আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ ত্রয়োদশ সংখ্যা ● ১-১৫ জুলাই, ২০২৪ ● ১৬-৩১ আষাঢ়, ১৪৩১
সমসাময়িক
রাহবান বনাম আইআইটি
সম্প্রতি একটি ছোট সংবাদ খবরের কাগজগুলিতে পরিবেশিত হয় যেটি জনমানসে বেশী আলোড়ন তোলেনি। কিন্তু ঘটনা হিসাবে এটি কোনো অংশেই কম উদ্বেগের নয়, বরং জনমানসে কোনো প্রতিক্রিয়া না হওয়া এক গভীর পরিবর্তনের লক্ষণ হিসাবেই ধরা যায়। কিছুদিন আগে আইআইটি বোম্বের একটি ড্রামা ক্লাবের অনুষ্ঠানে একদল পড়ুয়া ‘রাহবান’ নামক একটি নাটক উপস্থাপনা করেন। নারীকেন্দ্রিক দৃষ্টিতে লেখা রামায়ণের এই ভাষ্যটি প্রখ্যাত এবং আগেও বহুবার মঞ্চে এর উপস্থাপনা হয়েছে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি অন্যরকম হয়ে ওঠে। যথারীতি ওই প্রতিষ্ঠানে এবিভিপি সমর্থক কিছু ছাত্র (মতান্তরে বহিরাগত) এই নাটক ভারতীয় বা বলা ভাল সনাতনী 'ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করেছে', 'রামায়ণের অবমাননা করেছে' বলে অভিযোগ তোলে। ফলশ্রুতিতে আইআইটি কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত করে এবং নাটকটি যারা মঞ্চস্থ করেছিল, সেই ছাত্রদের দোষী সাব্যস্ত করে জরিমানা করে। এক এক জন ছাত্রকে নাকি লক্ষাধিক টাকা জরিমানা করা হয়। গোটা খবরটি সংবাদপত্রে খুব ছোট করে পরিবেশিত হয়। না এই নিয়ে কোনো বিক্ষোভ হয়েছে, না তো সংসদে আলোচনা না শাসক বা বিরোধী দলের কোন বিবৃতি। সবাই যেন দেখেও না দেখার ভান করছেন। কিন্তু কেন?
বিগত এক দশকে এই দেশের জনমানসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। সেই বিপ্লব প্রগতিশীল নয়, বরং প্রবলভাবেই পশ্চাদপদ, কিন্তু এই পরিবর্তনটি ঘটেছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের যাবতীয় উত্তরাধিকারই দেশবাসী প্রায় ভুলতে বসেছেন। সামগ্রিকভাবে উদার, প্রগতিশীল যে মননের জন্ম স্বাধীনতা সংগ্রাম দিয়েছিল, কালক্ষেপে তা আজ বিস্মৃত। অবস্থা এতটাই দুর্বিষহ যে একটি স্বাধীন দেশের প্রথম একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল কেবলমাত্র সংবিধান বাঁচানোর তাগিদে। আরএসএস তথা বিজেপি যে তাদের দীর্ঘ প্রয়াসে সংখ্যাগরিষ্ঠের মন থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের সমস্ত সদর্থক প্রভাবকেই মুছে দিতে সফল হয়েছে, একটি নাটক নিয়ে এহেন প্রহসন তারই জ্বলজ্যান্ত নিদর্শন। একথা ভাবলে আঁতকে উঠতে হয় আজকের দিনে যদি সুকুমার রায় 'লক্ষণের শক্তিশেল' লিখতেন বা মাইকেল মধুসূদন 'মেঘনাদবধ কাব্য' তাহলে দেশের আইন তাঁদের জন্য কি শাস্তি বিধান করত। রামায়ণের কতগুলি ভাষ্য যে ভারতজুড়ে লেখা হয়েছে তার খবর অবশ্য ধর্মের ধ্বজাধারীরা রাখেনা, কিন্তু ধর্মীয় ভাবাবেগ রক্ষায় তাদের তৎপরতা অতুলনীয়। প্রশ্ন জাগে আবেগের এই আতিশয্য কেন?
আসলে ধর্মীয় রাজনীতি থেকে উদ্ভূত আধিপত্যবাদ এভাবেই সমস্ত অপরকে এক বন্ধনীতে এনে ফেলে। প্রথমে যা শুরু হয় বিশেষ কোন পক্ষকে আক্রমণের বর্শামুখে এনে ক্রমে তা হয়ে ওঠে সার্বজনিন। তখন যে কোনও বিরুদ্ধমত, যে কোনো বিকল্প ভাষ্যকেই নিয়ে আসা হয় শত্রুর সংজ্ঞায় এবং তারপর শুরু হয় তাকে রাষ্ট্রের সমস্ত শক্তি দিয়ে অবদমিত করার। বিগত এক দশক জুড়ে গোটা দেশে এই রাজনীতিই বিস্তার লাভ করেছে, শক্তিশালী হয়েছে, ক্ষমতার কেন্দ্রে আসীন হয়েছে। শেষ নির্বাচনে দেশের এক বড় অংশের মানুষ এই রাজনীতির বিরোধীপক্ষকে মতদান করলেও রাজনীতির এই ভাষ্যকে পরিত্যাগ করেছেন কিনা তা বিচার্য বটে। নয়ত আইআইটি-র মতো একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আলোকপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষও এমন একটি আদ্যন্ত নির্বোধ অভিযোগকে উড়িয়ে দিয়ে প্রগতিশীলতার পাশে দাঁড়াতে পারলেন না? নাকি স্রেফ বিরাগভাজন হওয়ার ভয়েই কর্তৃপক্ষের এহেন নির্ভেজাল আত্মসমর্পণ? হয়ত তাই। নাহলে বিগত এক দশক ধরে দেশের একাধিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আরএসএস বা তার অনুগামীদের হাতে একাধিক শিক্ষক, ছাত্র নিগৃহীত হন কীভাবে? কেনই বা আজ নরেন্দ্র দাভোলকর-এর খুনিদের শাস্তি হয়না, গৌরী লঙ্কেশের খুনিরা প্রমাণাভাবে ছাড়া পেয়ে যায়? কেনই বা চন্দ্রযান উৎক্ষেপণের আগে 'ইসরো'-র অধিকর্তা কেবল হিন্দু মন্দিরেই পুজো দিতে যান? কেনই বা রামমন্দির উদ্বোধনের দিন বিভিন্ন কেন্দ্রীয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তার সম্প্রচার হয়? এসবই হল ধর্মীয় রাজনীতির আধিপত্যের সাথে আপোষ করে টিকে থাকা।
কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিও এই বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছে কেন? যারা বিগত কয়েকমাস জুড়ে দেশের সংবিধান রক্ষায় নির্বাচনে তীব্র লড়াই করলেন, বিজেপির আধিপত্যবাদকে খানিক কোনঠাসা করতে পারলেন তারা আজকে এই বিষয়ে কোনো বিবৃতি এখনও অবধি দিলেন না কেন? কেবলমাত্র বাম ছাত্র সংগঠন এসএফআই একটি বিবৃতি জারি করেছেন। কিন্তু এর বাইরে এই বিষয়ে আর একটিও প্রতিবাদ চোখে পড়েনি। যাঁরা সংবিধানকে এতখানি অমূল্য মনে করলেন তারাই কি সংবিধানের অধিকারগুলো বিস্মৃত হলেন? আমাদের দেশের সংবিধান একদিকে যেমন ব্যক্তিকে তার মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেয়, তেমনই যুক্তিবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ প্রশাসনের অঙ্গীকারও করে। আমাদের দেশ তো কেবল একটি গণতান্ত্রিক দেশই নয়, একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশও বটে। তাহলে কিভাবে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের আধিকারিকরা এমন সংবিধান বিরোধী পদক্ষেপ নিয়েও বহাল তবিয়তে আছেন, যেখানে সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধীপক্ষ উপস্থিত। গলদ আসলে গোড়ায়।
নির্বাচনে বিজেপি বিরোধী শক্তি আগের চেয়ে বেশী সংখ্যক ভোট পেলেও সেই ভোট কতটা রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধিতা থেকে, আর কতটা স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতি বিরূপতা থেকে তা পৃথক করা মুশকিল। বিশেষত বহু ক্ষেত্রেই বিজেপি বিরোধী জোটে এমন শক্তিও আছে যারা বিজেপির মতোই অন্য এক ধরণের আধিপত্যবাদের কথা বলে, অথবা ধর্মেও আছে আবার জিরাফেও আছে। ফলে এই নির্বাচনে বিজেপি রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে দুর্বল হলেও আরএসএস-বিজেপির রাজনীতি কিন্তু মোটেও দুর্বল হয়নি। এখনও জনমানসে হিন্দু আধিপত্যবাদের প্রতি প্রচ্ছন্ন সহানুভূতি রয়ে গিয়েছে। এমনকি এই কথাও শুনতে পাওয়া যাবে যে ‘সমস্ত পরীক্ষা নিরীক্ষা কেন হিন্দু দেবদেবী বা পুরাণ, মহাকাব্য নিয়ে হবে? কই অন্য ধর্মের কিছু নিয়ে এরকম করে দেখাক তো।’ এগুলি কোনো একক চিন্তা নয়, বরং সমাজের শিক্ষিত অংশের থেকেই এই মতামত আসছে। সমস্যা এখানেই যে নবজাগরণের আলোকপ্রাপ্ত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজও আজ কোনো কিছুকে নৈতিকতার বদলে, ‘তুমি অধম তা বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন’ এই পাঠ ভুলে, প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকেই ঘটনার ন্যায্যতা বিচার করছেন। ফলে সংবাদপত্র থেকে রাজনৈতিক দল কেউই এই অংশের বিরাগভাজন হতে নারাজ। তাই বোম্বে আইআইটি-র ঘটনা নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান কেউই নেননি। এখানেই আরএসএস-এর জয়, তাদের সামাজিক প্রভাবের জয়।
এমতাবস্থায় ভারতবর্ষে যুক্তিবাদী, বহুত্ববাদী ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আক্রমণ যে জারি থাকবে, বোম্বাই আইআইটি-র ঘটনা তারই প্রমাণ। বিজেপি ও আরএসএস-এর রাজনীতিকে যদি প্রকৃতপক্ষে পরাস্ত করতেই হয়, তবে একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে বিরোধী রাজনৈতিক শিবির গঠিত হওয়া প্রয়োজন। নয়ত রাজনীতির পালাবদল কেবল শাসকদলের নাম পরিবর্তনেই পর্যবসিত হবে, রাজনীতির কোনো সদর্থক পরিবর্তন সাধন করবে না। বোম্বে আইআইটি-র ঘটনা প্রমাণ করে যে আরএসএস-বিজেপি বিরোধী লড়াই আরও জোরদার করা জরুরি। দেশের বিরোধী শক্তিসমূহকে সেই লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিতেই হবে।