আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ জুন, ২০২৪ ● ১-১৫ আষাঢ়, ১৪৩১
প্রবন্ধ
কিছু রাজনৈতিক দল কি লুপ্ত হবার পথে?
অশোক সরকার
রাজনীতির মঞ্চে এমন কিছু ঘটতে থাকে যা কখনও কখনও বিশ্লেষক এবং সর্বসাধারণের চোখ এড়িয়ে যায়। তার একটা হলো রাজনৈতিক দলের উত্থান ও বিলোপ। অনেকে বলেন রাজনীতিতে কোনো দলই একেবারে শেষ হয়ে যায় না। তা হয়ত সংখ্যাগতভাবে ঠিক কিন্তু আমরা বিলোপ বলতে তাৎপর্যহীনতার কথা বলছি। দল আছে, মাঝে মাঝে দেয়াল লিখনে, মিটিং মিছিলে চোখেও পড়ে, কিন্তু নির্বাচনী রাজনীতির আঙ্গিনায় দাগ কাটে না। ভারতে ৬টি জাতীয় পার্টি, ৫৭টি রাজ্য স্তরের পার্টি আর ২,৭৬৪টি নথিভুক্ত কিন্তু অস্বীকৃত পার্টি আছে। কংগ্রেস, বিজেপি আম-আদমি, সিপিআই(এম), বিএসপি, এনপিপি (কনরাড সাংমা) - এই ছয়টি হলো জাতীয় পার্টি। দেশের উত্তরে, ন্যাশানাল কনফারেন্স, পিডিপি, শিরোমণি অকালি দল থেকে শুরু করে দক্ষিণে এমডিএম, মুসলিম লিগ; পুবে অসম গণ পরিষদ, আরজেডি, তৃণমূল, বিজেডি; পশ্চিমে এনসিপি, শিবসেনা ইত্যাদি ওই ৫৭টি রাজ্য স্তরের পার্টির মধ্যে পড়ে। এইসব পার্টির মধ্যে কারুর বয়স ১০০ বছরেরও বেশি, কারুর মাত্র দশ বছর। এইসব পার্টির অনেকেই খবর রাখেন কিন্তু অনেকে ভুলে গেছেন একসময়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বতন্ত্র পার্টি, বাংলা কংগ্রেস, এসইউসি, মহারাষ্ট্রবাদী গোমন্তক পার্টি, প্রজা সোশালিস্ট পার্টি প্রভৃতি ছিল যাদের আজকে নির্বাচনী রাজনীতির আঙ্গিনায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনকি রাজনীতির কথোপকথনেও তাদের স্থান নেই। অথচ এক সময় তাদের বিধানসভায়, রাজ্য সরকারে এমনকি লোকসভাতেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল।
তেমনি এমন কিছু পার্টি আছে, যাদের আজকে এখনও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু তারা আসলে মহাপ্রস্থানের পথে। যেমন অসম গণ পরিষদ। ১৯৮০-র দশকে অসম আন্দোলন থেকে যার উত্থান, যার ভোট শেয়ার ১৯৯৬-তে প্রায় ৩১ শতাংশ ছিল, তার ভোট শেয়ার ধারাবাহিকভাবে কমে কমে আজ ৭ শতাংশ। লোকসভায় মাত্র ১টা আসন। বিধানসভায় ৭টি আসন। গন পরিষদের চেয়ে বয়সে নবীন, আসামের মুসলমানদের নিয়ে গড়ে ওঠা এআইইউডিএফ, যার বিধানসভায় আসন সংখ্যা ১৮, এবারের লোকসভায় তারা একটিও আসন পায়নি। আসামের মুসলমান ভোট এবার কংগ্রেসের দিকে ঝুঁকেছে। একই ঘটনা ঘটেছে তেলেঙ্গানায়। বিআরএস দলের বয়স ২৩ বছর, তার উত্থান ২০১৪ সালে এবং ২০১৮-র পর থেকে পতন। এবারের লোকসভা নির্বাচনে ১৭টির মধ্যে ৮টি আসনে তাদের জামানত জব্দ হয়েছে।
বিলোপের সূচক হিসেবে চিহ্নিত করা যায় দুটি অঙ্ককে, এক, ভোট শেয়ারের অধোগতি আর দুই, জামানত হারানো। এবারে জামানত হারিয়েছে কারা জানেন? সবচেয়ে বেশি বিএসপি, ৯৭ শতাংশ আসনে, তারপর সিপিআই(এম) ৫৬ শতাংশ, তারপর আছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যস্তরীয় দল - শিরোমণি অকালি দল, এআইডিএমকে, বিআরএস। বাংলায় সিপিআই(এম) ২৯টার মধ্যে ২৭টি আসনে জামানত হারিয়েছে। তামিলনাড়ুতে এআইডিএমকে ৩৪টি আসনে লড়ে সাতটি আসনে জামানত হারিয়েছে। তাদের ভোট শেয়ার অবশ্য একই আছে। শিরোমণি অকালি দল ১৩টি আসনে লড়ে ১০টিতে জামানত হারিয়েছে। তাদের ভোট শেয়ার ২৭ থেকে ১৩ শতাংশ-এ নেমে এসেছে। বিআরএস আটটি আসনে জামানত হারিয়েছে এবং তাদের ভোট শেয়ার ৪২ শতাংশ থেকে ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গে বামেদের ভোট শেয়ার ০.৩ শতাংশ বেড়েছে, হয়েছে ৬ শতাংশ, কিন্তু বিধানসভা, লোকসভায় কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই।
২০১১-এ বামেদের ভোট শেয়ার ছিল ৩০ শতাংশ, ২০১৬-এ হলো ২৫ শতাংশ, তারপর ২০১৯-এ ৫.৭ শতাংশ এবার ৬ শতাংশ। সিপিআই(এম)-র ক্ষেত্রে এই অধোগতি অবশ্য পশ্চিমবঙ্গেই সীমাবদ্ধ, অন্য রাজ্যে যেমন তামিলনাড়ুতে সিপিআই(এম) দুটি আসন, কেরালায় ও রাজস্থানে একটি করে আসন পেয়েছে। তবে কেরালায় সিপিআই(এম)-এর বিপর্যয় পশ্চিমবঙ্গের মতোই কোনো বৃহত্তর ইঙ্গিত দিচ্ছে কিনা তা জানতে আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গে সিপিআই(এম), তামিলনাড়ুতে এআইডিএমকে, পঞ্জাবে শিরোমণি অকালী দল, উত্তরপ্রদেশ সহ সারা দেশ জুড়ে বিএসপি জামানত হারাচ্ছে - একথা শুনতে অবাস্তব মনে হয়? এআইডিএমকে পাঁচবার রাজ্য শাসন করেছে, সিপিআই(এম) করেছে সাতবার, শিরোমণি অকালী দল রাজ্য শাসন করেছে সাতবার (তবে দুবার পুরো পাঁচ সাল নয়), বিএসপি একবার প্রায় পাঁচ বছর বাকি দুবার অল্প সময়ের জন্য উত্তরপ্রদেশ শাসন করেছে। কেসিআরের দলও দুবার রাজ্য শাসন করেছে। অর্থাৎ এরা সবাই এক সময়ে রাজ্য রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তারা যদি আজকে জামানত হারাতে থাকে, তাহলে বিশেষ কিছু একটা ঘটছে বলতেই হয়। তাকেই আমি বলছি বিলোপ।
কিন্তু এই বিলোপের কারণ কি?
আমার মনে হয়, এর গভীর অনুসন্ধানের প্রয়োজন আছে। ভারতের রাজনীতি চর্চায় রাজনৈতিক দলের বিলোপের কারণ নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয়নি। বিএসপির কথাই ধরা যাক। মণ্ডল রাজনীতির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে যে কয়েকটা দলের উত্থান ঘটেছিল বিএসপি তার মধ্যে একটা। উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত, মধ্যপ্রদেশে দলিতদের সংগঠিত করেছিল এই দলটি। একাধিকবার এসপি, বিজেপি বা কংগ্রেসের সাহায্যে সরকার গঠনও করেছিল। কিন্তু তিনটি কারণে দলটি আজকে তার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। এক, দলটি মূলত যাদব জাতির পার্টি, কোনো দিন তারা সেই জাতির বাইরে তাদের দলের প্রভাব বিশেষ বাড়াতে পারেনি। উত্তরপ্রদেশের অন্যান্য দলিত সম্প্রদায় ও ওবিসি সম্প্রদায়ের সঙ্গে এই দলের সম্পর্ক কোনোদিনই ভালো ছিল না। এসপির সঙ্গে জোট বাঁধার পরও দেখা যায়, স্থানীয়ভাবে দুই দলের কর্মীরা সারাক্ষণ পরস্পরের বিরোধিতা করে গেছে। এছাড়া দলটি ধারবাহিকভাবে কংগ্রেস বিরোধী ছিল। আসন জিততে গেলে যে পরিমাণ ভোট লাগে, তা জোগাড় করতে বিএসপি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জাতি সম্প্রদায় ও দলের সঙ্গে সমঝোতা করেছে, তার মধ্যে কংগ্রেস, বিজেপি, এসপি ছাড়াও স্থানীয়ভাবে অন্য যারা শক্তিশালী তারাও ছিল। বিএসপি টিকিট দিত প্রার্থী দেখে, এবং সেই প্রার্থী কত টাকা বিএসপি-কে দেবে, এবং কত টাকা খরচা করতে পারবে তাই দেখে। ফলে বিএসপির নিজস্ব ভোট ব্যাংক দুর্বল হতে শুরু করে। দুই, দলটা একেবারেই মায়াবতী নির্ভর ছিল, তিনি বাদে কোনো বড় নেতা দলে ছিল না। মায়াবতী ছাড়া আজ পর্যন্ত বিএসপি দলের কেউ প্রেস কনফারেন্স করেননি। ফলে যবে থেকে মায়াবতী ইডি, সিবিআইয়ের তাড়নায় ‘ঘরবন্দি’ হয়ে গেলেন, দলটাই এক অর্থে ছন্নছাড়া হয়ে যেতে শুরু করে। তারই পরিণাম এই ধারাবাহিক পতন।
এআইডিএমকে ও ডিএমকের মধ্যে বিশেষ তফাত কোনোদিনই ছিল না। দুটি দলই সামাজিক সংস্কারের দীর্ঘ আন্দোলন থেকে উঠে আসা দল। আধুনিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও ব্যাপক জনকল্যাণের ভিত্তিতে আধুনিক অর্থনীতির ব্যাপক বিস্তারের সাফল্য দুটি দলেরই কিছুটা করে প্রাপ্য। অন্যদিকে দুটি দলই ক্যারিজ়ম্যাটিক নেতা-নির্ভর দল, করুণানিধি, এম. জি. রামচন্দ্রন, জয়ললিতা-রা সবাই প্রায় দেব-দেবীর মতো সমর্থকদের দ্বারা পূজিত। করুণানিধি যেমন অনেকদিন ধরে স্টালিন-কে দলের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে তৈরি করেছেন জয়ললিতা সেরকম কোনো প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়ে যাননি। পনিরসেলভম সেদিক থেকে দলের মধ্যে কিছুটা প্রক্ষিপ্ত বলা চলে। ফলে তার দল এখন অনেকগুলি গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে গেছে। তাছাড়া কখনও কংগ্রেস কখনও বিজেপির সঙ্গে সমঝোতার ফলে তামিলনাড়ুর মত শিক্ষিত রাজ্যে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, এআইডিএমকের আসল পরিচয় নিয়ে। তৃতীয়ত, জয়ললিতার মৃত্যুর পরে দলটি কোনো নিজস্ব রাজনৈতিক মেসেজ তৈরি করতে পারেনি। অন্য দিকে আম্মার ক্যারিজ়মাও আর নেই। ফলে দলটি একটি সংকটের মধ্যে দিয়ে চলেছে। এবারের নির্বাচনে দেখা গেল, এআইডিএমকের ভোট ভাগ হয়ে বিজেপিতে নয়ত কংগ্রেসে চলে গেছে। এই সঙ্কট থেকে এআইডিএমকে ফিরতে পারবে কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
শিরোমণি অকালি দলের কাহিনী একবারেই অন্য, কিন্তু তার মধ্যেও অন্য কাহিনীগুলির সঙ্গে কিছু মিল পাওয়া যায়। অকালি দল ১০০ বছরেরও বেশি পুরোনো, ২০২০ সালে তাদের শতবর্ষ হয়ে গেছে। প্রধানত শিখদের রাজনৈতিক মুখপাত্র হিসেবে এরা নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেই প্রতিষ্ঠার মধ্যে শিখ ধর্ম, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলি ও ধর্মগুরুরা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিল। রাজ্যের রাজনীতি, অকালি দল, অকাল তখত এবং শিরোমণি গুরুদ্বারা প্রবন্ধক কমিটি - এই তিনটি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করত। অকালি দলের মূল সমর্থন বলয় ছিল গ্রামাঞ্চলে ও মফস্বল শহরে। দলের মধ্যেও একাধিক প্রতিষ্ঠিত নেতা ছিলেন, কিন্তু গুরুচরণ সিং তোহোরা, রঞ্জিত সিং তালোয়ান্ডি, সুরজিত সিং বারনালা প্রমুখ নেতাদের বিদায়ের পরে, ক্রমশ দলটিতে প্রকাশ সিং বাদলের একছত্র রাজত্ব তৈরি হয়। অন্যদিকে দলটিও ক্রমশ শিখ আইডেন্টিটি-র আন্দোলন থেকে নির্বাচন ও ক্ষমতার রাজনীতির দল হিসাবে রূপান্তরিত হয়। তখন কোয়ালিশনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে, এবং অকালি দল বিজেপির সঙ্গে জোট বাঁধে। সেই জোট অনেকদিন আগেই হয়েছিল এবং দীর্ঘদিন চলেছে। ফলে অকালিরা অনেকবার পাঞ্জাবে নানা সরকারের অংশীদার হিসেবে জায়গা পেয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতি করতে গিয়ে একাধিক খেসারত দিতে হয়েছে দলকে - যেমন শিখ ধর্ম, অকাল তখত, গুরুদ্বারা প্রবন্ধক কমিটি কেন্দ্রিক রাজনীতি ছেড়ে ক্রমশ ‘সেকুলার’ হতে হয়েছে। যে দলের মুখ্য শক্তি ছিল গ্রামীণ পাঞ্জাবের শিখরা, তাদের জায়গায় শহরের ব্যবসায়ী ও পেশাদার গোষ্ঠী দলে প্রাধান্য পেয়েছে। পাঞ্জাবের দুটি প্রধান সমস্যা - কৃষিতে সংকট এবং মাদক মহামারি। ক্ষমতা ও কোয়ালিশনের রাজনীতি করতে গিয়ে এই দুই দিকে নজর পড়েনি। তবে ২০১৫-র কুখ্যাত 'পবিত্রতা হনন' কাহিনীর পরে অকালি দল সবথেকে বড় ধাক্কা খায়। শিখদের পবিত্র গ্রন্থ 'গুরুগ্রন্থ সাহিব'-এর ছেঁড়া পাতার টুকরো নানা জায়গায় পাওয়া যায়, একবার নয় একাধিকবার। এর আগে কট্টর হিন্দুদের সঙ্গে শিখদের নানা গোলমাল বেঁধেছে। খুনোখুনিও হয়েছে। কিন্তু এই অপবিত্রতার ঘটনায় শিখ সমাজ স্বভাবতই উত্তাল হয়ে ওঠে। তখন বিজেপি-অকালি যৌথ সরকার। সরকারি দমন যন্ত্র সেই বিক্ষোভকে চিরাচরিত পথে দমন করে যার ফলে অকালি দল তার বিশ্বাসযোগ্যতাই হারিয়ে ফেলে, যার পরিণাম ২০১৭-র বিপুল পরাজয়, অকালিরা সেই বিধানসভা নির্বাচনে তৃতীয় স্থানে চলে আসে - সেই অধোগতি আজও অব্যাহত আছে। ইতিমধ্যে আম আদমি পার্টির প্রবেশ ঘটেছে এবং কংগ্রেসেরও কিছুটা উজ্জীবন হয়েছে - পাঞ্জাবে অকালি দলের প্রয়োজনীয়তাই আজ বিপুল প্রশ্নের মুখে, তাদের হয়ত আর নতুন করে কিছু দেবার নেই।
সবশেষে বামেদের কাহিনী। এই কাহিনীটা বাঙ্গালি পাঠকের এতোটাই সামনে থেকে দেখা, যে বিশদ বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয় না। শিরোমণি অকালি দলের সঙ্গে বামেদের একটা মিল আছে, ধর্মীয় আদর্শ বা শ্রেণী আদর্শভিত্তিক দল যখন তার মূল জায়গা থেকে সরে যায় তখন তার অন্তর্নিহিত শক্তি দুর্বল হতে থাকে। ক্ষমতা ও নির্বাচনী রাজনীতি এক সময়ে এসে সেই মূল জায়গাতেই আঘাত হানে, অকালিদের কাছে ২০১৫-র অপবিত্রতার ঘটনা, আর বামদের কাছে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আসলে একই ঘটনা, যা দলের raison d'etre-কে প্রশ্ন করে।
অল্প পরিসরের আলোচনায় যে সব রাজনৈতিক দলগুলির বিলোপের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি, তার মধ্যে কিছু মিল আছে। মিলটি হলো একজন ব্যক্তি-নির্ভর দল (বিএসপি, বিআরএস, এআইডিএমকে) একটা সময়ের পরে তার সঙ্ঘবদ্ধতা হারায়, দিশা হারায়, এবং তাদের মূল সমর্থন বলয় সেটা বুঝতে পেরে সরে যেতে থাকে। ফলে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়, তা (এলাকায়) নতুন রাজনৈতিক দল পূরণ করতে শুরু করে। দুই, নির্বাচন কেন্দ্রিক কোয়ালিশনের রাজনীতি-র প্রয়োজনে যদি নিজেদের মূল পরিচিতি বা আইডেন্টিটিতেই ক্রমশ প্রলেপ পড়ে যায়, তখন এক সময়ে এসে মানুষ কোনো নতুন রাজনৈতিক শক্তিকে মেনে দিতে দেরি করে না। তিন, দীর্ঘদিনব্যাপী ক্ষমতা ও নির্বাচনের রাজনীতি দলকে নানা কারণে অপ্রিয় করে তোলে, এবং এক সময় মানুষ তাদের ত্যাগ করতে শুরু করে। কংগ্রেসকেও এইসব নানা কারণে মানুষ ত্যাগ করেছিল। কংগ্রেসের ক্ষেত্রে একটা কথা না বললেই নয়, কংগ্রেসের মূল সমর্থন বলয় আসলে দলিত, তপশিলী জনজাতি ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে, কিন্তু কংগ্রেসের নেতাদের ভাবনা একেবারেই বিপরীত অবস্থানে ছিল। রাহুল গান্ধি তাঁর গত দেড় বছরের চেষ্টায় এই দুই অংশকে একই দিশায় আনতে পেরেছেন, বিশেষত নেতৃবৃন্দকে। তা করতে গিয়ে অনেক নেতাকে কংগ্রেস খুইয়েছে, কিন্তু বদলে ফেরত পেয়েছে তার সমর্থন বলয়কে। রাজনৈতিক দলের বিলোপ ঠেকাতে গেলে কালের ডাকে সাড়া দিয়ে সাফল্যের সঙ্গে নতুন এবং বিশ্বাসযোগ্য পরিচিতি তৈরি করা প্রয়োজন।