আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ জুন, ২০২৪ ● ১-১৫ আষাঢ়, ১৪৩১
সম্পাদকীয়
নিট দুর্নীতি
সম্প্রতি ডাক্তারি পাঠক্রমে ভর্ত্তির জন্য কেন্দ্রীয় মূল্যায়ন পরীক্ষা তথা নিটের ফল প্রকাশিত হয়েছে। ফল প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই এই পরীক্ষা নিয়ে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এমনকি দেশের সর্বোচ্চ আদালত তথা সুপ্রিম কোর্টে এই পরীক্ষা স্থগিত করা বা দুর্নীতির অনুসন্ধানের দাবিতে মামলা হয়েছে। মামলাকারী ছাত্ররা অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ভর্ত্তির কাউন্সেলিং বন্ধ করার অবধি আবেদন জানিয়েছেন। আদালত হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়েছে। ভর্ত্তির প্রক্রিয়া স্থগিত করা না হলেও এই পরীক্ষার দুর্নীতি নিয়ে সিবিআই তদন্ত কেন হবেনা তা নিয়ে কেন্দ্র সরকার এবং পরীক্ষা পরিচালন সংস্থা, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (এনটিএ) হলফনামা আদালতে দাখিল করার নির্দেশ জারি হয়েছে। উচ্চশিক্ষার প্রবেশিকা পরীক্ষায় দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু মিথ্যাচারী কেন্দ্রীয় সরকার এখনও অবধি এই পরীক্ষায় দুর্নীতি হয়নি বলেই দাবি করে চলেছে। কিন্তু এই দুর্নীতি কেবল একটি দুর্নীতি নয়, এর গভীরে আছে এক ষড়যন্ত্র যা আমাদের দেশের শিক্ষার পরিসরকে আমূল বদলে দিতে পারে।
নিট পরীক্ষা নিয়ে এখনও অবধি যে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে তার প্রথম অভিযোগ হল দেশের বেশ কিছু রাজ্যে এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায়। তার প্রমাণ হিসেবে উঠে আসছে হরিয়ানার একটি নির্দিষ্ট কোচিং কেন্দ্রের ৬ জন পরীক্ষার্থীর মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করা। দ্বিতীয় অভিযোগ হল টেস্টিং এজেন্সি পরীক্ষার্থীদের নম্বর দেওয়ার সময় বিশেষ কিছু জনকে অনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দিয়েছে। গতবছর এই পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন মাত্র দুজন ছাত্র। এবার সেই সংখ্যা ৬৭। এক ধাক্কায় এতজন প্রথম হওয়া সন্দেহের উদ্রেক করে। উপরন্তু দেখা যায় বেশ কিছু ছাত্র ৭২০ পূর্ণমানে ৭১৮ বা ৭১৯ পেয়েছে। যা পরীক্ষার বর্তমান মূল্যায়ন ব্যবস্থায় কার্যত অসম্ভব। বিতর্ক হওয়ায় এনটিএ জানায় যে যেসব কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীরা প্রশ্ন দেরীতে পৌঁছানোয় সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি তাদের বাড়তি নম্বর দেওয়া হয়েছে। যদিও সংস্থা এ বিষয়ে আগে কোনো ঘোষণা করেনি বা এই নম্বর বন্টনের কোনো নিয়মই জানায়নি! তৃতীয় বিতর্ক হল প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার অভিযোগে বিহার পুলিশ ১০ জন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করার পরেও পরীক্ষা বাতিল না করে ওই প্রশ্নেই পরীক্ষা হয়। দেখা যাচ্ছে বেশ কিছু প্রার্থী যারা মেধাতালিকায় প্রথমে রয়েছেন তারা তাদের সংশ্লিষ্ট দ্বাদশ শ্রেণীর পরীক্ষায় একই বিষয়ে ফেল করেছেন। এর ফলে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ আরও তীব্র হয়েছে। এছাড়া ফল প্রকাশের দিন নিয়েও বির্তক তৈরী হয়েছে। ফল প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল ১৪ই জুন, কিন্তু তা এগিয়ে এনে ৪ঠা জুন ফল প্রকাশ হয়, যেদিন দেশে লোকসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশ হচ্ছিল। অভিযোগ, পরীক্ষার দুর্নীতি থেকে সংবাদমাধ্যমের নজর এড়াতেই ওই বিশেষ দিনে ফলপ্রকাশ করা হয়। এই বিতর্কের মাঝেই এনটিএ আবার ঘোষণা করে, যে বাড়তি নম্বর কিছু পরীক্ষার্থীদের দেওয়া হয়েছিল তা বাতিল করা হচ্ছে। ফলে আবারও মেধাতালিকা পাল্টে গেছে। প্রতিটি অভিযোগের বাস্তবতা বিদ্যমান এবং একটি বিরাট মাপের দুর্নীতি যে হয়েছে তা প্রশ্নাতীত।
ইতোমধ্যেই ভুক্তভোগী ছাত্ররা এবং পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলো এই পরীক্ষা বাতিল করার দাবিতে আন্দোলন করছেন। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো হয়ত এ নিয়ে সংসদে গলা তুলবেন আশা করা যায়। দুর্নীতি নিয়ে, নিট পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে হয়ত আগামীদিনে আরও আন্দোলন হবে। কিন্তু সমস্যার মূলে কি কোনো রাজনৈতিক দল বা ছাত্র সংগঠন কুঠারাঘাত করবেন? আশা ক্ষীণ কারণ এখনও এই দাবি তামিলনাড়ু রাজ্য সরকার ব্যতীত আর কেউ তুলছেন না। প্রশ্নটি হল এমনতর কেন্দ্রীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা কি শিক্ষার অধিকারকে আরও সঙ্কুচিত করছে না? এই ধরণের পরীক্ষাগুলো এক বিভাজনমূলক শিক্ষাব্যবস্থার, বিশেষত অর্থবানদের সুবিধা করে দিচ্ছে না?
প্রথমত এই পরীক্ষাগুলোর পাঠক্রম সব ক্ষেত্রেই বিশেষ একটি বোর্ডের পাঠক্রমকে মাথায় রেখে করা হয়। ফলে রাজ্যভিত্তিক বোর্ডগুলোর ছাত্রছাত্রীরা, যারা একটু পৃথক পাঠক্রম নিয়ে পড়ে তারা সমস্যার সম্মুখীন হয়। ফলে এক সামাজিক প্রবণতা তৈরী হচ্ছে রাজ্যভিত্তিক বোর্ডের বদলে কেন্দ্রীয় বোর্ড অনুমোদিত স্কুলে পড়ার। ফলে রাজ্যের নিজস্ব সরকারি স্কুলগুলি ছাত্রাভাবে ভুগছে। দ্বিতীয় সমস্যা হল এই জাতীয় সর্বভারতীয় পরীক্ষার বিশেষ ধরন। এর জন্য বিশেষ ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন হচ্ছে। যা কেবল স্কুলশিক্ষার মাধ্যমে দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে কোচিং প্রতিষ্ঠানগুলোর বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে। রাজস্থানের কোটা শহর তো এই ব্যবস্থার রাজধানীতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই শিক্ষা কিনতে মেটাতে হয় চড়া দাম। ফলে কেবল বিত্তবান ঘরের ছেলেমেয়েদের পক্ষেই এই সুযোগ নেওয়া সম্ভব। আর নয়ত ব্যাঙ্ক লোন নিতে হবে। এর ফলে এরকম ছাত্রছাত্রীদের মাথায় প্রথম থেকেই বিপুল মানসিক চাপ তৈরী হচ্ছে। প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হতে পারলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের কথা ভেবে এদের অনেকেই আত্মহত্যা করেছে। বিগত কয়েক বছরে শুধুমাত্র কোটা শহরেই গত বছর ২৬ জন এবং এই বছর এখনও অবধি ৭ জন ছাত্র আত্মহত্যা করেছে। এভাবেই গরীব ঘরের ছেলেমেয়েদের জন্য উচ্চশিক্ষার দরজা আরও বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। গোটা দেশজুড়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় একটি বিভাজনমূলক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। যেখানে মূল মন্ত্রই হল ‘ফেল কড়ি, মাখো তেল’। শিক্ষার সাংবিধানিক অধিকারকে কেবল প্রাথমিক শিক্ষার স্তরেই আটকে দিয়ে গরীব ঘরের ছেলেমেয়েদের জন্য রাখা হয়েছে সস্তায় মজুর হওয়ার রাস্তা আর তাদেরই মাথায় চেপে বসবে উচ্চশিক্ষিত আর্থিকভাবে শক্তিশালী ঘরের ছেলেমেয়েরা। তাই উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ আরও কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে এবং তাকে পরিণত করা হয়েছে পণ্যে। যার ক্ষমতা আছে সে এই পণ্য কিনবে আর বাকিরা থাকবে দরজার বাইরে।
নিট ছাড়াও বর্তমানে অন্যান্য ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত পরীক্ষার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার পরিচালিত শিক্ষাকেন্দ্রে ভর্ত্তির বা গবেষণার যোগ্যতা নির্ধারিত হচ্ছে। মেডিক্যাল শিক্ষায় যেমন নিট, তেমনই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্ত্তির জন্য সি.ইউ.ই.টি. বা কুয়েট পরীক্ষা, গবেষণার জন্য নেট বা গেট পরীক্ষা আজ বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হচ্ছে। এইসব পদক্ষেপ শিক্ষার অধিকারকে আরও সংকুচিত করার উদ্দেশ্যেই গৃহীত। আজকের নিট দুর্নীতি এই কেন্দ্রীভূত উদ্যোগেরই ফসল। যেখানে কোচিং প্রতিষ্ঠানগুলি পারস্পরিক প্রতিযোগিতায় নেমেছে এই জাতীয় পরীক্ষাগুলোকে কেন্দ্র করে ব্যবসা করতে সেখানে পরীক্ষা নিজেই একটি পণ্য। ক্রেতাদের হাতে সেই পণ্য তুলে দিতে সবকটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহী। ফলে বাজারে সেই পণ্যের মূল্য স্থির হয়েছে এবং তা বিক্রি হয়েছে। নিটের এই দুর্নীতি কেবল নিটেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বাকি পরীক্ষাগুলোতেও এইজাতীয় দুর্নীতি হতেই থাকবে। যদি এদেশের শিক্ষাকে বাঁচাতে হয় এবং তাকে সর্বজনীন ও জনকল্যাণমূলক হতে হয় তবে অবিলম্বে এই জাতীয় কেন্দ্রীয় প্রবেশিকা পরীক্ষাগুলো বাতিল করতে হবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রকৃত অর্থেই স্বশাসিত করে তাদের হাতে প্রবেশিকা পরীক্ষার দায়িত্ব তুলে দিতে হবে। নয়ত এমন দুর্নীতির মিছিল চলতেই থাকবে।