আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ ত্রয়োদশ সংখ্যা ● ১-১৫ জুলাই, ২০২৪ ● ১৬-৩১ আষাঢ়, ১৪৩১

সম্পাদকীয়

'এনটিএ' বাতিল হোক


নরেন্দ্র মোদী সরকার দেশের কত ক্ষতি করেছে এবং করবে তার ইতিহাস যখন লেখা হবে তখন একেবারে উপরের দিকে থাকবে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা। কেন এই দাবি করা হল তা নিয়ে একাধিক প্রবন্ধ লেখা যেতে পারে। আপাতত প্রিয় পাঠক, আসুন আরেকবার তাকানো যাক বিগত মাসের সংবাদের শিরোনামের দিকে। জুন মাসের ৪ তারিখ শুধু অষ্টাদশ লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হয়নি। সেদিন দেশের মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা নীটের ফলও প্রকাশিত হয়েছিল। ফল প্রকাশ হওয়ার পরে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া নিয়ে বিস্তর অভিযোগের পরেও সরকার এই পরীক্ষাটি বাতিল করেনি। এর ঠিক দুই সপ্তাহ পরের ঘটনা। ১৮ জুন সর্বভারতীয় অধ্যাপক পদের জন্য যোগ্যতা নিরূপণের জন্য আয়োজিত নেট পরীক্ষা হয়। ১৯ জুন ঘোষণা করা হয় যে পরীক্ষাটি বাতিল করা হল। নয় লক্ষ পরীক্ষার্থী এই পরীক্ষায় বসে। তাদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গেছে বলে অনুমান। এরপরে নেট-সিএসআইআর পরীক্ষাটিও বাতিল করা হয়। অর্থাৎ বিগত এক মাসের মধ্যে দেশের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশিকা পরীক্ষাগুলি একের পর এক বাতিল হয়ে যাচ্ছে। সরকার যথারীতি নিশ্চুপ। লোকসভায় এই নিয়ে আলোচনার অনুমতি মেলেনি। লোকসভার অধ্যক্ষ বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর মাইক বন্ধ করে দেওয়ায় ব্যস্ত থেকেছেন।

এই গোটা প্রক্রিয়া নিয়ে বহু প্রশ্ন আছে। আমরা এই সম্পাদকীয় নিবন্ধে শুধু দুটি নিয়ে আলোচনা করব। প্রথমত, 'এক দেশ এক পরীক্ষা' এই নীতিটি কি আদৌ গ্রহণযোগ্য? দ্বিতীয়ত, এই সর্বভারতীয় পরীক্ষা নেওয়ার ভার কাদের উপরে দেওয়া আছে? দুটি প্রশ্নের উত্তরে যাওয়ার আগে কয়েকটি কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন। আইআইটি বা আইআইএম-এর জন্য প্রবেশিকা পরীক্ষা বহু দশক ধরেই কেন্দ্রীয়ভাবে সর্বভারতীয় স্তরে হয়। এবং এই দুটি পরীক্ষা নিয়ে বিশেষ কোনো অভাব অভিযোগ কখনওই ওঠেনি। মনে রাখতে হবে এই দুটি পরীক্ষা মাত্র দুই ধরনের ছাত্রদের জন্যই নেওয়া হয় - যারা ইঞ্জিনিয়ারিং অথবা ম্যানেজমেন্ট পড়তে চান, তাও শুধুমাত্র আইআইটি বা আইআইএমে ভর্তি হওয়ার জন্য। এই পরীক্ষা পরিচালনা করার জন্য আলাদা বোর্ড রয়েছে যাদের পেশাদারিত্ব নিয়ে খুব বেশি প্রশ্ন কখনওই ওঠেনি।

কিন্তু মোদী ক্ষমতায় আসার পরে দেশের পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে যে ছেলেখেলা চলছে তার নেপথ্যে রয়েছে বিজেপির আধিপত্যবাদী রাজনীতি যে গোটা দেশে একটাই প্রবেশিকা পরীক্ষা হবে, যার মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন, বা মেডিকাল কলেজে ভর্তি হবেন। আগে রাজ্যস্তরে জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষার মাধ্যমে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতো ছাত্র-ছাত্রীরা, এর ফলে যে খুব খারাপ ডাক্তার তৈরি হয়েছে এমন কোনো প্রমাণ নেই। তাহলে কেন এই পরীক্ষাকে কেন্দ্রীভূত করা হল, যেখানে বিভিন্ন রাজ্যগুলির তরফে এর বিরুদ্ধে মতামত ব্যক্ত করা হয়েছিল। এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দেওয়ার চেষ্টা পর্যন্ত মোদী সরকার করেনি। ঠিক একইভাবে সমস্ত কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কেন মাত্র একটি পরীক্ষাই দিতে হবে তারও কোনো সদুত্তর নেই। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনপাঠন অনুযায়ী, তাদের রীতিনীতি অনুযায়ী ছাত্র ভর্তির প্রক্রিয়া থাকা উচিত। যেমন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে স্নাতোকোত্তর পড়ার জন্য যে ধরনের পরীক্ষা হওয়া উচিত, তার সঙ্গে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিষয়ে পড়ার জন্য পরীক্ষা পদ্ধতি একসময়ে আলদাই ছিল, কারণ বিষয়টি এক হলেও তাদের পড়ানো এবং গবেষণার আঙ্গিক একদমই ভিন্ন ছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় স্তরে একটি পরীক্ষা হলে সেই বিবিধতা ঢাকা পড়ে যায় এবং সেখানকার শিক্ষককূলের মতামতের কোনো গুরুত্বই থাকে না ছাত্র ভর্তির বিষয়ে। অতএব একটি পরীক্ষার মাধ্যমে গোটা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে বা মেডিকেল কলেজে ভর্তির প্রক্রিয়াটি যুক্তিগ্রাহ্য নয়।

কিন্তু দ্বিতীয় সমস্যাটি আরো গভীর এবং ব্যাপক। এই পরীক্ষাগুলি নেওয়ার ভার দেওয়া হয়েছে 'ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি' (এনটিএ) বলে একটি সংস্থাকে। এই সংস্থাটি কোনো আইনের মাধ্যমে গঠন করা হয়নি। এই সংস্থাটি আদতে কোনো সরকারী সংস্থাই নয়। এটি একটি বেসরকারী সোসাইটি যা ভারতের সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন আইন ১৮৬০-এর আওতায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ভারতের সোসাইটি রেজিস্ট্রারের পক্ষ থেকে এর শংসাপত্রে লেখা রয়েছে যে সংস্থাটি তারা লিপিবদ্ধ করেছে কিন্তু তাদের সঙ্গে কোনো চুক্তি করার আগে অপর পক্ষ যেন সমস্ত বিষয় নিজেরা যাচাই করে নেয়। অর্থাৎ পিএম-কেয়ারের মতোই এটি এমন একটি সংস্থা যা সরকার বেসরকারীভাবে তৈরি করেছে, যার কোনো আইনী বৈধতা রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

২০১৮ সাল অবধি নেট বা নীট পরীক্ষা ভারত সরকার দ্বারা গঠিত 'সিবিএসই' নিত। 'সিবিএসই' ভারত সরকারাধীন একটি শিক্ষা বোর্ড যার বহু দশকের পরীক্ষা নেওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। সেই 'সিবিএসই'-কে সরিয়ে দিয়ে 'এনটিএ' গঠন করা হল, সংসদে আলোচনা না করে, সংসদে কোনো আইনের আওতায় তা পাশ না করিয়ে। কেন? বেসরকারী সোসাইটি সরকারী সিএজি-র পর্যবেক্ষণের আওতায় পড়ে না। তাহলে কি এই কারণেই বেসরকারী সোসাইটি গঠন করা হল? সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী এনটিএ দেশে মোট ২৫টি পরীক্ষা নেয় এবং তাদের স্থায়ী কর্মীর সংখ্যাও সেই ২৫। তাই প্রশ্নপত্র তৈরি, খাতা এবং প্রশ্ন বিভিন্ন কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া, তথ্য-প্রযুক্তিভিত্তিক তথ্য তৈরি করা এবং সংরক্ষিত রাখা সব দায়িত্বই বাইরের সংস্থাকে দেওয়া হয় যাদের মধ্যে বেসরকারী সংস্থাও রয়েছে। অতএব, প্রশ্নপত্র এই ধরনের ব্যবস্থায় ফাঁস না হওয়াই অস্বাভাবিক।

এখন প্রশ্ন হল যে এই ধরনের একটি সংস্থা গঠন করে তার উপরে এত গুরুদায়িত্ব ন্যস্ত করা হল কেন, যেখানে দেশে এর থেকে অনেক বেশি অভিজ্ঞ সংস্থা বহু বছর ধরে তৈরি হয়ে আছে। এর দুটি উত্তর হতে পারে। প্রথমত, সরকারের অবিমৃশ্যকারিতা। গোটা দেশকে একটি শিকলে বাঁধার যে দিবাস্বপ্ন আরএসএস-বিজেপি বহু বছর ধরে দেখে আসছে, 'এনটিএ' এবং 'এক দেশ এক পরীক্ষা' নীতি তার স্বাভাবিক ফল। অন্যদিকে, এই প্রশ্নও উঠছে যে এই গোটা পদ্ধতিটি কি আসলে একটি ব্যাপক দুর্নীতির অংশ? আমাদের দেশে মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হতে পারলে অনেকের ভাগ্য পরিবর্তন হয়। যেহেতু নব-উদারবাদী যুগে সবকিছুই পণ্য। তাই তরুণ-তরুণীদের ভাগ্য, তাদের জীবনও খোলা বাজারে বিক্রি করা যায়। টাকা দিলেই পেয়ে যাওয়া যাবে প্রশ্নপত্র, এমন ব্যবস্থা থাকলে সমাজের উঁচুতলার লোকেদের সুবিধাই হয়। কিন্তু বেশি কড়াকড়ি হলে এই সব হওয়া মুশকিল। তাই কি এমন একটি সংস্থা বানানো হল যার কার্যক্রমই এমনভাবে সাজানো যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়াই স্বাভাবিক? মানে বাজার যখন আছে, চাহিদা যখন রয়েছে তখন টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্রের যোগান দেওয়া যায়, এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন। এনটিএ সেই ব্যবস্থা যা মোদীজি দেশের যুবসমাজকে উপহার দিয়েছেন।

ভারতের ভবিষ্যতের স্বার্থে, পড়াশোনা, শিক্ষা, গবেষণা ইত্যাদিকে বিস্তৃত করতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা যা কোনোরকম সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকবে। কেন্দ্রীভূত পরীক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে এনটিএ-র মত সংস্থার হাতে থাকলে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েই বারংবার প্রশ্ন উঠবে। তাই এনটিএ বাতিল করে আগের পরীক্ষা ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়াই বাঞ্ছনীয়। আশা করা যায় বিরোধীরা এই প্রশ্নে আন্দোলন গড়ে তুলে ভারতের যুবসমাজের উন্নয়নের রাস্তা প্রশস্ত করবেন।