আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ ত্রয়োদশ সংখ্যা ● ১-১৫ জুলাই, ২০২৪ ● ১৬-৩১ আষাঢ়, ১৪৩১

সমসাময়িক

কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস রেল দুর্ঘটনা - ঘটিবে যা ঘটিবার ছিল


শেষ পর্যন্ত কতজন মারা গেছেন কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস রেল দুর্ঘটনায়?

১৭ জুন দার্জিলিং জেলায় দুটি রেলগাড়ির মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সেদিন রাঙ্গাপানি রেলওয়ে স্টেশনের কাছে শিয়ালদহ-আগরতলা কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস যাত্রীবাহী রেলগাড়ির সঙ্গে একটি পণ্য রেলগাড়ির সংঘর্ষ হয়। দু’দিন খবরের শিরোনামে ছিল এই দুর্ঘটনার কথা, তারপরে খবরের ভিড়ে হারিয়ে গেছে আহত ও নিহতদের কথা।

অন্তত ১১ জন মানুষ এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৬০ জন যাত্রী। ২০২৩-এ ওড়িশাতে করোমন্ডল এক্সপ্রেস এবং বেঙ্গালুরু-হাওড়া সুপারফাস্ট রেলগাড়ির বিপর্যয়কর ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিই। তাতে মারা গিয়েছিলেন অন্ততপক্ষে ২৯৬ জন ও আহত হয়েছিলেন ১,২০০ জন যাত্রী। ২০২৩ সালে মোট মারা যান ৩২৬ জন যাত্রী। এই বছর এখনও পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১৩ জন যাত্রীর।

বর্তমান সরকারের শেষ নয় বছরের মেয়াদে, ভারতীয় রেল, রেল নিরাপত্তার জন্য ১,৭৮,০১২ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। এই বরাদ্দ নাকি অভূতপূর্ব। তবুও প্রতি বছর বহু রেলযাত্রী মারা যাচ্ছেন বিভিন্ন দুর্ঘটনায়।

১৭ জুন সিগন্যালিং ব্যবস্থা কাজ করছিল কিনা তা রেল বোর্ড জানায়নি, কিন্তু তৎপর হয়ে সেদিনই জানিয়েছে, মৃত পণ্যবাহী রেলগাড়ির ড্রাইভরের দোষে এই দুর্ঘটনা, তিনি সিগন্যাল মানেননি। অথচ ওই ১৭ জুন ‘দ্য হিন্দু’ খবরের কাগজ জানিয়েছে, রাঙ্গাপানি রেলওয়ে স্টেশন এবং ছাত্তার হাট জংশনের মাঝে কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসে যে পণ্যবাহী রেলগাড়িটির ধাক্কা লেগেছিল, অভ্যন্তরীণ নথিগুলি দেখাচ্ছে সেই ট্রেন-এর চালককে সমস্ত লাল সংকেত অতিক্রম করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল কারণ সেই সময়ে স্বয়ংক্রিয় সংকেত ‘ব্যর্থ’ ছিল। টিএ ৯১২ নামে একটি লিখিত নথি কর্তৃপক্ষ, রাঙ্গাপানি স্টেশন মাস্টার মারফত পণ্য ট্রেনের চালককে দিয়েছিলেন। এই নথি তাকে সমস্ত লাল সংকেত অতিক্রম করার জন্য অনুমোদন দিয়েছিল। “স্বয়ংক্রিয় সংকেত ব্যর্থ হয়েছে এবং আপনি এতদ্বারা RNI (রাঙ্গাপানি রেলওয়ে স্টেশন) এবং CAT (ছত্তার হাট জংশন)-এর মধ্যে সমস্ত স্বয়ংক্রিয় সংকেত পাস করার জন্য অনুমোদিত,...” কর্তৃপক্ষের নথিতে বলা হয়েছিল।

এই ঘটনার পরে রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়ন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কাজ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন; তাঁরা লোকবলের ঘাটতি এবং অপর্যাপ্ত ও ব্যর্থ-স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার উল্লেখ করেছেন। দুর্ঘটনার অংশে কিন্তু এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা কর্মক্ষম থাকার কথা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ভারতীয় রেলওয়েতে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা কার্যকরী মাত্র ৬ শতাংশ রুট কিমিতে (সূত্র ২৬ জুন, টাইমস অফ ইন্ডিয়া)। রেলওয়ে ট্র্যাকের এই ছোটো অংশে দুর্ঘটনা বারবার কেন ঘটছে, কীভাবে অপারেশন পরিচালনা করা হয় তার পর্যালোচনা জরুরি বলে তারা মনে করছেন।

জানতে চাই, কেন মৃত চালকের ঘাড়ে সাত-তাড়াতাড়ি দোষ চাপানোর জন্য রেল কর্তৃপক্ষের শাস্তি হবে না! ভারতীয় রেল ব্যবস্থায় কত শূন্যপদ এখন আছে। পণ্যবাহী গাড়ির ড্রাইভারদের এক নাগাড়ে কতটা পথ গাড়ি চালাতে হয়, সেই দূরত্ব চালাতে তাদের ক্লান্তি আসে কিনা! এই বিষয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হয় কিনা!

মুম্বাই থেকে আহমেদাবাদ হাই-স্পিড রেল প্রকল্প - একটা বুলেট ট্রেন করতে খরচ হচ্ছে ১,০৮,০০০ কোটি টাকা। তার দূরত্ব মাত্র ৫০০ কিমি। তুলনা করলে বলা যায় কলকাতা থেকে শিলিগুড়ির দূরত্ব ৫০০ কিমি।

যদি দেশে টাকার সংকুলান না থাকে তবে, আগে যে রেল ট্র্যাক হয়েছে, যে সিগন্যালিং সিস্টেম আছে তাকে বহাল রাখা হোক, দেখভাল করা হোক। তারপরে নতুন বুলেট ট্রেন করা যায়।

অবস্থার আশু উন্নতি প্রয়োজন, নয়তো দূর পাল্লার রেলযাত্রীদের হাতে জীবন নিয়েই চলতে হবে।