আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ জুন, ২০২৪ ● ১-১৫ আষাঢ়, ১৪৩১

প্রবন্ধ

বেঙ্গালুরুর জলসংকট

পার্থপ্রতিম বিশ্বাস



বাঙালির শব্দভাণ্ডারে আশির দশকে অতিপরিচিত শব্দ হয়ে উঠেছিলো ‘লোডশেডিং’। গ্রীষ্মে বিদ্যুতের প্রবল চাহিদা পূরণে সরকার অপারগ হলে বিদ্যুতের যোগান পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে বন্ধ রাখা হতো। এই করে বিদ্যুৎ গ্রিডের বিপর্যয় ঠেকানো যেত। ফলে গরমের অন্ধকারে হাবুডুবু খাওয়া বাঙালির জীবনে তখন তালপাতার হাতপাখা আর লণ্ঠনের আলো হয়ে উঠেছিল ‘লোডশেডিং’ মোকাবিলার অস্ত্র। কিন্তু প্রায় চার দশক বাদে বাংলা নয় এবার বেঙ্গালুরুর কল্যাণে আবার ‘লোডশেডিং’-এর আতঙ্ক নতুন আঙ্গিকে ঘাঁটি গাড়ছে দেশের বিভিন্ন শহরে। বিগত কয়েক বছর ধরেই বেঙ্গালুরু শহর জলশূন্য হওয়ার যে আশংকা ঘনিয়ে উঠছিল, এবারের গ্রীষ্মে সেটাই কার্যত সত্যি হতে পারে। কারণ গত মরশুমে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই কম বৃষ্টি হওয়ায় এবছর গরম পড়ার আগে মার্চ মাস থেকেই শহরের ভুগর্ভস্থ জলের ভাঁড়ার কার্যত শূন্য হওয়ার পথে। ফলে প্রবল এই জলের সংকট নিয়ন্ত্রণ করতে ‘মরণকালে হরিনামের’ মতোই বেঙ্গালুরু শহরের পুরনিগম এবং রাজ্যের সরকার চালু করেছে জলের ‘লোডশেডিং’, যার অর্থ শহরের বড় বড় শিল্প, বানিজ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বড় বড় আবাসনে বিভিন্ন সময়ে দৈনন্দিন জলের স্বাভাবিক বরাদ্দ ছাঁটাই। ছাঁটাই সাঁতারের জল, বাগানের জল, রাস্তার জল। সংকট যেমন যেমন বাড়বে সেভাবেই বাড়বে জলের ছাঁটাই। এক কথায় এই গ্রীষ্মে চোখের জলে নাকের জলে হতে চলেছে এদেশের ‘সিলিকন ভ্যালির’ বাসিন্দারা।

এমন জল সংকটের প্রেক্ষিতে আর কতদিন সেই শহরে দোকানপাট, হোটেল, রেস্তোঁরা থেকে শুরু করে বড় শিল্প, বাণিজ্য, পরিষেবা কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিক ছন্দে খুলে রাখা যাবে সেটাই এক জরুরি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কার্যত শহরে মানুষ একে অন্যের মুখোমুখি হলেই জিজ্ঞাসা করছে সেই পুরোনো কথাটাই - "একটু জল পাই কোথায় বলতে পারেন?"

অবশ্য বাঙালি ইতিমধ্যে কলকাতার প্রবল গ্রীষ্মে পানীয় জলের ক্লেশ কিংবা ঘোর বর্ষায় দুয়ারের জলে হাবুডুবু খাওয়ার যন্ত্রণাকে মরসুমি বিপদ মেনে নিয়েছে কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের দাপটে দেশের তথ্য-প্রযুক্তির রাজধানী বেঙ্গালুরু শহরের এমন জলশূন্য হয়ে ওঠার বিপদ আজ আর কোনো একটা শহরের মামুলি মরসুমি বিপদ নয় বরং সামগ্রিকতার নিরিখে সেই বিপদ হয়ে উঠেছে দেশের বহু শহরের অস্তিত্বের গভীরতর এক অসুখ। ভয়ের কথা কলকাতা জুড়েও ছড়িয়ে রয়েছে সেই অসুখের উপসর্গ।

কয়েক দশক জুড়েই নগরায়নের ধাক্কায় শহরে ভিড় বাড়ছে মানুষের - উন্নত আয়ের খোঁজে, উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাস, পরিষেবার খোঁজে। সেই ধাক্কায় উলটে পালটে যাচ্ছে এক একটা শহরের ইতিহাস, ভূগোল, পরিমিতি। কৃষিভিত্তিক এই দেশে এখন সিংহভাগ মানুষের আয় আর কৃষিনির্ভর নয় বরং আজ সেটা হয়ে উঠেছে শিল্প এবং পরিষেবা নির্ভর। ফলে শিল্প-পরিষেবা কেন্দ্রিক নগরায়নের নতুন মডেল হয়ে উঠেছিল বেঙ্গালুরু। অবিশ্বাস্য গতিতে গত দু' দশকে সেই শহরের জনসংখ্যা কলকাতাকে টেক্কা দিয়ে হয়েছে প্রায় দেড় কোটি। একদা ছোট্ট পুরোনো ‘গার্ডেন সিটি’ থেকে একালের আধুনিক ‘সিলিকন ভ্যালি’ হতে গিয়ে বিপদ ঘটেছে বৃদ্ধির ভারসাম্যে। ফলে শহরের ধারণক্ষমতা ছাপিয়ে শহর গড়ার গভীর অসুখে আক্রান্ত আজ বেঙ্গালুরু।

হাল আমলে এরাজ্য থেকে ভিন রাজ্যে উচ্চশিক্ষা কিংবা সংগঠিত ক্ষেত্রে শিল্প পরিষেবার কাজে যুক্ত হতে চাওয়া সিংহভাগ বাঙালির গন্তব্য হয়ে উঠেছে বেঙ্গালুরু। ফলে সেই শহর বাসযোগ্য না থাকলে এরাজ্যের বিপদ বাড়ে বই কমে না। কলকাতার মতো পুরোনো এবং অগোছালো নয় - বরং সুপরিকল্পিত শহর হিসাবে গড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে বেঙ্গালুরু। এতদসত্ত্বেও সেই শহরের ভয়াবহ জল সংকট, কিংবা শহরে পথঘাটের দুরবস্থা অথবা সকাল সন্ধ্যায় দুর্বিষহ ট্র্যাফিক জ্যাম কিংবা বেহাল নিকাশি ব্যবস্থা বেঙ্গালুরুর পরিকল্পনার মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সন্দেহ নেই এই প্রবল প্রতিযোগিতার বাজারে নাতিশীতোষ্ণ জলহাওয়া, উন্নত পরিকাঠামো কিংবা পরিষেবার টানেই সেই শহরে ছুটে গিয়ে ঘাঁটি গেড়েছে ‘ওয়ালমার্ট’ থেকে ‘গুগল’-এর মতো বাঘা বাঘা বহুজাতিক সংস্থা থেকে শুরু করে ছোটো-বড় স্টার্ট-আপ সংস্থাগুলো।

পরিকাঠামো কিংবা পরিষেবার মানের নিরিখে যেকোনো শহরের ধারণক্ষমতা অসীম নয় বরং তা সীমাবদ্ধ। ফলে ধারণক্ষমতার লক্ষন রেখা ছাড়িয়ে সম্প্রতি ‘যোশিমঠ’-এর যে হাল হয়েছে তেমন পরিণতি বেঙ্গালুরুর জন্য অপেক্ষা করছে কিনা অচিরেই তা বোঝা যাবে বর্তমান জলাতঙ্কের প্রেক্ষিতে।

বেঙ্গালুরুর অপরিকল্পিত এবং ভারসাম্যহীন নগরায়নের ছবি উঠে এসেছে সম্প্রতি সেই শহরে এদেশের অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান ‘Indian Institute of Science’-এর গবেষণায়। গত পাঁচ দশকে সেই শহরে কংক্রিট-বিটুমেনের চাদর জড়ানো নির্মাণের পরিমান বেড়েছে দশ গুণ। এখন সেই শহরের ৯৩ শতাংশ কংক্রিটের নির্মাণে মোড়া। জলাজমি পরিবেশ আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হারিয়ে গেছে। এখন শহরের ৮৮ শতাংশ সবুজ এলাকা আর শহরের ৭৯ শতাংশ জলাশয়। ঐ জলাজমি কিংবা জলাশয় যেগুলো শহরে বৃষ্টির জলের পাতাল প্রবেশের পথ ছিল, সেগুলি অবরুদ্ধ হয়ে চাপা পড়েছে নির্মাণের দাপটে। ফলে ভয়াবহ নির্মাণের বহরে, যে শহর একসময় ছিল সবুজে ঘেরা নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল, আজ সেই শহর হয়ে উঠেছে নেড়া উত্তপ্ত দ্বীপের মতো। কলকাতা শহরে গার্ডেনরিচ বিপর্যয়ের পর জলা ভরাট কিংবা বেআইনি নির্মাণের যেমন অভিযোগ ওঠে তেমনটা বেঙ্গালুরুরও ক্ষেত্রেও ওঠে। কলকাতায় এমন বেআইনি নির্মাণে মধ্য পুঁজির বাহুবলিদের দাপট বেশি - বেঙ্গালুরুতে দাপট একচেটিয়া কর্পোরেট পুঁজির।

নির্মাণের দাপটে উত্তরোত্তর সেই শহর উত্তপ্ত হওয়ার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণও কমেছে। বিশেষত কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র এবং তেলেঙ্গানার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়েই গতবছর বৃষ্টির ঘাটতির কারণে ভূগর্ভের মধ্যে জলের ঘাটতিও বেড়েছে। ভূপৃষ্ঠের বৃষ্টির জল ভূগর্ভে জমা হয় ‘aquifier’ স্তরে পৌঁছে। বেঙ্গালুরু শহর সমেত বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ভূগর্ভের সেই জল জমা থাকে পাথুরে মাটির স্তরের ভেতরে যার জলধারণ ক্ষমতা গাঙ্গেয় অববাহিকার পলিমাটির তুলনায় অনেক কম। সেই মাটি যত দ্রুত জলে ভরে ওঠে তেমনই দ্রুত সেই জল ফুরিয়েও যায়। অনাবৃষ্টির কারণে ভূগর্ভে বৃষ্টির জল প্রবেশ না করলে জলের ভাঁড়ারে কোনো সঞ্চয় থাকে না। যে শহরের জলের যোগানের অর্ধেক নির্ভর করে ভূগর্ভস্থ জলের ওপর সেই শহরে আসন্ন গ্রীষ্মে যে শিরে সংক্রান্তি হওয়ার অবস্থা হবে তা সহজেই অনুমেয়। লাগামছাড়া মানুষের ব্যবহারের জল, শিল্প-পরিষেবা এবং নির্মাণ ক্ষেত্রে জলের জোগান দিতে গিয়ে সাম্প্রতিক কালে যে পরিমাণ ভূগর্ভস্থ জল পাম্প করে বার করা হয়েছে তার তুলনায় অনেক কম পরিমাণ জম ভূগর্ভে জমা হয়েছে। ফলে হু হু করে শহরের জলের স্তর নামায় বেঙ্গালুরুর ১৪,৭০০ গভীর নলকূপের অর্ধেক বিকল হয়ে গেছে।

কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়েও অতিরিক্ত নির্মাণের কারণে একইভাবে ভূগর্ভস্থ জলস্তর নেমেছে। ফলে কাদা মাটির ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা কলকাতার মাটি বসে যাচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে হেলে পড়তে পারে অনেক বাড়িঘর। এমনকি ভূমিকম্পের সময় এই নেমে যাওয়া জলস্তরের প্রভাবে বিপর্যয় নামতে পারে শহরজুড়ে।

বেঙ্গালুরুর জল সংকটের ডামাডোলে শহর জুড়ে জলের ট্যাঙ্কারের কালোবাজারি শুরু হয়েছে। জল মাফিয়াদের দৌরাত্ম্যে ট্যাঙ্কার পিছু সাতশো-আটশো টাকার জল বিক্রি হচ্ছে দু' থেকে তিনগুণ বেশি দামে। পাশাপাশি কাবেরি নদী থেকে শহরে ৯০ কিলোমিটার লম্বা পাইপ লাইনে খরচ হয় দৈনিক তিন কোটি টাকা। অথচ সেই কাবেরি উপত্যকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে জঙ্গল সাফ করার পরিণতিতে নদী সংলগ্ন এলাকার ভূগর্ভেও জলের টান পড়েছে। সবমিলিয়ে ঘেঁটে ঘণ্ট হওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত আজ বেঙ্গালুরু শহর জুড়ে।

একথা ঠিক একটা আধুনিক শহর যেমন একদিকে প্রচুর রাজস্ব এবং কাজের সুযোগ সৃষ্টি করে আবার উল্টোদিকে শহরের লাগামছাড়া বৃদ্ধি তৈরি করে নিকাশি, যানবাহন, পরিবেশ কিংবা জলের ওপরে লাগামছাড়া চাপ। পরিবেশের সাথে সংঘাতে গিয়ে উন্নয়নের কোনো দীর্ঘমেয়াদি মডেল আজও তৈরি হয়নি। ফলে সরকার কিংবা পুরপ্রশাসনকে শহর গড়ার লক্ষণরেখা মেনে চলতে হবে। অন্যথায় কেপটাউন, মেলবোর্ন কিংবা জাকার্তা নয় বেঙ্গালুরুর মতো হাল হতে পারে এদেশের যেকোনো শহরের।