আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ জুন, ২০২৪ ● ১-১৫ আষাঢ়, ১৪৩১
প্রবন্ধ
ভারত কি বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে পড়ছে?
নিখিলরঞ্জন গুহ
এক বাণিজ্যিক আলোচনাচক্রে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেয়েবাজ শরিফের বক্তব্য এইক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তাঁর ভাষায়, " I was quite young when... we were told that it's a burden on our shoulders... Today you all know where that 'burden' has reached (in terms of economic growth)." 25 April, 2024। এটা শুধু পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর উপলব্ধি বললে ভুল হবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলির উপলব্ধিও মোটামুটি এক। ১৯৪৭ সালে সদ্য গঠিত রাষ্ট্র, পাকিস্তানের অংশ পূর্ব পাকিস্তান (অধুনা বাংলাদেশ) ব্রিটিশ শাসিত শোষণের দায়ভাগ নিয়ে শোষণমুক্ত হতে পেরেছিল তা বলা যাবে না। পশ্চিম পাকিস্তান তার অঙ্গরাজ্য পূর্ব পাকিস্তানকে কী চোখে দেখত তা তার বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট। শ্রমশক্তি এবং কাঁচা মালের উৎস হিসেবে বিবেচিত (১৯৪৭-১৯৭১) দীর্ঘ শোষণের পর একটা রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে গঠিত স্বাধীন বাংলাদেশ ইতিমধ্যে যে সাফল্য দেখিয়েছে তা নিঃসন্দেহে দৃষ্টান্ত বিশেষ।
জনসংখ্যার নিরিখে চিনকে ছাড়িয়ে যাওয়া ভারতের অর্থনীতির আকৃতি নিয়ে আমাদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা চলছে। এই ক্ষেত্রে জিডিপি ৪,১১২ বিলিয়ন ডলার নিয়ে বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ অর্থনীতির দেশের দাবি নিয়ে ভারত সরকারের ঢক্কানিনাদ উল্লেখ করার মতো। এরকম একটা দেশের অর্থনীতির সাথে বাংলাদেশের অর্থনীতির তুলনা করা আপাতভাবে অর্বাচীনের কাজ মনে হতে পারে। তবে এই নিয়ে বিভিন্ন সমীক্ষার তথ্য রীতিমতো চমকপ্রদ। এখানে প্রথমেই বলে রাখা ভাল জিডিপি অর্থনীতিতে পরিমাপক হিসেবে একটা গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও সবসময় তা দেশের অর্থনীতির সুস্বাস্থ্যের ইঙ্গিত বহন করে না। সাধারণ মানুষের ভোগ স্পৃহায় তার ভূমিকা কতটুকু সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্যভাবে বলা যায় সম্পদ কীভাবে বন্টিত হচ্ছে এই ক্ষেত্রে তা বিবেচনার দাবি রাখে। বিশ্বে ক্ষুধাপীড়িত (GHI) দেশগুলির মধ্যে ভারতের করুণ অবস্থাই তার প্রমাণ। এই প্রশ্নে ভারত যে সার্কভুক্ত দেশগুলিরও পেছনে সেটা অনেকেরই বিবেচনায় আসছে না। 'গ্লোবাল হাংগার ইনডেস্ক'-এর (GHI-২০২৩) তথ্যে দেখা যাচ্ছে ভারতের স্থান ১২৫টি দেশের মধ্যে যখন ১১১ তখন বাংলাদেশের স্থান ৮১তম। এখান থেকে এটা স্পষ্ট বাংলাদেশে ক্ষুধাপীড়িত মানুষের অনুপাত ভারতের তুলনায় কম।
যে জিডিপিকে ভিত্তি করে এত হইচই, তার মাথাপিছু হার ভারতে এতটাই করুণ যে জি২০ দেশগুলি তো দূরের কথা ভারত বাংলাদেশের থেকেও পেছনে। IMF-এর রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে ২০২১ বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি যখন ২,৬২১ ডলার তখন ভারতে তা ছিল ২,৬১২ ডলার। পাকিস্তানকে বাংলাদেশ আট বছর আগেই পেছনে ফেলে দিয়েছে। ভারত পেছনে পড়েছে ২০১৯ থেকে। এই সময় ভারতের মাথাপিছু জিডিপি - যখন ২,০৫০ ডলার তখন বাংলাদেশে এই জিডিপি - ২,১২২ ডলার। ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশ, ভারত থেকে এগিয়ে। ফারাকটা কম হলেও তা ক্রমবর্ধমান। বাংলাদেশের মতো একটা দেশের ক্ষেত্রে এই ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করার মতো। যদি ধনী পরিবারগুলির প্রথম ১০০ পরিবারের সম্পদের সমষ্টিকে বাদ দিয়ে হিসেব হয় তবে ভারতে মাথাপিছু জিডিপির সেই হারও হ্রাস পাবে। যেকোনো সুষ্ঠু অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের একটি প্রাকশর্ত হল মানবসম্পদের উপর তার ইতিবাচক প্রভাব। সেখানেও ভারত আশানুরূপ ফল দেখাতে পারেনি। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানকে এখানেও পেছনে ফেলে দিয়েছে। ১৯৩টি দেশের সমীক্ষায় বাংলাদেশ যখন ১২৯তম, পাকিস্তান ও ভারতের স্থান তখন যথাক্রমে ১৬৪ এবং ১৩৪ (March 19, 2023. Source United Nations Development Programme)। উল্লেখ্য ২০১৪ সালে ভারতের এই স্থান ছিল ১৩০তম (15 December, 2015. UNDP)। উল্লেখ্য ভারত তার ২০১৪ সালের স্থানকেও ধরে রাখতে পারেনি।
বেকার সমস্যা বিশ্বে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। বিশ্বে এই হার গরিবযখন ৫.১% (ILO-23) তখন বাংলাদেশ তাকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছে। বিশ্বব্যাঙ্কের রিপোর্ট (২০২৩) বলছে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ৪.২%। অথচ ভারতে এই হার ২০১৪ সাল থেকেই ঊর্ধ্বমুখি। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৬.১% যার বর্তমান হার ৮% (Febryary 24, CMIE’S CPH SURVEY, March, 2024)। যদি আমরা ২০১৪-কে ভিত্তি ধরি তবে দেখা যাবে বিগত দশ বছরে উল্লিখিত সূচকগুলির প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা পিছিয়েছি। মানবসম্পদ উন্নয়নের নিরিখে ২০২৩ সালে ভারতের স্থান ১৯৩টি দেশের মধ্যে যখন ১৩৪ তখন ২০১৪-য় দেখা যায় তা ছিল ১৩০। তারপর থেকে ভারত ক্রমাগত পিছিয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশের উন্নতি ঘটেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ক্ষুধাপীড়িত দেশগুলির মধ্যে ২০১৪-২০২১ বাংলাদেশে ধারাবাহিকভাবে উন্নতি ঘটেছে। তার স্থান ১৪৩ থেকে ৮১-তে উঠে এসেছে।
কোনও দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ কতটা দৃঢ় তা বোঝার জন্য মাথাপিছু ঋণকেও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। ভারতের মাথাপিছু ঋণ বিগত দশ বছরে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধি বাংলাদেশেও ঘটেছে তবে তা অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঘটেনি। ২০১৪ সালে বাংলাদেশে মাথাপিছু ঋণ ছিল ৩২১ ডলার। ২০২৩ সালে তা দাঁড়ায় ৫৮০ ডলার। সেখানে দেখা যাচ্ছে ২০১৪-২০২২ ভারতের এই ঋণ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৪৬১ থেকে ২৪১০.৯ ডলার, অর্থাৎ প্রায় পাঁচ গুণ।
শ্রমনিবিড় কৃষিব্যবস্থা দেশের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা নিলেও দেশটা যে ধীরে ধীরে শিল্পের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে তা স্পষ্ট। দেখা যাচ্ছে দেশের জিডিপিতে ১৫-১৬-তে যখন কৃষির অংশগ্রহণ ছিল ১৪.৭৭% তা ১৮-১৯-এ হ্রাস পেয়ে হয়েছে ১৩.৩২%। বিপরীতে শিল্পের এই অংশগ্রহণ ২৮.৭৭% থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৩১.১৫%। ভারতের ক্ষেত্রে ঘটেছে উলটো। কৃষি, উৎপাদন শিল্প এবং পরিষেবা শিল্পে নিযুক্ত শ্রমশক্তির হ্রাসবৃদ্ধিতে তা প্রতিভাত হতে দেখা যায়। নীচের টেবিল থেকে এর একটা ধারণা পাওয়া যায়।
দেশ | বাংলাদেশ* | ভারত | হ্রাস/বৃদ্ধি | ভারত | বাংলাদেশ | হ্রাস/বৃদ্ধি |
বছর | ২০১১ | ২০২০* | ২০১১ | ২০২০ | ||
কৃষি | ৪৬.৬৭% | ৩৭.৮৭%* | (-)৪.৯৫% | ৪৯.২৬% | ৪৪.৩১% | (-)৮.৮০% |
শিল্প | ১৮.৫৪% | ২১.২৫%* | (+)০.৭২% | ২৩.২১% | ২৩.৯৩% | (+)২.৭১)% |
পরিষেবা | ৩৪.৭৯% | ৪০.৮৮%* | (+)৪.২৩% | ২৭.৫৩% | ৩১.৭৬% | (+)৬.০৯% |
তথ্যসূত্রঃ Distribution of the work force across economic sector 2021 (statsta.com).
এখানে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমশ কৃষি থেকে শিল্পের দিকে ঝুঁকছে। ভারতের ক্ষেত্রে তেমন দেখা যাচ্ছে না, যার নেতিবাচক প্রভাব কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে। ১৫-২৪ বছরের শ্রমশক্তির কাজে অংশগ্রহণকারী দেশগুলির মধ্যে বিশ্বব্যাঙ্ক প্রকাশিত তথ্যে দেখা যাচ্ছে ২৮.৯০% নিয়ে ভারত যখন ৩২তম স্থানে তখন বাংলাদেশ ৩৯.০৪% নিয়ে ১৯তম স্থানে। বস্ত্রশিল্পে বাংলাদেশের বিশ্বজোড়া খ্যাতি সকলেরই জানা। পাটজাত দ্রব্য উৎপাদনেও বাংলাদেশের সুখ্যাতি বর্তমান। ইস্পাত, ফার্মাসিউটিক্যাল এবং ইলেকট্রনিক শিল্পের প্রসারও ঘটেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। পরিষেবা শিল্পেও এই দেশটি পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক হালহকিকত বুঝতে গেলে বৈদেশিক বানিজ্যকেও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। একটা তুলনা এখানে উল্লেখ করা হলঃ
দেশ | বাংলাদেশ | ভারত | ||||||
বছর | ২০১৯ | ২০২০ | ২০২১ | ২০২২* | ২০১৯ | ২০২০ | ২০২১ | ২০২২ |
আমদানি | ৬৪.৯২ | ৫৯.১৮ | ৭১.০২ | ৯৬.১৭* | ৬০২.৩২ | ৫১০.২৪ | ৭৬০.৯০ | ৯১১.৩৯ |
রপ্তানি | ৪৫.৯৯ | ৩৯.০৫ | ৪৪.৩৯ | ৫৯.২৮* | ৫২৯.২৫ | ৪৯৯.৭৩ | ৬৭৭.৭৭ | ৭৫৯.৯৩ |
ঘাটতি | ১৮.৯৩ | ২০.১৩ | ২৬.৬৩ | ৩৬.৮৯* | ৭৩.০৭ | ১০.৫১ | ৮৩.১৩ | ১৫১.৪৬ |
* (বিলিয়ন ডলারের হিসেবে।)
Source: World Bank (21/04/2024).
২০১৯-কে ভিত্তি ধরলে বানিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতি বৃদ্ধির হার ৯৪.৮৮% সেখানে ভারতের ক্ষেত্রে তা ১০৭.২৮%। দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান দুই বৃহৎ অর্থনীতির দেশ চিন ও ভারতের পাশাপাশি উদীয়মান দেশ হিসেবে বাংলাদেশের এই আত্মপ্রকাশ সত্যিই বিস্ময়কর।
এটা সম্ভব হয়েছে সম্পদের পরিকল্পিত ব্যবহারের ফলে। দেখা যাচ্ছে দেশটি দারিদ্রের হারকেও ২০১০-২০২১-এর মধ্যে ১১.৮% থেকে ৫.০% নামিয়ে আনতে পেরেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিমাণ, ভারতের আয়তন এবং জনসংখ্যার বিচারে কম হবে এটা খুব স্বাভাবিক। তবে তা থেকে যে দেশের প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায় না তার দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ। ভারতে সম্পদের অসম বন্টনের ফলে জিডিপির সিংহভাগই চলে যাচ্ছে ধনীদের হাতে। ট্রিকলডাউন নীতিতে তার ছিটেফোঁটা নিয়ে প্রান্তিক মানুষেরা খুশি থাকতে বাধ্য হচ্ছে। বিশ্বে সর্বাধিক যুবসম্পদের অধিকারী ভারতের এই মন্দাগতি নিঃসন্দেহে চিন্তার কারণ। আর এখানেই বাংলাদেশ ব্যতিক্রম। আপাতভাবে তা মেনে নিতে অসুবিধা হলেও এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় না। বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক সমীক্ষা থেকেও তার ইঙ্গিত স্পষ্ট।