আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ ত্রয়োদশ সংখ্যা ● ১-১৫ জুলাই, ২০২৪ ● ১৬-৩১ আষাঢ়, ১৪৩১
প্রবন্ধ
দেশের স্বার্থে মিডিয়া-নীতি চাই
গৌতম লাহিড়ী
মিডিয়া জগতে সম্প্রতি এক নিঃশব্দ বিপ্লবের সূচনা ঘটেছে। এই আন্দোলন যদি গণআন্দোলনে রূপান্তরিত হয় তাহলে দেশের বর্তমান সম্প্রচার ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটার অপার সম্ভাবনা রয়েছে।
তখনও অষ্টাদশ লোকসভার নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হয়নি। ২৮ মে, ২০২৪। 'প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়া'র উদ্যোগে জাতীয় স্তরের অধিকাংশ সাংবাদিক সংগঠন এবং বিভিন্ন প্রদেশের প্রেস ক্লাবের নেতৃত্বের এক গোলটেবিল বৈঠক ডাকা হয়। উদ্দেশ্য দুটি। এক - জাতীয় স্তরের মিডিয়া নীতি নির্ধারণের জন্য এক খসড়া আইনের রূপরেখা তৈরি করা দরকার। দুই - বিগত দুটি এনডিএ সরকারের সময়ে যেসব আইন অনুমোদিত হয়েছে যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার উপরে তার বিরূদ্ধে সর্বসম্মত নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। এবং পূর্বতন সরকার যেসব আইন করার প্রস্তাব নিয়েছে যেগুলি মিডিয়ার স্বাধীন মত প্রকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে তার বিরূদ্ধে নতুন সরকারের কাছে আপীল করা, যাতে সেই সব আইন প্রত্যাহার করা হয় এবং নতুন কোনো আইন প্রবর্তন করলে গণমাধ্যমের উপর হস্তক্ষেপ হতে পারে সেই বিষয়ে মিডিয়ার সঙ্গে আলোচনা করে নীতি নির্ধারণ করা উচিত।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এবং বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলিতে জাতীয় গণমাধ্যম নীতি রয়েছে। ভারতের মতো বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আজ পর্যন্ত কোনো জাতীয় মিডিয়া নীতি প্রণীত হয়নি। আইনগুলির বিষয়ে প্রথমে একটি খসড়া তৈরি করা হয় প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে। সেই খসড়া নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক হয়। বৈঠকে মিডিয়ার প্রতিনিধিরা মূল্যবান পরামর্শ দেন। পরামর্শগুলি একত্রিত করে একটি অভিন্ন প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। সেই প্রস্তাব সাধারণ নাগরিকদের অবহিত করা জন্য প্রকাশ করা হয় এবং প্রস্তাবের অনুলিপি 'প্রেস কাউন্সিল অফ্ ইন্ডিয়া' এবং কেন্দ্রীয় তথ্য মন্ত্রণালয়কে পাঠানো হয়।
কী আছে প্রস্তাবে?
প্রস্তাবটির মূল নির্যাস - গণমাধ্যম সংক্রান্ত কোনো আইন প্রণয়নের পূর্বশর্ত হল একটি নিরপেক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেই কোনো আইন প্রণয়ন করা উচিত। যেমন একটি আইন কেন্দ্রীয় সরকার প্রবর্তন করতে চায়, - সম্প্রচার পরিষেবা (নিয়ন্ত্রণ) বিল, ২০২৩। এই আইনে কেন্দ্রিয় সরকারের হাতে অসীম ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। তাদের মূল্যায়ণের ভিত্তিতে যে কোনো সম্প্রচার তারা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সম্প্রচার বন্ধ করে দিতে পারে। একই ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছে 'ব্যক্তিগত তথ্য রক্ষার আইন ২০২৩'। 'প্রেস এবং ম্যাগাজিন প্রকাশন নথিভুক্ত করার আইন ২০২৩' আরও সাংঘাতিক। এই আইনে বলা আছে সরকার যদি মনে করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী 'দেশ-বিরোধী’ কাজের সঙ্গে যুক্ত বা প্রচার করেছেন তাঁদের প্রকাশনা নিষিদ্ধ করা হবে। এটা কি ব্রিটিশ আমলের মতো আইন নয়? বর্তমান সরকার তাদের বিরূদ্ধে কোনো প্রকৃত সত্য সমালোচনাকেই দেশ-বিরোধী আখ্যা দিতে চায়। এটা কি ভারতের মতো গণতন্ত্রে শোভা পায়? কে দেশ-বিরোধী বা রাষ্ট্র-বিরোধী সেটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক সরকার নিজেই। সরকার নিজেই অভিযোগকারী, নিজেই সরকারি কৌঁসুলী এবং নিজেই বিচারক।
২০২৩ সালের তথ্যপ্রযুক্তি সংশোধনী আইনে সরকারের হাতে একছত্র ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তারা যদি মনে করে, কোনো সংবাদ দেশ-বিরোধী তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই পত্রিকা বা অনলাইন মিডিয়া থেকে অপসারণ করার নির্দেশ দেওয়া হবে। ঘটনা হল সাম্প্রতিক সময়ে ‘ক্যারাভ্যান’ পত্রিকায় কাশ্মীরের ঘটনার উপর প্রতিবেদন প্রত্যাহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পত্রিকা নিষিদ্ধ হওয়ার ভয়ে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ প্রতিবেদনটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।
২০২৩ সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণ বিল টেলিভিশন ছাড়াও, এই প্রথম ওটিটি প্লাটফর্মকেও নিয়ন্ত্রণ করবে। এই আইন ১৯৯৩ সালের কেবল্ নেটওয়ার্ক আইনকে পুনঃস্থাপন করবে। এখানে বিষয় নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ত্রিস্তরের একটি কমিটি করা হবে। তবে এখানে স্টেকহোল্ডারদের ভূমিকা স্পষ্ট নয়। সাংবাদিকদের সন্দেহ এর মাধ্যমে নাগরিকদের জানার অধিকারকে খর্ব করা হবে, যদি না সরকার এই বিষয়ে সঠিক ব্যাখ্যা দেয়।
এরই এক নমুনা দেখা গেছে - বারবার ইন্টারনেট শাট ডাউন করে দেওয়া হয়েছে, যাতে তথ্য মানুষের কাছে না পৌঁছায়। ২০১২ সাল থেকে ৮১৪ বার শাট ডাউন করা হয়েছে। এর মধ্যে ইউপিএ সরকারে মাত্র ৮ বার। সেখানে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর হয়েছে ৮০৬ বার। তারমধ্যে কাশ্মীরে ৪০০ বারেরও বেশি। ২০২৩ সালে অর্থাৎ নির্বাচনের আগের বছরের ৯৬ বার এবং ২০২৪ সালেও ২৪ বার।
গোলটেবিল বৈঠক থেকে দেশের সাংবাদিক কর্মীদের কাছে আপীল করা হয়েছে তাঁরা সংবিধানের বর্ণিত ১৯(১)(ক) ধারা অনুযায়ী মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় যেন রুখে দাঁড়ান। ভারতে যখনই কোনো সরকার মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করেছে তখনই গণমাধ্যম রুখে দাঁড়িয়েছে। দুর্ভাগ্য এখন দেশের গণমাধ্যম বিভক্ত। একদল সরকারের ধামাধরা হয়ে গিয়েছে। এর প্রধান কারণ গণমাধ্যম এখন দেশের শিল্পপতিদের করায়ত্ত্ব। একচেটিয়া পুঁজি নিয়ন্ত্রণ করছে মিডিয়া। এর জন্য পৃথক মিডিয়া নীতির সুপারিশ করা হচ্ছে। সেই বিষয়ে পরে বিশদে জানানোর ইচ্ছে রয়েছে।
একইরকম 'ব্যক্তিগত ডিজিটাল ডাটা প্রটেকশন আইন ২০২৩'-এ ডাটার উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ রাখা হচ্ছে। এতে ব্যক্তি স্বাধীনতা খর্ব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। অজানা কোনো সূত্র থেকে ব্যক্তিগত ডাটার উপর নজর রাখার ব্যবস্থা হচ্ছে। তথ্য জানার অধিকারকে খর্ব করা হচ্ছে। ২০০৫ সালের রাইট টু ইনফরমেশন আইনের ৮(১) ধারাকে সংশোধন করা হয়েছে। এবং একে ডিজিটাল ডাটা প্রটেকশন আইন-এর ৮(১) ধারার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে সাংবাদিকরা বা নাগরিকরা সরকারের থেকে তথ্য চাইতে না পারেন। এবং সরকারের অধিকার থাকবে তথ্য না দেওয়ার। লোকসভা ভোটের আগে তামিলনাড়ুর বিজেপি সভাপতি শ্রীলঙ্কার কাছিথিভু দ্বীপ নিয়ে তথ্য জানতে চাইলেন। এটা অত্যন্ত গোপন তথ্য। অফিসিয়াল ওয়েবসাইট অনুযায়ী ‘সিক্রেট’। অথচ রাজনীতি করার জন্য তাঁকে মাত্র সাত দিনের মধ্যে সরকারি গোপন নথি দেওয়া হল। অথচ যখন রাফায়েল ডিল নিয়ে তথ্য চাওয়া হচ্ছে তখন সরকারি গোপনীয়তার আড়ালে সেটা দেওয়া হচ্ছে না। ওটা নাকি জাতীয় গোপন তথ্য। এটা প্রকাশিত হলে দুর্নীতির যাবতীয় তথ্য পাওয়া যেত। সেই কারণেই আইন তৈরি হল। যাতে চাইলেও তথ্য দেওয়া যাবে না।
এই জন্য গোলটেবিল বৈঠক থেকে দাবি করা হয়েছে ডিজিটাল ডাটা রক্ষা আইন হয় বাতিল করা হোক নতুবা সংশোধন করা হোক যাতে রাইট টু ইনফরমেশন আইন লঘু না হয়। প্রেস কাউন্সিল সংসদের আইন মেনে গঠিত হয়। কিন্তু এর আওতায় কেবলমাত্র প্রিন্ট মিডিয়া রয়েছে। বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুসারে এখন টেলিভিশন ও ডিজিটাল মিডিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য 'মিডিয়া কাউন্সিল' নামক জাতীয় সংগঠন তৈরি করা যেতে পরে।
এই কাউন্সিল হতে হবে প্রতিনিধিত্বমূলক। কর্মরত সাংবাদিক, ট্রেড ইউনিয়ন, টেলিভিশন, সামাজিক মাধ্যমের মিডিয়ার প্রতিনিধি, মিডিয়া মালিক এবং সরকারি প্রতিনিধিকে প্রস্তাবিত কাউন্সিলে থাকতে হবে। এই সংগঠনের ক্ষমতা থাকবে তিরস্কার করার, শাস্তি দেওয়া এবং প্রয়োজনে মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেওয়ার। পরে আলোচনা সাপেক্ষে তৈরি হতে পারে আনুষঙ্গিক নিয়মাবলী। এতকাল সাংবাদিকদের অধিকার নির্ধারিত হতো 'ওয়ার্কিং জার্নালিস্ট আইন' এবং 'নিউজপেপার আইন ১৯৫৫' দ্বারা। সাংবাদিকদের বেতন নির্ধারিত হতো ১৯৫৮ সালের আইন অনুযায়ী। এই আইনের দ্বারা বেতন কমিশন বা মজুরি পরিষদ বেতন কাঠামো তৈরি করতে নির্দেশ দিত সরকারের কাছে। কেবলমাত্র বেতন নয়, ছুটি, ভাতা, কাজের ঘণ্টাও নির্ধারিত হতো। চাকরি ছাঁটাই বা অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ছিল। এখন নতুন লেবার কোড চালু করে সেইসব আইন বাতিল করা হয়েছে। কাজের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যের নামে ২০২০ সালে নতুন কোড চালু হয়।
গোলটেবিল বৈঠক থেকে দাবি তোলা হয়েছে কোড প্রত্যাহার করে সাংবাদিকদের জন্য পৃথক আইন করা হোক রক্ষাকবচ হিসাবে। আগের আইন কেবলমাত্র প্রিন্ট সাংবাদিকদের জন্য ছিল। প্রস্তাব হল এই আইনের আওতায় টেলিভিশন ও ডিজিটাল মিডিয়াকেও অন্তর্ভুক্ত করা হোক, যেহেতু মিডিয়ার পরিসর অনেক বেড়েছে।
এটা শ্লাঘার বিষয়ে যে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা আট কোটিরও বেশি। এইজন্য ব্যক্তিগত ডাটা রক্ষা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং অভিযোগ নিরসনের জন্য নতুন সুসংগত আইন প্রণয়ন করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
নিরন্তর বিকাশমান ডিজিটাল জগৎ বিস্তারের কারণে কেন্দ্রীয় সরকার ২০০৩ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইন পরিবর্তন করে নতুন ডিজিটাল রক্ষা আইন আনার প্রস্তাব করেছে। ৯ মার্চ, ২০২৩ কেন্দ্রীয় সরকারের ইলেকট্রনিক মন্ত্রক ওয়েবসাইট-এ একটি খসড়া প্রকাশ করে। সেই খসড়া সম্পর্কে মতামত চাওয়া হয়। মন্ত্রকের সাইট-এ গিয়ে এটা দেখে নেওয়া যেতে পারে। গোলটেবিল বৈঠক থেকে দাবি করা হয়েছে যে সরকার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিক তারা মুক্তমনা নিরাপদ এবং জনতার উপকারে লাগবে বলতে কি বোঝাতে চেয়েছে। এই ব্যাখ্যাগুলি না থাকার ফলে অনেক সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। সরকারের উচিত এটাও জানানো কেন পুরোনো আইন অপ্রয়োজনীয়। বিশেষ করে যখন নতুন আইন সংসদে পাস করা হয় তখন ১৪৬ জন সাংসদকে বহিস্কার করে দেওয়া হয়েছিল।
সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে ভবিষ্যতে এমন কোনো আইন জারি করা হবে না যেখানে মিডিয়ার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হয়। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে সরকারের পছন্দ না হলে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশের উপর যেন প্রতিবন্ধকতা তৈরি না হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত - সরকার ডিজিটাল আইন তৈরি করার সময় মিডিয়া প্রতিনিধিদের সঙ্গে যেন আলোচনা করে। গণমাধ্যম কর্মীদের যৌথভাবে আইনি প্রতিকার চাওয়ার জন্য প্রয়াস অব্যাহত থাকবে।
এই বিষয় কেবলমাত্র সাংবাদিকদের জন্য নয়। সাংবাদিকরা যদি প্রকৃত তথ্য প্রকাশ না করেন তাহলে সমাজের সাধারণ মানুষেরা উপকৃত হবেন না। এইজন্য এই বিষয় নিয়ে সকলের সচেতন হওয়ার সময় এসেছে।