আরেক রকম ● দ্বাদশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ জুন, ২০২৪ ● ১-১৫ আষাঢ়, ১৪৩১
সম্পাদকীয়
অষ্টাদশ লোকসভা নির্বাচনের রায়
ভারতের রাজনীতির গবেষক এবং বিশ্লেষকরা অনেক সময় একটি-দুটি নির্বাচনী প্রবণতা থেকে একটি চরম তত্ত্বে এসে পৌঁছন যা নিয়ে দুটি নির্বাচনের মধ্যে নিরন্তর আলোচনা চলে। বিশেষ করে মিডিয়া যাদের ভৃত্য সেই শাসকদল বিজেপি-র পক্ষে বিগত ১০ বছর ধরে একাধিক কলমচি লিখেছেন যে ভারতের রাজনীতিতে বিজেপি-যুগ এসে গিয়েছে, মোদীকে হারানো সম্ভব নয়, রাম মন্দির বানানোর পরে হিন্দুরাষ্ট্রের দিকে যেহেতু একটি নির্ণায়ক পদক্ষেপ মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি নিয়েছে তাই ২০২৪ সালের নির্বাচন একটি নিয়মরক্ষা মাত্র - বিজেপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরবে, এবং দেশের আদিবাসী তথা দলিতদের মধ্যে বিজেপি এতটাই গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে ফেলেছে যে তাত্ত্বিকরা নিম্নবর্গের হিন্দুত্ব নামে একটি তত্ত্ব বাজারে আমদানিও করে ফেলেছেন। এই তালিকা এখানেই শেষ হয় না। বিজেপি এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় ঘোষণা করে যে তাদের লক্ষ্য ৪০০-র বেশি আসনে জয়যুক্ত হওয়া। যথারীতি দেশের মিডিয়া তথা বুথ ফেরত সমীক্ষাকারী সংস্থাগুলি বিজেপিকে নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার আগেই ৪০০-র বেশি আসনে জয়যুক্ত হওয়ার ভবিষ্যৎবাণী করে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের রায় প্রমাণ করে যে অধিকাংশ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আসলে পক্ষপাতদুষ্ট। তাই তারা বিজেপিকে হারানোই সম্ভব নয় বলে একটি আখ্যান তৈরি করে লাগাতার তার প্রচার করে গেছেন। কিন্তু মানুষ দেখিয়ে দিয়েছেন যে উপরোক্ত অধিকাংশ তত্ত্ব এবং তার উপর নির্ভর করে যেই ভবিষ্যৎবাণীগুলি মিডিয়া তথা রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিজেপি-র দেওয়া বেতনের ভিত্তিতে করেছেন তা ভুল এবং তা করা হয়েছিল মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য। ২০২৪ সালের নির্বাচনী ফলাফলের প্রেক্ষিতে উপরোক্ত তত্ত্বগুলিকে একবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক।
এই পর্যালোচনা শুরু করতে হবে উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদ আসনটি থেকে। কারণ এই নির্বাচনী ক্ষেত্রের অন্তর্গত অযোধ্যা যেখানে রাম মন্দির উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে। গোটা দেশজুড়ে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করা হয় রাম মন্দিরকে কেন্দ্র করে। হিন্দু ধর্মের প্রধান মাথা - শঙ্করাচার্যদের - উপেক্ষা করে তাদের আমন্ত্রণ না জানিয়ে মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন প্রধানমন্ত্রী। ধর্মনিরপেক্ষ দেশে এরকম নির্লজ্জভাবে সংখ্যাগুরু ধর্মীয় রীতি পালন করার ইতিহাস স্বাধীন ভারতে আর কোনো প্রধানমন্ত্রীর নেই। অনেকেই ভেবেছিলেন যে রাম মন্দির উদ্বোধন হওয়ার পরেই ২০২৪ সালের নির্বাচনী ফলাফল কী হবে তা নির্দিষ্ট হয়ে যায় - বিজেপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পুনর্বহাল হবে দিল্লির মসনদে। কিন্তু ফল বেরোলে দেখা গেল যে বিজেপি ২৪০টি আসনে জয়ী। যা তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ৩৭০-এর থেকে অনেক কম। এবং রাম মন্দির যেখানে অবস্থিত সেই ফৈজাবাদে বিজেপি প্রার্থী সমাজবাদী প্রার্থীর দলিত প্রতিনিধির কাছে পরাজিত। ফৈজাবাদ আসনে বিজেপি-র পরাজয় তাদের এমনই ধাক্কা দিয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী ৪ জুন ফল বেরোনোর পরে তাদের পার্টি অফিসে প্রদত্ত ভাষণে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান না দিয়ে ‘জয় জগন্নাথ’ স্লোগান দিয়েছেন! নির্বাচনী হারের ধাক্কায় প্রধানমন্ত্রী রামকেই ভুলে গেলেন!
ফৈজাবাদের গরীব মানুষ বিজেপি-র ঔদ্ধত্য এবং ধর্মের নামে যে ভয়ঙ্কর ব্যবসা অযোধ্যা জুড়ে যোগী এবং অমিত শাহের মদতপুষ্ট ব্যবসাদাররা করে চলেছেন তার বিরুদ্ধে এক প্রবল প্রতিবাদ জানিয়েছেন। রাম মন্দিরের জন্য রাস্তা প্রশস্ত করার নামে গরীব মানুষের ঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছে, তাদের দোকান ভেঙে দেওয়া হয়েছে, ভাঙা পড়েছে মন্দির-মসজিদ। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্থদের কোনোরকম ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। এমনভাব করা হয়েছে যেন রাম-এর নামে সবাই ভোট দিয়ে দেবে। কিন্তু পেটে লাথি খেলে ধর্ম করা যায় না। তাই ফৈজাবাদের জনসাধারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়ে বিজেপি-র দম্ভ ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন। তাই শুধুমাত্র রাম মন্দির বানিয়ে ভারতের মানুষের মন জয় করা যাবে, এই তত্ত্বে ভুল ছিল। বিজেপি-র অর্থনৈতিক ব্যর্থতা, বেকারত্ব সমস্তই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তাদের সমর্থন হ্রাস হওয়ার নেপথ্যে।
প্রধানমন্ত্রী মোদী বিজেপি-র প্রধান তথা বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে একমাত্র ব্র্যান্ড বা পণ্য। দেশের কর্পোরেট মিডিয়া লাগাতার প্রচার চালিয়েছে যে মোদীকে হারানো সম্ভব নয়। মোদী নিজেই দাবি করেছেন যে তাঁর জন্ম জৈবিক প্রক্রিয়ায় হয়নি এবং তিনি সরাসরি পরমাত্মার দ্বারা প্রেরিত একজন ব্যক্তি। বারাণসীর মানুষ এইসব ভ্রান্ত কথায় বিশ্বাস করেননি। মাত্র দেড় লক্ষ ভোটে তিনি জয়ী হয়েছেন। ইন্দিরা গান্ধী নির্বাচন হেরেছিলেন, কিন্তু তারপরে যেই প্রধানমন্ত্রী সর্বনিম্ন ভোটের ব্যবধানে পুনরায় নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন, তার নাম নরেন্দ্র মোদী। একজন তথাকথিত অনামী কংগ্রেস প্রার্থী অজয় রাই তাঁকে যে পরিমাণ ব্যতিব্যস্ত করেছেন, তার থেকেই প্রমাণিত যে মোদী অপরাজেয় নন। মানুষের কাছে সঠিক কথা পৌঁছৈ দিতে পারলে মোদীকেও পরাজিত করা সম্ভব।
তৃতীয় যেই তত্ত্বটি নিপুণভাবে তৈরি করা হয়েছে তা হল এই যে দেশের আদিবাসী ও দলিতদের মধ্যে হিন্দুত্বের প্রভাব এতটাই বেড়েছে যে বর্তমান প্রেক্ষিতে হিন্দুত্বকেই 'নিম্নবর্ণের হিন্দুত্ব' বলে অবিহিত করা উচিত। দলিত সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষিত মোট ৮৩টি আসনের মধ্যে ২০২৪ সালে বিজেপি জিতেছে মাত্র ৩০টি, যেখানে ২০১৯ সালে তারা জিতেছিল ৪৬টি আসন। এই আসনগুলির মধ্যে কংগ্রেস জিতেছে ২০টি আসন যেখানে ২০১৯ সালে তারা জিতেছিল মাত্র ৬টি আসন। তফসিলী উপজাতিদের জন্য ৪৭টি সংরক্ষিত আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছে ২৫টি আসন যেখানে ২০১৯ সালে তারা জিতেছিল ৩১টি আসন। অর্থাৎ সংরক্ষিত আসনগুলির মধ্যে বিজেপি মোট ২২টি আসন হারিয়েছে। এখনও অধিকাংশ সংরক্ষিত আসন বিজেপি জিতলেও নিম্নবর্গের মানুষের মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা বিপুলভাবে হ্রাস পেয়েছে এই নিয়ে সন্দেহ নেই।
কিন্তু প্রশ্ন হল এই হ্রাস পাওয়ার কারণ কি? বিজেপি যতই নিজেকে নিম্নবর্গের মানুষের বন্ধু হিসেবে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করুক, সত্য হল এই যে এটি একটি উচ্চবর্ণের পার্টি। এই নির্বাচনেও উচ্চবর্ণের অধিকাংশ মানুষ বিজেপিকেই ভোট দিয়েছেন। কিন্তু তাদের ‘অবকি বার ৪০০ পার’-এর রণহুঙ্কার এই প্রশ্নের জন্ম দেয় যে এত আসনে জয় যদি তারা পেয়ে যায় তাহলে তারা কী করবে? এই প্রশ্নে বিরোধীরা এই প্রচার সক্ষমভাবে চালায় যে আসলে বিজেপি আম্বেদকর দ্বারা লিখিত সংবিধানকে আমূল পরিবর্তন করতে চায়। দেশের অবদমিত দলিত-পিছিয়ে পড়া-আদিবাসী মানুষ সংবিধান পরিবর্তন হওয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে বিজেপি-র বিরুদ্ধে ভোট দেন। অন্যদিকে, বিরোধী ইন্ডিয়া জোট, বিশেষ করে কংগ্রেস তথা রাহুল গান্ধী জাতি-ভিত্তিক জনগণনার যে দাবি নিয়ে গোটা দেশে প্রচার চালান তাও দলিত-আদিবাসী সম্প্রদায়ের মনে দাগ কাটে। যেহেতু বিজেপি লাগাতার এই নীতির বিরোধিতা করেছে, তাই তাদের বিরু্দ্ধে নিম্নবর্ণের মানুষের একটা বড় অংশ ভোট দেয়।
এই প্রেক্ষিতে কংগ্রেস পার্টি তথা রাহুল গান্ধীর কথা আলাদা করে উল্লেখ করা জরুরি। প্রথমত, কংগ্রেসের ইস্তেহার একটি প্রগতিশীল ইস্তেহার যা যুব সম্প্রদায়, মহিলা, দলিত-আদিবাসী ইত্যাদি ক্ষেত্রের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা সমাধানের দিশায় গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। তদুপরি, মোদী কংগ্রেসের ইস্তেহারের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক বিষোদগার করার ফলে এই ইস্তেহারের আসলে সর্বজনগ্রাহ্যতা বাড়িয়ে দেয়, যার ফল কংগ্রেস পেয়েছে। অন্যদিকে, রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে ‘ভারত জোড়ো’ তথা ‘ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা’ দেশের একটি অংশের মানুষের মনে সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়। এই যাত্রাদুটি যেই পথ দিয়ে গিয়েছে, সেখানে কংগ্রেস এবং তার জোট সঙ্গীরা ৪১টি আসনে জয়ী হয়েছে যা আগের বারের তুলনায় অনেকটাই বেশি। অর্থাৎ এই যাত্রাগুলি ইন্ডিয়া জোটকে যথেষ্ট সহায়তা করেছে।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এই নির্বাচনে মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে যে প্রচার করেছেন তা ভারতের গরীব জনগণের একটি বড়ো অংশের মনে দাগ কেটেছে। একদিকে প্রধানমন্ত্রী ক্রমাগত সাম্প্রদায়িক প্রচার করে গেছেন, অন্যদিকে রাহুল গান্ধী মহিলা তথা যুবদের রোজগার, দেশের সংবিধান বাঁচানোর আহ্বান এবং জাতি ভিত্তিক জনগণনা নিয়ে লাগাতার প্রচার চালিয়ে গেছেন। বিগত ১০ বছর ধরে দেশে বিজেপি মন্দির-মসজিদ এবং বিভাজনের যে রাজনীতি চালিয়েছে তার প্রতিস্পর্ধী রাজনৈতিক আখ্যান নির্মাণ করতে রাহুল গান্ধী তথা ‘ইন্ডিয়া জোট’ সক্ষম হয়েছে। আগামীদিনে মানুষের মৌলিক সমস্যা নিয়ে যদি বিরোধীরা দেশে লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যেতে পারেন তাহলে নিশ্চিতভাবেই আরও বেশি মানুষের সমর্থন তারা পাবে।
তাহলে কি বিজেপি-র রাজনৈতিক সমাপ্তির বার্তা দিচ্ছে এই নির্বাচন? এর উত্তরে দুর্ভাগ্যবশত সোচ্চারে না-ই বলতে হয়। হ্যাঁ, এই নির্বাচনে মোদী তথা বিজেপিকে একটি বার্তা দেওয়া গেছে, তাদের ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে মানুষ এবারে আরও বেশি মুখ খোলার সাহস পাবে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না ভারতে বিজেপি এই নির্বাচনে ৩৬.৫৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে, যা ২০১৯ সালে ছিল ৩৮.৪ শতাংশ। অর্থাৎ বিজেপির আসন সংখ্যা কমলেও তারা ২ শতাংশেরও কম ভোট হারিয়েছে। অতএব তাদেরকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই। তারা আরও একবার কেন্দ্রীয় সরকারে থাকছে এবং তারা তাদের জনভিত্তি প্রায় একই রাখতে সক্ষম হয়েছে। ভারত থেকে সাম্প্রদায়িকতাকে উৎখাত করার জন্য আরও অনেক লড়াইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। এই নির্বাচনে সেই লড়াই আরও জোরদার করার জন্য মানুষ বিরোধীদের অধিক সংখ্যায় সংসদে পাঠিয়েছেন, আশা করা যায় বিরোধীরা সেই দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করবে।
কিন্তু যারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার বিষয়ে সদাপ্রস্তুত, এবং যারা মনে করেন যে তারাই ভারতের সর্বাধিক প্রগতিশীল শক্তি, সেই বামপন্থীদের অবস্থা আবারও শোচনীয়। পশ্চিমবঙ্গে তারা এই নিয়ে পরপর তিনটি নির্বাচনে শূন্য আসন পেয়েছেন। কেরলে বামপন্থীরা একটি আসন জিতেছে, ত্রিপুরাতে শূন্য, রাজস্থান এবং তামিলনাডুতে কংগ্রেস তথা ডিএমকে-র সাথে জোট করে যথাক্রমে ১টি এবং ৪টি আসনে তারা জয়লাভ করেছে। সিপিআই(এম) মোট ৪টি আসন, সিপিআই ২টি এবং সিপিআইএম-এল (লিবারেশন) ২টি আসন মিলে মোট ৮টি আসনে বামপন্থীরা জয়ী হয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের বাম নেতৃত্ব কংগ্রেসের সঙ্গে বারবার জোট করছেন আর শূন্য আসনে জয়ী হচ্ছেন। রাজ্যে বিজেপি মুখ্য শত্রু নাকি তৃণমূল প্রধান শত্রু এই বিতর্ক তারা এখনও নিরসন করতে পারলেন না। আর নির্বাচনের পরে রাজ্য কমিটির পক্ষ থেকে বিবৃতি দেওয়া হচ্ছে যে মানুষ বিজেপিকে হারাতে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছেন। এর জন্য নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করার দরকার ছিল না। চোখ-কান খোলা রাখলেই বোঝা যাচ্ছিল যে এই রাজনৈতিক প্রবণতা রাজ্য জুড়ে রয়েছে। আসলে বাংলায় বিজেপির বিরুদ্ধে একটি বিশাল জনমত রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বামপন্থী নেতারা সেই মনোভাব বুঝতে পারছেন না। তৃণমূলের বিরোধিতায় অন্ধ হয়ে তারা বিজেপি-র বিরুদ্ধে যতটা মুখ খোলা দরকার তা তারা করছেন না। এর মানে এই নয় যে তৃণমূলের বিরোধিতা করা বন্ধ করে দিতে হবে। কিন্তু বারংবার শূন্য হয়েও তাদের মৌলিক রাজনৈতিক লাইনের পরিবর্তন হচ্ছে না। বিজেপি এবং তৃণমূলকে একই পৃষ্ঠার এপিঠ ওপিঠ বলার রাজনীতি মানুষ বিগত প্রায় এক দশক ধরে প্রত্যাখান করছে। কিন্তু বামপন্থীরা সেই বার্তা গ্রহণ করতে পারছেন না, বারংবার একই ভুল করে চলেছেন।
একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করে এই সম্পাদকীয়র সমাপ্তি করা যাক। ২০২৪ সালের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় খবর হল এই যে বিজেপি-র আসন সংখ্যা কমেছে, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। কংগ্রেস তাদের আসন সংখ্যা প্রায় দ্বিগুন করে নিয়েছে, সমাজবাদী পার্টি উত্তরপ্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েছে, শিবসেনা (ঠাকরে) আসন সংখ্যা বাড়িয়েছে, লালুর দল বাড়িয়েছে, এনসিপি বাড়িয়েছে, তৃণমূল বাড়িয়েছে। অর্থাৎ যারা বিগত ১০ বছর ধরে বিজেপি-র বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, মানুষের মধ্যে গিয়ে বিজেপি-র বিরুদ্ধে কথা বলেছে সব দলই তাদের জনসমর্থন বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। এর একমাত্র ব্যতিক্রম বামপন্থীরা। বিজেপি যখন দুর্বল হচ্ছে তখনও বামপন্থীরা যেই তিমিরে ছিলেন সেই তিমিরেই রয়ে গেছেন। বরং কেরলেও বিজেপি তাদের জনসমর্থন বিপুলভাবে বাড়িয়ে নিয়েছে। দক্ষিণপন্থী শক্তি পিছু হটছে কিন্তু বামপন্থীরা তাদের সমর্থন বাড়াতে পারছেন না। বিজেপি বনাম প্রগতিশীল শক্তির এই লড়াইয়ে বামপন্থীরা প্রান্তিক শক্তিতে কেন পরিণত হচ্ছেন? বিজেপি বিরোধিতায় কি কোথাও ফাঁক থেকে যাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।