিকিৎসাধীন রয়েছে তার খবর প্রকাশিত হয়নি। আন্দোলন দমনের জন্য প্রশাসন যেভাবে দমন-পীড়ন চালিয়েছে, গ্রেফতার করেছে সর্বোপরি প্রাণহানি ঘটিয়েছে তা নিন্দনীয়। অভিযোগ এখনও গ্রেফতারি বন্ধ হয়নি। নিহতদের জন্য শোকপ্রকাশের মুহূর্তে একই সঙ্গে তাদেরও নিন্দা করতে হবে যারা এই ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিল।
বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের একটি গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। ১৯৫২-র রক্তক্ষয়ী ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১-এ জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। তারপরেও বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীরা। কিন্তু এত হিংসাত্মক ও নাশকতামূলক বিক্ষোভ এর আগে কখনও হয়নি।
১৯৭২ সাল থেকেই সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাংলাদেশে চালু হয়। মুক্তিযোদ্ধা, তাঁদের সন্তান-সন্ততিদের জন্য চাকরিতে আলাদা আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা হয়েছিল। এ ছাড়া নারী, প্রত্যন্ত অঞ্চলের নৃ-গোষ্ঠী (চাকমা, মারমা, ব্রু, রিয়াং ইত্যাদি) এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষণের সুযোগ ছিল। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দাদের জন্যও কিছু সংরক্ষণ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। সবমিলিয়ে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে যে সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু হয়েছিল, তাতে মেধার ভিত্তিতে মাত্র ২০ শতাংশ নিয়োগের সুযোগ ছিল। বাকি ৮০ শতাংশ ছিল জেলার সংরক্ষিত আসন। তার মধ্যেই ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা এবং ১০ শতাংশ যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মহিলাদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল।
১৯৭৬ সালে প্রথমবার সংরক্ষণ ব্যবস্থায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়। বৃদ্ধি করা হয় মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ। মোট নিয়োগের ৪০ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে বরাদ্দ করা হয়। বাকি ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা, ১০ শতাংশ নারী, ১০ শতাংশ যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারী এবং ১০ শতাংশ নিয়োগ জেলার বাসিন্দাদের জন্য বরাদ্দ করা হয়।
১৯৮৫ সালে সংরক্ষণ ব্যবস্থায় আবার পরিবর্তন আসে। সেই সংস্কারের সময় সরকারি চাকরিতে মেধার ভিত্তিতে ৪৫ শতাংশ নিয়োগ নির্ধারিত হয়। বাকি ৫৫ শতাংশের মধ্যে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা, ১০ শতাংশ নারী এবং ৫ শতাংশ পিছিয়ে পড়া নৃ-গোষ্ঠীর জনজাতিদের জন্য বরাদ্দ করা হয়। এছাড়া ১০ শতাংশ জেলার জন্য নির্ধারিত হয়েছিল।
১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের সংরক্ষণ ব্যবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তাঁদের সন্তানদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০০২ সালে বলা হয়, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ আসনে উপযুক্ত প্রার্থী না পাওয়া গেলে মেধার ভিত্তিতে তাতে নিয়োগ হবে। ২০১১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানের পাশাপাশি তাঁদের নাতি-নাতনিদেরও সংরক্ষণ ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১২ সালে তার সঙ্গেই যুক্ত হয় এক শতাংশ প্রতিবন্ধী সংরক্ষণ।
সংরক্ষণের বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে অনেকদিন ধরেই চাপা অসন্তোষ ছিল। ২০১৮-য় সেই সুপ্ত ক্ষোভ প্রকাশ্য আন্দোলনে পরিণত হয়। তবে সেই আন্দোলনে কোনো সন্ত্রাসবাদী ঘটনা ঘটেনি। আন্দোলনের চাপে পড়ে ২০১৮-র অক্টোবর মাসে শুধুমাত্র পিছিয়ে পড়া নৃ-গোষ্ঠীর জনজাতিদের ৫ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধীদের ১ শতাংশ ছাড়া সবধরনের সংরক্ষণ বাতিলের কথা জানিয়ে সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়।
সংরক্ষণ বাতিলের ২০১৮-র সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে তিন বছর পর ২০২১ সালে হাই কোর্টে যায় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। ২০২৪-এর ৫ জুন হাই কোর্ট তাঁদের পক্ষে রায় দিয়ে জানায় যে আগের সংরক্ষণ ব্যবস্থা বহাল রাখতে হবে।
হাই কোর্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করে বাংলাদেশ সরকার। তার মাঝেই জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে দেশজুড়ে নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়। ক্রমে যা হিংসাত্মক ও নাশকতামূলক আন্দোলনে পর্যবসিত হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, আন্দোলন শুরুর আগে ছাত্র প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে পরবর্তী চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে কোটা প্রথা বাতিলের আবেদন জানান।
এই প্রসঙ্গে প্রথমেই যে প্রশ্ন উঠে আসে - তাহলে কেন এই আন্দোলনের প্রয়োজন হল। সরকার কোটা প্রথার সংস্কার নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। শিক্ষার্থীরাও কোটা প্রথা সংস্কারের দাবিতে সোচ্চার। তাহলে হঠাৎ করেই এই আন্দোলনের কী দরকার ছিল?
দ্বিতীয়ত এই আন্দোলন কি স্বতঃস্ফূর্ত? তাহলে তো হাই কোর্টের রায় বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই অর্থাৎ ৫ জুন অথবা তার অব্যবহিত পরেই রাজপথে ছাত্রছাত্রীদের বিক্ষোভ সমাবেশ দেখা যেত। তার বদলে প্রায় পাঁচ সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পর বিশেষত যখন সুপ্রিম কোর্টের শুনানি হওয়ার সময় এগিয়ে আসছে তখন কেন ছাত্রছাত্রীদের পথে নামতে হল? প্রশ্ন ওঠে তাহলে কি এখনকার বিক্ষোভ কর্মসূচি পূর্বপরিকল্পিত ও সংগঠিত?
এখনকার বিক্ষোভ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে বিচলিত করেছে। দলটি গত ১৬ বছর একটানা ক্ষমতায় থাকলেও এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে ২০১২ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত চলতে থাকা জোরালো রাজনৈতিক আন্দোলন সামাল দিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। এছাড়া ২০১৮ সালে কোটা বিরোধী আন্দোলন এবং ২০১৮-র ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনও এই প্রশাসন সামলে নিয়েছিল। কিন্তু এই প্রথমবার বিক্ষোভ সামাল দিতে গুলি চালানো থেকে শুরু করে কারফিউ জারি এবং শেষ পর্যন্ত সেনা মোতায়েন করতে হয়েছে। আন্দোলনের নামে একদল বেপরোয়া সন্ত্রাসী দেশের ইন্টারনেট ব্যবস্থার মুখ্য সার্ভার, জাতীয় টিভির সদর দপ্তর সর্বোপরি ঢাকার মেট্রো ধ্বংস করতে উদ্যোগ নেয়। এবং অনেকাংশে সফল হয়। ফলে বিপর্যস্ত হয় জন পরিষেবা। বিক্ষোভের মাত্রা এতোটা তীব্র হতে পারে সেটা কি প্রশাসন আগে ধারণা করতে পারেনি?
প্রাথমিক পর্যায়ে শাসকদলের ছাত্র সংগঠন ছাত্র লীগকে দিয়ে বিক্ষোভের মোকাবিলার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে জটিল করে দেয়। ছাত্র লীগের কর্মীদের অতি সক্রিয়তায় উত্তেজনা চরমে পৌঁছে যায়। ছাত্র লীগের কর্মীদের আচরণ তথা কার্যকলাপের বিষয়ে ছাত্রছাত্রী তো বটেই সাধারণ মানুষের মধ্যেও যথেষ্ট ক্ষোভ আছে। সেই সুপ্ত ক্ষোভ কি এখনকার আন্দোলনে বাড়তি উপাদান হিসেবে কাজ করেছে, - এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে।
সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী দেশের পরিচিত বিরোধী দল যারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পছন্দ করে না, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে না, ‘জ্বালাও পোড়াও নীতি'তে বিশ্বাসী তারা এই সুযোগে দেশের মধ্যে একটা টালমাটাল পরিস্থিতি সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছে বলে শাসকদল ও প্রশাসনের তরফে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তাকেও উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। ফেসবুক বা অন্যান্য সমাজমাধ্যমে যেভাবে আন্দোলনকারীদের পক্ষে ধারাবাহিক প্রচার চলেছে তা-ও চিন্তার বিষয়। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সমাজমাধ্যমে প্রচারিত হয়নি বললেই চলে। এটা কি অনিচ্ছাকৃত?
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টিকেও এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। গত কয়েক বছরে পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বিশেষতঃ পদ্মা সেতু নির্মাণ, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত সুড়ঙ্গ, ঢাকা মেট্রো ইত্যাদিতে আন্তর্জাতিক ঋণ দানকারী বিখ্যাত সংস্থাগুলি তেমন কিছু সুবিধা করে উঠতে পারেনি। ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের শর্ত না মানায় পদ্মা সেতু প্রকল্পে অহেতুক সময় নষ্ট হয়েছে। এবং সরকার ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের থেকে ঋণ নেয়নি।
সরকারের এমন সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক ঋণদানকারী সংস্থাগুলির জন্য কোনো শুভ বার্তা নয়। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১৮ কোটি। ইয়োরোপের বেশ কয়েকটি উন্নত দেশের সামগ্রিক লোকসংখ্যার থেকে অনেক বেশি। এত বড়ো একটা বাজারে প্রবেশের সুযোগ না পাওয়ার বেদনা অস্বীকার করা যায় না। প্রশ্ন উঠতেই পারে তাহলে কি তারা পরোক্ষভাবে অনুঘটকের কাজ করেছে?
সাম্প্রতিক আন্দোলনে যেভাবে সরকারি সম্পত্তি পরিকাঠামোর (বিশেষত মেট্রো) ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা পুনরুদ্ধারে যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন তার জোগান কে দেবে? জাতীয় কোষাগারের পক্ষে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ সঙ্কুলান কি সম্ভব? অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কাজের বরাদ্দ কমিয়ে পরিকাঠামো পুনরুদ্ধারের জন্য খরচ করতে হবে নাকি আবার আন্তর্জাতিক ঋণদানকারী সংস্থাগুলির দ্বারস্থ হতে হবে? কঠিন প্রশ্ন। সরকারকেই সমাধান সূত্র খুঁজে বের করতে হবে। ততদিন ক্ষতিগ্রস্ত পরিকাঠামো ব্যবহার উপযোগী না থাকায় জনসাধারণের হয়রানি যে বাড়বে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
অনেকের মতে এই বিক্ষোভের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে শাসকদলের জনসংযোগ ত্রুটিপূর্ণ। জনগণের চাহিদা পূরণ তো দূরের কথা মানুষের মনের কথা বুঝে ওঠার কাজেও তারা ব্যর্থ। জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আরও বড়ো প্রমাণ বিরোধী গোষ্ঠী পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ধ্বংসাত্মক কীর্তিকলাপের যে রূপরেখা প্রণয়ন করছিল তা তারা আঁচ করতে পারেনি। সর্বোপরি আন্দোলন সামাল দিতে প্রশাসনের বদলে দলীয় নেতাকর্মীদের কেন নামতে হল?
প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিষয়টিও অস্বীকার করা যায় না। প্রায় চল্লিশ দিন ধরে যে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের সলতে পাকানো হচ্ছিল তা গোয়েন্দারা আগাম আন্দাজ করতে পারলেন না। অনেকের মতে একটা দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনের কাছে কোনো দক্ষতা আশা করা যায় কি? প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীও ওয়াকিবহাল। তিনি নিজেই বলেছেন যে তাঁর দপ্তরের পিয়ন চারশো কোটি টাকার মালিক। এবং সে নাকি হেলিকপ্টারে চড়ে ঘুরে বেড়ায়। প্রশ্ন ওঠে দুর্নীতি দমনে সরকার কোন ব্যবস্থা নিয়েছে? কতজন দুর্নীতিগ্রস্তকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে?
দেশে মৌলবাদী শক্তি সক্রিয়। জামাত-বিএনপি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিষ্ক্রিয় হলেও তারা ‘জ্বালাও পোড়াও নীতি’ অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদ থেকে সরে আসেনি। ইতিপূর্বে সমস্ত নাশকতার ঘটনায় মৌলবাদী জামাত-বিএনপি জড়িত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এবং অনেকাংশেই সেইসব অভিযোগ প্রমাণিত। তবে সরকার কেন আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি? জামাত-ই-ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের মতো মৌলবাদী সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে কেন এত বিলম্ব?
ছাত্র আন্দোলন সর্বদেশে সর্বকালে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর বিষয়। ছাত্রদের আবেগকে পুঁজি করে যারা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বিপর্যস্ত করতে চায় তাদের বিরুদ্ধে এত দেরিতে ব্যবস্থা নেওয়া হলে কেন? এই প্রশ্ন তোলা কি অসঙ্গত?
এই বিক্ষোভের ফলে অনেকেই মনে করছেন যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক এবং সাংগঠনিক অবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। কর্মীদের জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রবণতা নজরে পড়ছে। কর্মীদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ জনমানসে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। শাসকদলকে নিজেদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে কর্মীদের সুসংগঠিত করতে হবে। সুশৃঙ্খল হতে হবে। জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এবং মৌলবাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
দমন-পীড়ন চালিয়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনা করা যায় কি? আগ্রাসী আধিপত্যবাদের দমন-পীড়ন প্রক্রিয়া মোটেও কাঙ্ক্ষিত নয়। প্রকারান্তরে তা স্বৈরাচারের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্ররোচনা দেয়। পক্ষান্তরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিষ্ক্রিয় বিরোধী দল এক দফা দাবি সম্বল করে যে কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গোপনে যোগ দিয়ে সুযোগ পেলেই ধারাবাহিকভাবে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের একটাই দাবি, - বর্তমান সরকারের পতন চাই।
স্তিমিত আন্দোলনকে চাঙ্গা করার জন্য নানান রকমের দাবিদাওয়া নিয়ে ছাত্রদের আবার পথে নামানোর চেষ্টা চলছে। গ্রেফতার হওয়া সকলের নিঃশর্ত মুক্তি চাওয়া হয়েছে। বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবিও উঠেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার কমিশন ১৯ ও ২৫ জুলাই বাংলাদেশের বর্তমান আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে একই রকম বিবৃতি দিয়েছিল। সরকার দাবি মেনে নিয়েছে। গ্রেফতার হওয়া সাধারণ ছাত্রছাত্রীদেরও অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার প্রয়োজন। তবুও কেন ধিকিধিকি করে আন্দোলনের আঁচ জ্বালিয়ে রাখা হচ্ছে?
কাজেই বাংলাদেশের জন্য এ বড়ো কঠিন সময়। ধ্বংস হয়ে যাওয়া সরকারি সম্পদ সর্বশক্তি প্রয়োগ করে পুনরুদ্ধার করা যাবে। কিন্তু মানুষের হৃদয়ের আঘাত মেরামতের কাজ মোটেও সহজ নয়। নিহতদের পরিবারের হাতে ক্ষতিপূরণ বাবদ অর্থ তুলে দিয়ে অথবা সরকারিভাবে নিহতদের জন্য মসজিদে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় কি? একইভাবে মন্দির-মসজিদে প্রার্থনা করলেই দায়িত্ব পালন শেষ হয়ে যায় না। অনেক ধৈর্য ধরে মাথা নত করে দেশবাসীর ঘরে ঘরে গিয়ে জানতে হবে তাদের মনের কথা। সেই কথামালা থেকেই জানা যাবে কোথায় কোথায় খামতি আছে। তারপরেই প্রণীত হতে পারে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে উত্তরণের নীলনকশা। পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে হবে মৌলবাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম। জনগণের গণতন্ত্র প্রসারিত হলেই অন্তর্হিত হতে পারে মৌলবাদ।