আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ জুন, ২০২৪ ● ১-১৫ আষাঢ়, ১৪৩১

প্রবন্ধ

হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও বঙ্কিম

শ্রীদীপ


সামন্ততান্ত্রিক প্রতীক - সেঙ্গল - ঘটা করে স্থাপিত হয়েছিল গণতন্ত্রের শীর্ষমঞ্চে। নব-সংসদ উদ্বোধনকালে, প্রধানমন্ত্রীর সাধুসঙ্গ দেখে, কোনো সংশয় থাকেনি যে ধর্ম আর রাজনীতির মধ্যে আর কোনো বিভেদ অবশিষ্ট নেই। তাঁর সাষ্টাঙ্গ প্রণাম, প্রমাণ করে ধর্ম ও রাজনীতি - দুয়েরই অবক্ষয়। কোনটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান আর কোনটা সাংবিধানিক, তার মধ্যে পার্থক্য করা ক্রমেই মুশকিল হয়ে পড়ছে। অনির্বাচিত সাধুদের দ্বারা পরিবৃত প্রধানমন্ত্রীর সংসদে আগমন, নিঃসন্দেহে হিন্দুত্ব-জাতীয়তাবাদী-রাজনীতির প্রভাব বিস্তারে একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। সাভারকারের জন্মদিনে সংসদ উদ্বোধন নিছক কাকতালীয় নয়। কারণ এমন অনেক ঘটনাই বিগত দশ বছরে অগুন্তিবার হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী রাম মন্দিরের শিলান্যাস করেছেন আবার ঘটা করে, শীর্ষে থেকে, তার উদ্বোধন করেছেন। আবার তিনিই সম্প্রতি বলেছেন যে তার পার্টি রাম মন্দির নিয়ে রাজনীতি করে না। তিনিও নাকি ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করেন না। অথচ এই জাতীয় নির্বাচনের গোড়ার দিকেই তিনি ভয় দেখিয়েছিলেন - বিরোধীরা ক্ষমতায় এলে নাকি জাতীয় সম্পত্তি অল্প সংখ্যকদের মধ্যে পুনর্বিতরণ করে দেবে। অল্প সংখ্যকরা বহিরাগত। তাদের সন্তান-সন্ততিও অধিক। তার পরেও প্রধানমন্ত্রী ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করেন না কখনও! করলে নাকি তার আর কোনো সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না। ঠিক তার কিছুদিন পরেই, গৃহমন্ত্রী বাংলায় এসে জনসভায় বলেছেনঃ বাংলার সরকার মোল্লা, মাদ্রাসা, মাফিয়া দ্বারা পরিচালিত।


উচ্চবর্গীয় বাঙালির মুসলমান বিরোধিতার একটা লম্বা ঐতিহ্য আছে। যারা সাভারকার ও গোলওয়ালকারকে দায়ী করে থাকেন, হিন্দুত্ব-জাতীয়তাবাদী-রাজনীতির হোতা হিসেবে, তারা চিরকালই, হিন্দু জাতীয়তাবাদ নির্মাণের পিছনে বঙ্কিমের ঐতিহাসিক অবদান, উপেক্ষা করে এসেছেন। একা হাতে, সাম্প্ৰদায়িক চেতনা তৈরী করেছিলেন বঙ্কিম - সাম্প্রদায়িক শক্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বহু দশক পূর্বে। তাঁর উপন্যাসে ও তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে, মুসলমান বিদ্বেষের প্রতুলতা আমরা বাঙালিরা অনায়াসে উপেক্ষা করে থাকি, কারণ বঙ্কিমকে সাম্প্রদায়িক সাব্যস্ত করলে, বাঙালির আধুনিক ও প্রগতিশীল ভাবমূর্তিতে আঘাত লাগে। অথচ, বঙ্কিমের মুসলমান বিদ্বেষের উদাহরণ, কষ্ট করে তদন্ত করতে হয় না। বাকি সব চড়া হিন্দুত্ববাদীদের মত, তা যথেষ্ট প্রতীয়মান।

'আনন্দমঠ'-এ বঙ্কিম যত্নসহকারে যে জাতীয়তাবাদের জন্ম দিচ্ছেন তা নিঃসন্দেহে আগ্রাসী ও সাম্প্রদায়িক। এবং সেই বিদ্বেষের কোনো মার্জিত রাখঢাক নেই। তিনি শুধু যুদ্ধ্যাং দেহি জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি করছেন তা নয়, তার সাথে মন্ত্র দিচ্ছেন - বন্দে মাতরম্। নির্মাণ করেছেন কাল্পনিক ভারত-মাতার যা এমন এক পূজনীয় প্রতীকচিহ্ন যার কোনো দৈব সত্ত্বা নেই। তার না আছে পুরা-কথা, না সে কোনো ধর্মীয় আচারপদ্ধতি দ্বারা নির্মিত। সে শুধুই চায় ত্যাগ, তার ‘সন্তানদের’ থেকে। পরে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ভারত-মাতা ও 'বন্দে মাতরম্'-এর ব্যবহার, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে করলেও, এই মাতা আর এই মন্ত্র, বঙ্কিম নিক্ষেপ করেন মুসলমান সামন্ততান্ত্রিক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে - এই ধারণা 'আনন্দমঠ' পড়লে, দৃঢ়ভাবে বলবৎ হয়। 'বন্দে মাতরম্'-এর প্রথম পরিচ্ছেদে বাংলার প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের প্রাচুর্য থাকলেও, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে রয়েছে অস্ত্রধারী দেবীর দুশমন-দমন। দুশমন যে কে তা বলাই বাহুল্য। অন্যথায় 'ভারত কলঙ্ক' রচনায়, বঙ্কিম, গোটা মধ্যযুগীয় মুসলমান শাসনকালকেই কলঙ্ক বলে দাবি করছেন, যেমনটা বর্তমান সাম্প্রদায়িক শক্তি করেই থাকে। 'আনন্দমঠ'-এ রয়েছে মুসলমান নিধন ও মসজিদ ধ্বংসের আহ্বান। এটা আদৌ কাকতালীয় নয় যে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় বহু মুসলমান 'বন্দে মাতরম্' বলতে অস্বীকার করে। আর এটাও কাকতালীয় নয় যে আজকের ভারতে, জনদণ্ডের ঘৃণ্য ঘটনাকালে, মুসলমানদের বাধ্য করা হয় 'বন্দে মাতরম্' বলতে - ভারতের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রমাণ করতে।

এ দেশ মুসলমানদের নয়, এ দেশ আর কারো নয়, এ দেশ কেবলই হিন্দুদের - এমন ধারণা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বঙ্কিমের বহু প্রবন্ধেও। অর্থাৎ ধর্মের ভিত্তিতে এলাকার অধিকার যা কিনা হিন্দুত্বের ও হিন্দু-রাষ্ট্র গঠনের মর্মকথা। এর উৎস বঙ্কিম। বঙ্কিমের সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের তিনটি স্তর আছে। প্রথমত, পরাধীনতার আখ্যান নির্মাণ। 'ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ও পরাধীনতা' নামক প্রবন্ধে তিনি সাফ লিখছেনঃ "ভারতবর্ষ পূর্বে স্বাধীন ছিল - এখন অনেক শত বৎসর হইতে পরাধীন।" এই পরাধীনতার কারণ মধ্যযুগে মুসলমান সাম্রাজ্য বিস্তার যার জন্যেই হিন্দুদের এই হালঃ "ভিন্নদেশীয় লোক, কোনো দেশে রাজা হইলে একটি অত্যাচার ঘটে।" অর্থাৎ মুসলমানরা, বঙ্কিমের চোখে বিধর্মী, বহির্গত ও অত্যাচারী, ঠিক যেমন বর্তমানকালের হিন্দুদত্ববাদীরাও মনে করে থাকে। বিধর্মী মানে 'অপর' বা 'Other'। অর্থাৎ আপনার ও পরের সুনিশ্চিত বিভেদ অঙ্কন। পর ক্ষতিকারক। আপন ক্ষতিগ্রস্থ - 'হিন্দু খতরে মে'।

বঙ্কিমের সাম্প্রদায়িকতার দ্বিতীয় স্তরঃ ‘বাহুবল’। 'বাঙালির বাহুবল' রচনায় বঙ্কিম স্পষ্ট লিখছেনঃ "বাহুবল ভিন্ন উন্নতি নাই।' বাহুবল ও প্রয়োজনে তার প্রবল প্রয়োগের মাধ্যমে, অপরের দমন ও নিধন করতে হবে। অর্থাৎ দেশ নির্মাণের মূলে দ্বেষ। দেশ (পড়ুন হিন্দু-রাষ্ট্র) নির্মাণের ভিত্তি ধর্ম - হিন্দু ধর্ম। এ এক যুদ্ধে নামার আহ্বান যে যুদ্ধমনস্কতা, বঙ্কিমের বহু ঐতিহাসিক উপন্যাসে বহুবার এসেছে। এ এক সমবেত হওয়ার প্রয়াস। তার উদ্দেশ্যঃ অপরের প্রতি প্রতিহিংসা পোষণ ও প্রতিশোধ স্পৃহা ও একই সাথে নিজের আত্মমহিমা জানান দেওয়া। উদ্দেশ্যঃ অপরকে দোষী ও অপরাধী সাব্যস্ত কোরে নিজেকে হয় গৌরবান্বিত করা; নিজেকে অত্যাচারিত বলে ঘোষিত করা। উদ্দেশ্যঃ ধর্মের ভিত্তিতে, ওপরের বিরুদ্ধে নিজের প্রাধান্য ও প্রাবল্য জাহির করা যা বর্তমান ভারতে আকছার ঘটছে।

কিন্তু এ সমবেত হিন্দু ঐক্যসাধন ও তার প্রদর্শন হবে কী উপায়ে? বঙ্কিমের মতে, হিন্দুজাতির পরাধীনতার আরেকটি কারণঃ হিন্দুসমাজের অনৈক্য - জাতি, ভাষা, বর্ণ বিভেদ। এই বিভেদ মেটাবার জন্য প্রয়োজন তৃতীয় সংকল্পঃ ধর্মের ভিত্তিতে একতার আর্জি। 'ভারতবর্ষ পরাধীন কেন?' রচনায় বঙ্কিম আহ্বান জানাচ্ছেন এক সংহতি নির্মাণ প্রকল্পেরঃ "হিন্দুমাত্রেই যাহাতে মঙ্গল, তাহাতেই আমার মঙ্গল। হিন্দুজাতি ভিন্ন পৃথিবীতে অন্য অনেক জাতি আছে। অনেক স্থানে তাহাদের মঙ্গলে আমাদের অমঙ্গল। যেখানে তাহাদের মঙ্গল আমাদের অমঙ্গল, সেখানে তাহাদের মঙ্গল যাহাতে না হয়, আমরা তাহাই করিব।" অর্থাৎ কিনা হিন্দু ঐক্য চিন্তার মূলেও, অপর বনাম নিজ। এবং সেই প্রকল্পে বঙ্কিম - 'বিদেশী, বিধর্মী, আসর, পরপীড়ক, মিথ্যাবাদী, হিন্দুবিদ্বেষী মুসলমানের কথা'-কে 'বাংলার ইতিহাসের এক অংশ' বলেও গণ্য করতে নারাজ। বরং তাদের চাইতে তিনি শ্রেয় মনে করেছেন 'ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় শাসন' - "কেন না, ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় শূদ্রপীড়ক হইলেও স্বজাতি।" বাকি হিন্দুবাদীদের ন্যায় বঙ্কিমের উচ্চবর্ণের প্রতি পক্ষপাতও স্পষ্টত প্রতীয়মান।

বিচক্ষণ পাঠক এবার দুয়ে দুয়ে চার করে নিতে পারবেন। বঙ্কিমের এই সমস্ত ধারণাগুলিই বর্তমান শাসকদলের আদর্শগত মূল-মন্ত্র। বিগত এক দশকে, সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানের যে অভূতপূর্ব নজির আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, সেই শক্তির যথাযথ উৎস-সন্ধানে নামলে, বঙ্কিমকে দায়ী না করে উপায় নেই। বিভাজনের রণকৌশল ও ধর্ম ও রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য সহবাসের গতিপথ বঙ্কিম দিয়ে গেছেন ঊনবিংশ শতাব্দীতেই - সাভারকার ও গোলওয়ালকার-এর জন্মের বহু পূর্বে। আজ সেই মার্গের বাস্তবায়িকতার চেহারাটা আমার দেখতে পাচ্ছি হিন্দু বাহুবলে, মুসলমান বঞ্চনায় ও সংখ্যালঘুর উৎপীড়নে।

পশ্চাৎগামী এক সাম্প্রদায়িক কার্যক্রমকে রূপ দিতে গিয়ে, আমরা এটা ভুলতে বসেছি যে ধর্মের নামে এক সম্প্রদায়ের মানুষকে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের পিছনে লেলিয়ে দেওয়াটা, আধুনিকতা ও সভ্যতার লক্ষণ নয়। ভুলতে বসেছি যে - কোনো মধ্যযুগীয় অনাচারের প্রতিশোধ, অধুনাকালে নেওয়া অসম্ভব, কারণ পরিপ্রেক্ষিতের আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে। প্রতিশোধ স্পৃহা প্রতিপালনে কেবলই আগ্রাসন ও অসহিষ্ণুতা বাড়ে, আখেরে লাভ হয়না কারোরই। আধুনিক রাষ্ট্রের কাজ অন্তর্ভুক্ত করা, বঞ্চিত করা নয়। তবে যখন গেরুয়াধারী সাধুদের এনে সংসদের উদ্বোধন হয়, তখন আর আধুনিকতার দাবি খাটে কি? বা যখন প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন ভগবান তাঁকে পাঠিয়েছেন দেশ রক্ষার স্বার্থে, তখন দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে 'হা ভগবান!' বলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে কি? সত্যিই, এ এক নতুন বিচিত্র ভারত বটে!